[এক]

RAND শব্দটির পরিপূর্ণ রুপ হচ্ছে Research and Development Corporation. RAND কর্পোরেশন হলো আমেরিকার একটি এনজিও প্রতিষ্ঠান এবং এর কাজ হলো আমেরিকার সমরনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, কৌঁসুলি ও অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণী বা থিঙ্কট্যাঙ্ক হিসেবে গবেষণা করা। এই প্রতিষ্ঠানের গবেষণার ভিত্তিতেই চূড়ান্ত তর্কবিতর্কের মাধ্যমে যেকোনো ধরনের মার্কিন নীতি বা সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। RAND সৃষ্টি করা হয় দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পরে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে আমেরিকা প্রথমবারের মত সফলভাবে পরমাণু বিস্ফোরণের পর আমেরিকা আমেরিকান ফাইভ স্টার এয়ারফোর্সের একজন জেনারেল চিন্তা করেন আমেরিকা কে বিশ্ব দরবারে একক পরাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে এমন একটি গ্রেট টিমের প্রয়োজন যারা টেকনোলজি নিয়ে গবেষণা করবে। ঐ জেনারেলের নাম ছিল হেনরি হাপ আর্নল্ড (Henry “Hap” Arnold)।

১৯৪৬ সালে হেনরি কয়েকজন বিজ্ঞানীকে নিয়ে ১০ মিলিয়ন ডলারের একটি ফান্ড তৈরী করেন এবং সেখানে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন। তিনি তার গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নাম দেন RAND. ঐ সময়টাতে রকেট সাইন্স খুব একটা উন্নত ছিল না। RAND রকেট সাইন্স নিয়ে গবেষণা শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যে তারা মহাশূন্যে রকেট পাঠাতে সক্ষম হয়। RAND রকেট স্টেশন স্থাপন করতেও সক্ষম হয়। ঐ সময়কার আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রুমান তাদের এই স্টেশন ভিজিট করেন। আমেরিকান মিলিটারি তাদের এই সাফল্য দেখে অভিভূত হয়ে পড়ে। এভাবেই অল্প সময়ের মধ্যে RAND আমেরিকার বিভিন্ন একাডেমি, পলিটিসিয়ান, সিভিল সোসাইটির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়।

সফলভাবে মহাশূন্যে রকেট উৎক্ষেপণের পর RAND মিসাইল ও রকেট লাঞ্চার হেলিকপ্টার প্রযুক্তি আবিষ্কার করে ফেলে। তাদের সাফল্য দেখে আমেরিকান এয়ার ফোর্স RAND এর সাথে কন্ট্রাক্ট করে। ১৯৫৭ সালে এয়ার ফোর্স RAND এর প্রযুক্তি হায়ার করে মহাশূন্যে স্পাই স্যাটেলাইট তৈরী করতে সক্ষম হয়। এর নাম দেয়া হয়েছিল করনা (CORONA). দুই বছরের মধ্যে সোভিয়েত মোকাবেলায় করনা আমেরিকার সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্রে পরিনত হয়। করনা দিয়ে আমেরিকা প্রথম বারের মত রাশিয়া ও চায়না সীমান্তে স্পাই আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়। এর ফলশ্রুতিতে সোভিয়েত পত্রিকা Pravda RAND এর নাম দেয় the academy of science and death and destruction। ১৯৬০ সালের মধ্যে এভাবেই RAND নামক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সারা আমেরিকা সহ সারা বিশ্বের মধ্যে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।

RAND এর একের পর এক প্রতিভাবান আবিষ্কারের ফলে একসময় যুদ্ধ ক্ষেত্রে সোভিয়েত ইউনিয়নের চেয়ে আমেরিকা এগিয়ে যায় এবং দোদন্ড প্রতাপশালী হয়ে ওঠে। আমেরিকান এয়ারফোর্স মিলিটারি সামগ্রিকভাবে পেন্টাগনের কাছে RAND এর গুরুত্ব বহু গুণে বেড়ে যায়। গুরুত্ব এতই বেড়ে যায় যে RAND যেভাবে বলতো আমেরিকার যুদ্ধ নীতি সেভাবেই পরিচালিত হত। মুলত RAND এর সিদ্ধান্ত কোন একক ব্যক্তির হুকুম ছিল না। RAND এর শত-শত গবেষকরা গবেষণা করে যে ঐক্য মতে পৌছায় ওটাই RAND এর সিদ্ধান্ত।

