আরভি পেলিক্যানে বসে আছি। এটা একটা গবেষণা জাহাজ, গালফ অফ মেক্সিকোতে পানি দূষণের কারণে সৃষ্ট অক্সিজেন স্বল্পতা কিভাবে বিভিন্ন জলজ প্রাণীকে প্রভাবিত করছে সেটা নিয়ে গবেষণা চলছে। আকারে ছোট বলে থাকার ব্যবস্থা বাঙ্কে, তবে খাওয়ার ব্যবস্থা রাজসিক। গবেষকদলের অনেক সদস্যদেরই ধারণা আমাদের এ জাহাজের কুক আমেরিকার সবচেয়ে ভাল শেফদের একজন। তার কাজ ভোর ছ’টায় নাস্তা, দুপুর বারটায় লাঞ্চ আর সন্ধ্যা ছটায় ডিনার দেয়া। কিন্তু এখানে সুবহে সাদিক ভোর ছ’টার অনেক আগে আর ইফতারের সময় হতে হতে প্রায় রাত ন’টা। সফর হিসেবে যদিও কিছু ছাড় আছে, তাও রমাদানের কল্যাণটা ছাড়তে ইচ্ছে করল না। প্রথমবারের মত সমুদ্রে আসার প্রতিক্রিয়া হিসেবে একদিকে মাথার মগজ পেন্ডুলামের মত দুলছে, অন্য দিকে চোখের সামনে অন্যদের চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় দিয়ে ভূরি-ভোজন করতে দেখছি। মনে পড়ল বহুদিন আগে একজন আত্মীয় প্রশ্ন করেছিলেন, “তুমি না খেয়ে থাকাতে আল্লাহর কি লাভ? তোমাকে কষ্ট দিয়ে আল্লাহর কি লাভ?” আসলেই তো, আমরা যে পুরো একমাস দিনে না খাওয়ার নিয়ত করে ফেলেছি, বুঝে হোক-না বুঝে হোক রোযা রাখছি – কেন?

একজন সচেতন আর একজন অজ্ঞ মানুষের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে জ্ঞান। অজ্ঞেরা অনেকটা ভাসমান শ্যাওলার মত, স্রোত যখন যেদিকে যায় সেও সেদিকে ভেসে চলে। মাছের পেটে গেল, নাকি নৌকার বৈঠাতে জড়িয়ে গেল, নাকি তীরে থমকে গেল – এতে তার খুব বেশী আসে যায়না। কিন্তু যারা সচেতন মানুষ তারা কোন কাজ করার আগে ভাবে – কেন করছি? ফলাফল কি হবে? সচেতন মানুষ মাত্রই যে মস্ত বড় জ্ঞানী তা নয়; কিন্তু সে জানতে চায়, বুঝতে চায়। আমাদের মুসলিমদের যখন কেউ প্রশ্ন করে, “এ কাজটা কেন করলে?” তখন তার উত্তর হওয়া উচিত – আল্লাহ বলেছেন তাই। এরপর যখন প্রশ্নকর্তা জানতে চাইবে আল্লাহ কোথায় বলেছেন তখন আমরা কুরান-সুন্নাহ ঘেটে তাকে খুঁজে বের করে দেব। এর নাম আল্লাহর জ্ঞানের উপরে ভরসা; তিনি যেহেতু সর্বজ্ঞানী তাই তিনি আমাদের কিছু করতে বলবেন আর তাতে কল্যাণ থাকবেনা – এমনটি অসম্ভব। এই কল্যাণটা কেমন সেটা আমরা নাও জানতে পারি, জানার পরেও নাও বুঝতে পারি – কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি আমাদের জন্য ভাল কিছু নিশ্চয়ই আছে। মানুষ যত গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করে কেন সে কাজটা করছে তত সে কাজটাকে ভালোবাসতে শুরু করে, তত সুন্দর করে সে কাজটা করে। এজন্য কিছু কিছু কাজের আদেশ দিয়ে আল্লাহ সাথে সাথে জানিয়েও দিয়েছেন কেন তিনি সে আদেশ দিলেন। রমাদান আসলেই আমরা তাই মসজিদে মসজিদে খতিবদের মুখে সুরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াত শুনি – লা’আল্লাকুম তাত্তাক্বুন। আমাদের হতভাগ্য যে কেউ আমাদের বুঝিয়ে দেয়না আসলে তাক্বওয়া বলতে কি বোঝায়, কেন আল্লাহ আমাদের পুরো একমাস সিয়াম পালন করতে বাধ্য করেছেন।

তাকওয়া শব্দটি যে আরবি মূল থেকে এসেছে তার অর্থ নিরাপত্তা। রসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিয়ামকে ঢালের[১] সাথে তুলনা করেছেন, যে ঢাল তাকে নিরাপত্তা দেবে। কিসের থেকে নিরাপত্তা? ব্যক্তির অন্যায় থেকে তাকে এবং অন্যান্যকে নিরাপদ রাখে তাকওয়া। অন্যায়ের ফলাফল থেকে নিরাপদ থাকতে হবে এই বোধের নাম তাকওয়া। এই বোধটা যখন মানুষের মনে জাগ্রত থাকে তখন সে খারাপ কাজ করার আগে দু’বার ভাবে, কোন একটা ভাল কাজ করার সুযোগ পেলে ঝাপিয়ে পড়ে সেটা করতে। জীবনের প্রতিটি মূহুর্তে আল্লাহর পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপারে সজাগ থাকার নাম তাকওয়া। ইমাম ইবনে কাসিরের মতে তাকওয়া মানে অপছন্দনীয় কাজ থেকে বিরত থাকা। উবাই বিন কা’ব উমার ইবনুল খাত্তাবকে (রাদিয়াল্লাহু আনহুম্মা) বলেছিলেন – কাঁটাভরা পথে কাপড় গুটিয়ে সাবধানে চলার নাম তাকওয়া[২]।

রমাদান মাসের বাধ্যতামূলক সিয়ামটা আসলে একটা পুনর্বাসন প্রকল্প। এ প্রকল্পটা মানুষের সত্ত্বার সাথে সম্পর্কিত বিধায় মহান আল্লাহ আগেও মানুষকে সিয়ামের বিধান দিয়েছিলেন। এজন্য আমরা ইহুদিদের ইয়োম কিপুর বা তিশআ বা’ভ, নাসারাদের absolute fasting কিংবা হিন্দুদের নিরম্ভু উপবাসের মত ধর্মীয় আচার পালন করতে দেখি। কালের স্রোতে এদের মত আমাদের মুসলিমদের ‘সিয়াম’টাও নেহায়েত ‘রোযা’ অর্থাৎ না খেয়ে থাকা হয়ে গিয়েছে। অথচ সিয়াম শব্দটার অর্থ ছিল বিরত থাকা, ফযরের শুরু থেকে সূর্যাস্ত অবধি আল্লাহর নিষিদ্ধ করা সব কিছু থেকে বিরত থাকা। মানুষ এক বছর নিজের খেয়ালখুশী মত চলতে চলতে পশুর পর্যায়ে নেমে যায়, রমাদানের এক মাসে আল্লাহ মানুষকে এমন একটা ইবাদাত পালনে বাধ্য করেন যার মাধ্যমে সে আবার তার হারানো মনুষ্যত্ব ফিরে পেতে পারে।

ইমাম ইবনুল কায়্যিম দেখিয়েছেন যে একেক মানুষের মধ্যে একেকরকম পশুসত্ত্বা প্রবল। কারো স্বভাব কুকুরের মত, যতক্ষণ না তাকে একটা হাড় ছুড়ে দেয়া হবে ততক্ষণ ঘেউ ঘেউ করতে থাকবে। এরা কিছু পাওয়ার জন্য হাত পেতে থাকে – কিছু পেলে খুশীতে গদগদ হয়ে লেজ নাড়তে থাকে, যদি না দেওয়া হয় তবে দাঁত বের করে তাড়া করবে। যে কিছু দেবে তার সে গোলাম বনে যাবে; দাতার মহত্ব তাকে এমনই গ্রাস করবে যে ন্যায়-অন্যায় বিচার গৌণ হয়ে যাবে, দাতার তুষ্টি হয়ে যাবে মূখ্য। অপরদিকে যার কাছ থেকে সে কিছু পাবেনা, তার ক্ষতি করতে সে বিন্দুমাত্র পিছপা হবেনা। সিয়াম রাখতে হয় দিনে, যখন সে জেগে থাকে, কাজ করতে থাকে। একজন সায়েম কিভাবে উপার্জন করছে সেদিকে লক্ষ্য রাখবে, কতটুকু তার প্রাপ্য, কতটুকু প্রাপ্য নয় সেটা সে চিন্তা করে দেখবে। আবার তার প্রাপ্তির বিনিময়ে সে কি দিল সেটাও সে মাথায় রাখবে। সবচেয়ে বড় কথা আমাদের বিশ্রী ব্যবহারের রাশ টেনে ধরার জন্য সিয়াম খুব বড় একটা অস্ত্র। কারো সাথে খারাপ আচরণ তো দূরের কথা, কেউ গায়ে পড়ে এসে ঝগড়া করতে চাইলে রসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের বলতে বলেছেন – ‘আনা স’ঈমুন, আনা স’ঈমুন’, অর্থাৎ দু’বার বলা যে “আমি সিয়াম পালন করছি”[১]। এর মানে এই না যে তাকে জানান দিলাম – আমি রোযা আছি দেখে তুই আজকে বেঁচে গেলি। এর মানে নিজেকে বার বার বলা – আমি আত্মনিয়ন্ত্রণ শিখছি। আল্লাহকে খুশী করার জন্য আমার ক্রোধ, প্রতিশোধ নেবার ইচ্ছেকে দমন করা শিখছি। এর অন্যথা হলে রসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাবধান করেছেন:

“যে বাতিল কথা ও কাজ এবং মূর্খতাপূর্ণ আচরণ পরিত্যাগ করল না, তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।” [৩]

রমাদানের সমার্থক শব্দ দান। পৃথিবীতে মানুষ পেতে আসেনি, দিতে এসেছে – এই বোধটা তার মধ্যে জাগ্রত হবে। আরেকজন সায়েমকে ইফতার করানো মানে যে একটা সিয়ামের সমান সাওয়াব – এই তথ্যটা তাকে মনে করিয়ে দেবে রিযক নিয়ে কুকুরের মত কামড়াকামড়ি করা মানুষের কাজ নয়, মানুষের কাজ অল্প একটু খাবার হলেও সেটা সবার সাথে ভাগ করে মিলেমিশে খাওয়া।

গাধা বোঝা বহন করে। জ্বালানী কাঠ, খাবার বা পোশাক – কোন কিছুতেই তার ভাগ নেই – তবু সে পিঠে ভার নিয়ে চলতেই থাকে। আমাদের মধ্যেও তেমনি কিছু মানুষ আছে যাদের পিঠে জ্ঞানের বোঝা, অথচ তা থেকে তাদের বিন্দুমাত্র উপকার হয়না। এরা অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করে একটি মাত্র হরমোন কিভাবে পুরো দেহে শতখানেক জৈবিক বিক্রিয়া শুরু করে যার প্রভাবে মানুষ আস্তে আস্তে রাতে ঘুমিয়ে যায়। অথচ যে আল্লাহ এত নিখুঁতভাবে ধারাবাহিক বিক্রিয়াসমেত পুরো ঘটনাকে সাজালেন, সে আল্লাহ মানুষকে ঘুমের মাধ্যমে কি শিক্ষা দিলেন সেটা আর তার জ্ঞানী মাথায় ধরেনা। স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি থেকে পিলপিল করে শিক্ষিত মানুষ বের হচ্ছে যাদের অর্জিত শিক্ষা তাদের কোনটা ভাল, কোনটা মন্দ শেখাতে পারেনি। আপাত ধার্মিক এমন অনেক মানুষেরই রাতের তারাউইর সলাত কষ্টের বোঝা বাড়ায়, না জীবনে, না মননে কোন পরিবর্তন আনে। এ মাসে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছিল, রসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার শিক্ষক জিবরিলের কাছে রমাদানে একাধিকবার কুরআন পড়ে শেষ করতেন। তাই আমরাও কুরআনকে ‘খতম’ করি মসজিদে মসজিদে। আমরা হাফেজ সাহেবকে তাড়া দিয়ে যাই তাড়াতাড়ি শেষ করার জন্য, কারো কাছে বসে কুরআন পড়তে শেখা, মানে বোঝা তো বহু দূরের কথা। সারাবছর যে গাধাগুলো বোঝা বহন করে চলেছে, রমাদানে তারা বাড়তি বোঝা চাপাল; মানুষ হবার সুযোগ আর পেলনা।