ধীরে ধীরে RAND এর পরিধি বাড়তে থাকে। RAND শুধু যুদ্ধের জন্য প্রযুক্তি অনুসন্ধান করেই ক্ষান্ত থাকে নি। কিভাবে শত্রু পক্ষকে বিভক্ত করা যায়, জাতিগত দাঙ্গা হাঙ্গামা লাগিয়ে কিভাবে বিনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া যায় সেটাও অনুসন্ধান করতে থাকে। একেক দেশে/জাতির জন্য তারা একেক ধরণের নীতি অনুসন্ধান করে বের করে যাতে যুদ্ধ না করে সে দেশ বা জাতিকে আমেরিকার কর্তৃত্বাধীন করা যায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে খান খান করা মুলত RAND এর গবেষণার বাস্তবায়ন মাত্র।

মুসলিমরাও যাতে কখনো পরাশক্তি না হয়ে উঠতে পারে, বা আমেরিকার অধীনস্ত থাকে সেজন্য RAND বিপুল গবেষণা করে অনুসন্ধানী রিপোর্ট বের করেছে। আমেরিকান গভর্মেন্টের কাছে সেই অনুসন্ধানী রিপোর্ট জমা দেয়ার পর গভমেন্ট তা বাস্তবায়ন করছে। সেই ৬০ এর দশক থেকেই এই কার্যক্রম চলছে। সারা বিশ্বে আমেরিকান কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সব দেশের উপরেই গবেষণা চালিয়েছে RAND।

আমি এখানে একমাত্র মুসলিমদের ছাড়া অন্য কোন দেশ বা জাতির উপরে RAND এর অনুসন্ধান আলোচনা করব না। সেটার দরকারও নেই এই লেখায়, নতুবা অনেক বড় হয়ে যাবে।

পশ্চিমা সভ্যতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়ানোর প্রেক্ষিতে ইসলামপন্থাকে সর্বোত্তম উপায়ে সামাল দেয়ার জন্য RAND কর্পোরেশন মুসলিমদের 4 ভাগ ভাগ করেছে। সেগুলি হচ্ছে-

১। ঐতিহ্যবাদী (Traditionalist)
২। চরমপন্থী (Extremist)
৩। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী (Secularist)
৪। আধুনিকতাবাদী (Modernist)

ঐতিহ্যবাদীর (Traditionalist) মধ্যে রাখা হয়েছে বিভিন্ন পীর বুজুর্গ, সুফী ও এদের অনুসারীদের। এছাড়াও আরব রাজতন্ত্র সমর্থকদের রাখা হয়েছে এই ক্যাটাগরিতে।

বিভিন্ন দেশের মুজাহিদদের, ও শরীয়া আইন বাস্তবায়ন করতে চায় এমন ইসলামি দলকে চরমপন্থী গ্রুপে স্থান দিয়েছে RAND গবেষকরা।

মুসলিম কিন্তু শরীয়া আইন চায়না বা ঘৃণা করে এবং গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে এমন মুসলিম বা সরকারকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী (Secularist) গ্রুপে স্থান দেয় RAND।

যারা পশ্চিমা ধাপের ডিজুইস লাইফ পরিচালনা করে রাজনীতির ধার ধারে না তাদের আধুনিকতাবাদী (Modernist) ক্যাটাগরিতে ফেলে র‍্যান্ড।

RAND একমাত্র চরমপন্থিদেরকেই মুহাম্মাদ (সঃ) এর অরিজিনাল অনুসারী হিসেবে অভিহিত করে এবং এরাই একমাত্র আমেরিকার জন্য জন্য হুমকি বলে প্রকাশ করে। চরমপন্থিদের পতন করতে ও বাকি ক্যাটাগরির মুসলিমদের উত্থান করতে RAND আমেরিকা গভমেন্টের কাছে কয়েকদফা কার্যক্রম বাস্তবায়নের নির্দেশ দেয়। যেমনঃ

1. RAND শাষক তৈরি
2. RAND মিডিয়া তৈরী
3. চরমপন্থিদের দমন করা
4. RAND শায়খ তৈরী

[দুই]

২০০৩ সালে অ্যামেরিকান গ্লোবাল পলিসি থিংকট্যাঙ্ক RAND Corporation একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। ঠিক কীভাবে ও কাদের সহায়তায় অ্যামেরিকার বৈশ্বিক পলিসির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এক নতুন ইসলাম বানানো যায়, Civil Democratic Islam: Partners, Resources & Strategies নামের এই রিপোর্টে তা আলোচিত হয়। অ্যামেরিকাবান্ধব এই নতুন ‘ইসলামের’ নাম দেয়া হয় ‘মডারেট ইসলাম’ বা 'Civil Democratic Islam'। ২০০৭ সালে “Building Moderate Muslim Networks" নামে একটি বিস্তারিত ফলোআপ রিপোর্ট প্রকাশ করে RAND.

রিপোর্টগুলোতে মূলত ৩টি বিষয় আলোচিত হয়।

ক) কেন অ্যামেরিকাবান্ধব এই নতুন ‘ইসলাম’-এর প্রবর্তন ও প্রচার করা উচিৎ
খ) একজন মডারেট মুসলিমের বৈশিষ্ট্য
গ) কীভাবে মুসলিমদের মধ্যে এই ‘মডারেট ইসলাম’ –এর প্রচার ও প্রচলন করা যায়।

RAND এর এই রিপোর্টে বেশ কিছু সম্ভাব্য পলিসি নিয়ে আলোচনা করা হয়। তার মধ্যে একটি হল ইসলামের ব্যাপারে ‘পুরনো’ ধারণাকে ভেঙ্গে নতুন ভাবে ‘পশ্চিমা ইসলাম’, ‘অ্যামেরিকান ইসলাম’ – ধারণাকে প্রমোট করা। তার উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ পলিসি সাজেশান ছিল, 'মর্ডানিস্ট' ও ‘মডারেট’ দা’ই ও আলিমদের চিহ্নিত করা, তাদেরকে বিশ্বব্যাপী প্রমোট করা এবং তাদেরকে দিয়ে নতুন বই ও কারিকুলাম তৈরি করা। কীভাবে আপাত রক্ষণশীলদের (Conservatives) এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজে ব্যবহার করা যায় তা নিয়েও রিপোর্টগুলোতে আলোচনা করা হয়।[ক]

পরবর্তীতে ২০১৩ সালে Promoting Online Voices for Countering Violent Extremism নামে তৃতীয় একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে RAND. এই রিপোর্টে মডারেট ইসলামের প্রচারের জন্য এবং প্রকৃত ইসলামী শিক্ষাকে (যেটাকে RAND কট্টরপন্থা বলে) মোকাবেলার জন্য সোশ্যাল মিডিয়ার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়। কট্টরপন্থার বিপরীতে ‘সহিষ্ণুতা ও ক্ষমা’-র শিক্ষা দেয়া যেসব ‘মডারেট’ ‘শায়খ’, মুসলিম কমিউনিটি লিডার ও সংগঠনের নাম নির্দিষ্টভাবে এই রিপোর্টে আলোচিত হয় তাদের মধ্যে আছে – ইয়াসির ক্বাদি ও মুসলিমম্যাটারস, শুহাইব ওয়েব, হামযা ইউসুফ ও যায়তুনা, রাবিয়া চৌধুরি ইত্যাদি। RAND এর পলিসি বাস্তবায়নে এধরনের অন্যান্য ব্যক্তি ও সংগঠনের সোশ্যাল মিডিয়া উপস্থিতিকে কীভাবে কাজে লাগানো যায় তা নিয়েও আলোচনা করা হয় এই রিপোর্টে।[খ]

এই তিনটি রিপোর্টের বক্তব্য লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, ২০০৩ থেকে ২০১৩ এর মধ্যে RAND তাদের মূল পলিসি থেকে সরে না আসলেও, স্ট্র্যাটিজিক লেভেলে কিছু পরিবর্তন এনেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে লক্ষণীয় পরিবর্তন হল ‘মডারেট ইসলাম’ প্রচারের জন্য মর্ডানিস্টদের বদলে, ‘মডারেট’ মুসলিমদের তাদের প্রধান পার্টনার হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

RAND এর ভাষায় যারা ‘কট্টরপন্থী মুসলিম’, তাদের জন্য মর্ডানিস্টমডারেটদের মধ্যে পার্থক্য করা অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়। অনেকেই দুটোকে এক করে ফেলেন।

অনেকে দুটোকে এক ভাবেন। তবে দুটোর মধ্যে পার্থক্য আছে। যেমন RAND ২০১৩-এর রিপোর্টে উল্লেখিত ব্যক্তিদের রাবিয়া চৌধুরি একজন মর্ডানিস্ট, আর ইয়াসির ক্বাদি এবং সমমনারা ‘মডারেট’।