মানুষের মধ্যে একদলকে বলদ বললে অত্যুক্তি হয়না। এদের জীবনের লক্ষ্য ‘কাজ’ করা। ঘানি ঘুরলে তেল বের হয়, মাঠ চাষ করলে ফসল ফলে। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ঘানি কিংবা জোয়াল টেনে এরা ঘরে গিয়ে ঘুমায় আবার পরের দিনে একই কাজ করার জন্য। যে কাজের ফলাফল চোখে দেখা যায়না সেটা তাদের কাছে অকাজ। এভাবে আমৃত্যু তারা অন্য মানুষের গোলাঘর কিংবা তেলের শিশি ভরে যায়। কাজের ব্যস্ততায় তারা ভুলে যায় যে মানুষ পৃথিবীতে আয় করতে আসেনি, এসেছে আল্লাহর ইবাদাত করতে। হালাল অর্থ উপার্জন করা ইবাদাতের অংশ, কিন্তু এটাই জীবনের সব নয়। জীবনের অংশকে যেন মানুষ পুরো জীবন ভেবে ভুল না করে সেজন্য আল্লাহ সিয়ামের মাধ্যমে তার কাজকে থমকে দেন, কর্মস্পৃহা কমিয়ে দেন; আল্লাহর জন্য, পরিবারের জন্য সময় বের করতে বাধ্য করেন। কিন্তু আমরা পুরো ব্যাপারটাকে উলটোভাবে নিয়েছি। যে বাসায় এগার মাস দু’পদ রান্না হত সে বাসায় রমাদানে চার পদ খাবার হয় – গৃহকর্ত্রীর আর কুরআন পড়ার সময় জোটেনা। ইফতারের পর যদিওবা ফুরসত মেলে, সেই সময় চলে যায় ঈদের জন্য কেনাকাটা করতে। ব্যবসায়ী আর ক্রেতা সবারই নাভিশ্বাস ওঠে, ফরজ সলাতটাও ইফতারের উচ্ছিষ্ট সালাদের মত ভাগাড়ে চলে যায়।

কিছু মানুষ আছে স্বভাবগতভাবেই বিদ্রোহী। এরা অনেকটা ইদুঁরের মত, খাদ্য-অখাদ্য – সামনে যা পায় তাই দাঁতে কাটতে থাকে। কারো কর্তৃত্ব মানতে এরা রাজী নয় – সবকিছুকে ধ্বংস করা, নষ্ট করা এদের কাজ। এমন মানুষদের আল্লাহ সিয়ামের মাধ্যমে শিক্ষা দেন যে যেখানে কারো কর্তৃত্ব চলে না, সেখানেও আল্লাহর কর্তৃত্ব আছে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন মানুষকে অবকাশ দিলেও তিনি সবকিছু দেখছেন, শুনছেন। ক্ষুধা এবং পিপাসার মত অবিচ্ছেদ্য জৈবিক সত্ত্বাকে যদি মানুষ একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দমন করতে পারে তাহলে কেন সে নিজের কুপ্রবৃত্তিকে দমন করতে পারবেনা? হালাল খাবারকে একটা সময়সীমায় হারাম সাব্যস্ত করে মহান আল্লাহ মানুষকে জানিয়ে দেন হালাল-হারামের সীমা নির্ধারণ মানুষের জ্ঞানের উপরে নির্ভর করে না, আল্লাহর জ্ঞান ও ইচ্ছার উপরে নির্ভর করে। এই সীমা যে লঙ্ঘন করবে তার জন্য ক্ষতি ছাড়া অন্য কিছুই নেই। সূর্যাস্তের সাথে সাথে ইফতারের মধ্যে কল্যাণ আছে বলে রসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের জানিয়েছেন[৪]। আমরা যেমন না খেয়ে ছিলাম আল্লাহর আদেশে, সূর্যাস্তের সাথে সাথে খাবার মুখে দেয়াও আল্লাহর নির্দেশ মানার জন্য। লক্ষ্যণীয়, এখানে আরো কিছুক্ষণ না খেয়ে থেকে কষ্ট করার মধ্যে তাকওয়া নেই; তাকওয়া আছে রসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতের অনুসরণের মধ্যে।

কিছু মানুষের মধ্যে রয়েছে বিষধর সাপের বৈশিষ্ট্য। এরা মানুষের ভাল দেখলে সহ্য করতে পারেনা, ‘আইনুল হাসাদ’ অর্থাৎ দৃষ্টির হিংসার বিষে এরা মানুষের ক্ষতি করে। এদের কথার বিষে ভাই-ভাইয়ে শত্রুতা সৃষ্টি হয়, পরিবার ভেঙ্গে যায়। নিজের অজান্তে বলে ফেলা একটা ছোট্ট কথা মানুষকে বড় আঘাত করতে পারে, তার মনের শান্তি কেড়ে নিতে পারে। এজন্য সিয়ামের মাধ্যমে আল্লাহ মানুষকে আদেশ দিলেন জিহ্বা সংবরণ করার জন্য – পরনিন্দা এবং পরচর্চা না ছেড়ে দিলে সিয়াম পালন করে লাভ নেই, আছে শুধু অনর্থক ক্ষুধার কষ্ট[৫]। মানুষের উন্নতি দেখে, সুন্দর কিছু দেখে ঈর্ষাকাতর হবার বদলে ইসলাম আমাদের তাই শিক্ষা দিয়েছে তার কল্যাণের জন্য দু’আ করতে।[৬] যা কিছু সুন্দর, যা কিছু মঙ্গল তা যেন আল্লাহ বাড়িয়ে দেন – মানুষের মনকে উদার করার, ভেবেচিন্তে কথা বলার যে শিক্ষা সিয়াম দিয়েছিল সেটাও আজ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।

বনের হিংস্র পশুদের সাথে মানুষের পার্থক্য হল – পশুরা অন্যের অধিকারের তোয়াক্কা করেনা, মানুষ করে। কিন্তু আজ সন্ধ্যাতেই কিছু মানুষ ঝাপিয়ে পড়বে অফিসফেরতা কারো উপরে, ছিনিয়ে নেবে মাসের বেতনটা। হালালভাবে টাকা আয় করা যে কত পরিশ্রমের ব্যাপার এটা যারা করে তারাই বোঝে। সেই কষ্টের উপার্জনটা যখন অন্যায়ভাবে কেউ ছিনিয়ে নেয়, তখন যে কি কষ্ট লাগে সেটা যার গেছে শুধু সেই বোঝে। দেশের গরীব মানুষদের উপরে চাপিয়ে দেয়া করের টাকাতে যেসব সংসদ সদস্য-মন্ত্রী-আমলারা বাড়ী-গাড়ি করে, তারা আবার সারাদিন সিয়াম শেষে ইফতার পার্টিও দেয়। আল্লাহর দ্বীনের সাথে এতবড় প্রহসন করা মানুষগুলো বোঝেনা আল্লাহর সাথে করা পাপ হয়ত আল্লাহ ক্ষমা করবেন, কিন্তু মানুষের সাথে করা পাপের ক্ষমা মানুষের কাছ থেকেই নিতে হবে। পৃথিবীর আদালতে বিচার হয়না বলে কি আল্লাহর আদালতে বিচার হবেনা? সিয়াম আমাদের শিক্ষা দেয় লোভ সংবরণ করতে। হারাম টাকা দিয়ে কেনা চকবাজার থেকে ইফতারির চেয়ে রিকশা চালিয়ে এক মুঠ মুড়ি দিয়ে ইফতার করা ভাল। ভাল থাকার লোভ, ভাল পড়ার লোভ, ভাল খাওয়ার লোভে যদি পেটে আগুনই ভরলাম তাহলে আর রোযা থাকার মানেটা কি?

কিছু মানুষের মধ্যে আছে শুকরের চরিত্র। পৃথিবীর যাবতীয় ক্লেদ-মলের প্রতি এদের আগ্রহ, ভাল কোন কিছু এদের মুখে রোচে না। স্বভাবগত নোংরামির কারণে এদের কাছে সম্পর্কের পবিত্রতা রক্ষার চেয়ে জননেন্দ্রিয়ের সুখই প্রধান। বিবেকহীন ভোগ আর যৌনতায় আক্রান্ত মানুষদের জন্য সিয়াম অনেক বড় একটা ধাক্কা। বিয়ের মত পবিত্র একটা সম্পর্কে বাঁধা দুটো মানুষ যখন সিয়ামের জন্য দিনের সিংহভাগ সময় বৈধ মেলামেশাকে ‘না’ বলতে বাধ্য হয়, তখন অভিশপ্ত অবৈধ সম্পর্কের পরিণাম কি হতে পারে?

মানুষ আর জানোয়ারে তফাৎ কি? মানুষও তো একধরণের জানোয়ার। উপরের বৈশিষ্ট্যগুলো কি আমাদের মধ্যে নেই? নিজের বিবেকের কাছে যদি প্রশ্ন করি তাহলে জবাব পাব – আছে; কোনটা কম, কোনটা বেশি। যেসব মানুষদের মধ্যে অনেকগুলো পশুর বৈশিষ্ট্য প্রবল হয়ে ওঠে তখন তারা চারপেয়ে পশুদের চেয়েও নিম্নস্তরে নেমে যায়। এরকম মানুষেরা অন্য মানুষদের প্রতি বর্ণনাতীত নৃশংসতা দেখায় যেটা পশুরাও করতে অক্ষম। কিন্তু মানুষ কিন্তু এমন পর্যায়ে একদিনে নামেনা, ধীরে ধীরে নামে। তাই মানুষের অধঃপতনটা ঠেকানোর জন্য আল্লাহ যেসব ইবাদাতের ব্যবস্থা করেছেন তার মধ্যে সিয়াম অন্যতম। সিয়ামের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর সেই সৃষ্টির অনুকরণ করে যাদের খাদ্য গ্রহণ অথবা প্রজনন কোনটারই প্রয়োজন পড়েনা। মালাইকা বা ফেরেশতাদের আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন এমনভাবে যে তাদের জৈবিক তাড়না বা পাপ করার ক্ষমতা কোনটাই নেই কিন্তু মানুষের তা আছে। মানুষ যখন জৈবিক চাহিদাকে দমন করে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য; লোভ-হিংসা-পরচর্চা-পরনিন্দা পরিত্যাগ করে নিজেকে বিশুদ্ধ করার জন্য; অন্যের সম্পদ-সম্মান-অধিকারকে সংরক্ষণ করে আল্লাহর শাস্তির ভয় থেকে বেঁচে থাকার জন্য তখন সে তার সব সীমাবদ্ধতা নিয়েও মালাইকাদের চেয়ে অধিক সম্মানিত বলে বিবেচিত হয়।

আমরা সিয়াম পালন করি আল্লাহর কাছে ফিরে যাবার জন্য, যে পাপের পোকাগুলো আমাদের মনুষ্যত্বকে খেয়ে ফেলে সেগুলো থেকে বাঁচার জন্য, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্য। বছরজুড়ে প্রতিদিন যেসব কাজ করে আমরা জাহান্নামের শাস্তি আমাদের জন্য নির্ধারিত করে নিয়েছি সেই কাজগুলো থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য আমরা সিয়াম থাকি। সিয়াম থেকে আমরা আল্লাহকে ধন্য করে দেইনা, নিজেরা নিজেদের বাঁচাই। তাই রসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিখিয়েছেন যেন আমরা রমাদানের শেষ লগ্নে এসে রাতের সলাতে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে আল্লাহকে বলি – “আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফুয়ান্নি” – হে আল্লাহ নিশ্চয়ই তুমি ক্ষমাশীল, তুমি ক্ষমা করতে ভালবাস, তুমি আমাকে ক্ষমা কর[৭]।

আল্লাহ যেন আমাদের পাশবিকতা থেকে আত্মরক্ষা করতে সাহায্য করেন, সিয়ামের মর্মবাণীটা বুঝে আমাদের সিয়াম পালনের তৌফিক দেন। আমিন।


[১] সহীহ আল বুখারি ১৮৯৪, সহীহ মুসলিম ১১৫১

[২] তাফসির ইবন কাসির, সুরা বাকারা আয়াত ২

[৩] সহীহ আল বুখারি ৬০৫৭

[৪] সহীহ আল বুখারি ১৯৫৭, সহীহ মুসলিম ১০৯৮

[৫] আহমাদ, আদ-দারিমী, ইবনু খুযাইমা

[৬] ইবনুল সুন্নী ‘আমল আল ইয়াওম ওয়াল লাইলে উল্লেখ করেছেন। ইমাম নাসিরুদ্দিন আলবানি আল কালিমা আল তায়্যিব গ্রন্থে হাদিসটির বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করেছেন।

[৭] মুসনাদে আহমাদ, ইমাম নাসিরুদ্দিন আলবানির মতে সহীহ


১৫ই রমাদান, ১৪৩৩ হিজরি।