'মর্ডানিস্ট' মুসলিমরা মোটামুটি খোলাখুলিভাবে ইসলামের বিধিবিধানকে অস্বীকার করে, বা সেকেলে বলে। শারীয়ায় আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা, হাদীস অস্বীকার করা, ব্যক্তিগত জীবনে ইসলাম পালনকে প্রয়োজনীয় মনে না করা – এগুলো 'মর্ডানিস্টদের' বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অন্যতম।

অন্যদিকে ‘মডারেট’-রা কখনোই শারীয়াহ, হাদীস কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে ইসলাম পালনের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করে না। বরং তারা শারীয়াহকে নতুনভাবে ‘সময়োপযোগী ভাবে’ ব্যাখ্যা করা, সংস্কার করা, কিংবা শারীয়াহর ব্যাপার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের কথা বলে। তবে কাফিরের সংজ্ঞা, আল ওয়ালা ওয়াল বারা, ইসলামী শাসনব্যবস্থা, ফ্রি-মিক্সিং, সমকামী বিয়ে, কোন রাষ্ট্রের পরিবর্তে মুসলিম উম্মাহর প্রতি আনুগত্য, গণতন্ত্র, উদারনৈতিক মূল্যবোধ (Liberal Values), মুসলিম বিশ্বে পশ্চিমা সামরিক আগ্রাসনের প্রতিরোধকারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি – ইত্যাদির দিক দিয়ে 'মর্ডানিস্ট' ও 'মডারেটদের' অবস্থান আইডেন্টিকাল অথবা অত্যন্ত কাছাকাছি। অর্থাৎ তাদের দর্শনের যে পলিটিকাল ডাইমেনশান, সেটা একই। কিন্তু ব্যক্তিগত ও সামাজিকজীবনের কিছু কিছু প্রশ্নে তারা দ্বিমত করে। বোঝার সুবিধার জন্য বলা যায় মর্ডানিস্টরা হল নব্য-মু’তাযিলা, আর মডারেটরা হল গ্বুলাত আল-মুরজিআ।

RAND এর অবস্থান থেকে, সার্বিকভাবে এ দুই দলের গন্তব্য এক হলেও তাদের অগ্রসর হবার পথ ও পদ্ধতি ভিন্ন। খোলাখুলিভাবে ইসলামের অনেক কিছু অস্বীকার করার কারণে সাধারন মুসলিমদের মধ্যে 'মর্ডানিস্টদের' গ্রহণযোগ্যতা কম। অন্যদিকে ‘মডারেট’-রা কুর’আন-হাদিসের বক্তব্য ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে, মুহাদ্দিস ও ফক্বিহগণের বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন মত ইচ্ছেমতো খুজে বের করে আপাতভাবে ইসলামিক ফতোয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন অবৈধ বিষয়কে বৈধতা দেয়। খোলাখুলি শারীয়াহর বিরুদ্ধে বলে না। তারা ব্যক্তিগত জীবনে ইসলাম পালনের গুরুত্বের কথা বলে। তাই সাধারন মুসলিমরা অধিকাংশ সময়ই তাদের বাস্তবতা বুঝতে পারে না। RAND – এর মূল উদ্দেশ্য যেহেতু মুসলিম উম্মাহর ভেতর থেকে ইসলামকে পরিবর্তন করা, তাই স্বাভাবিকভাবেই মর্ডানিস্টদের চাইতে মডারেটরা তাদের জন্য আরো বেশি কার্যকর।

২. ২০১৬ সালে উইকিলিকসের প্রকাশিত কিছু ডকুমেন্টে দেখা যায়, বিলিয়েনেয়ার অ্যামেরিকান জর্জ সরোসের Open Society Foundation (OSF), অ্যামেরিকান মুসলিমদের পেছনে লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তাদের উদ্দেশ্য অ্যামেরিকান মুসলিমদের, মুসলিম পরিচয়ের বদলে উদারনৈতিক (Liberal) দর্শন ও এজেন্ডার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি প্রগতিশীল জাতিগত পরিচয় (progressive ethnic identity) তৈরি করা। এর মাধ্যমে তারা চায় অ্যামেরিকান মুসলিমরা নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়ের বদলে নিজেদের জাতিগত অথবা বর্ণগত পরিচয় আকড়ে ধরুক, প্রচলিত ধর্মীয় অবস্থান থেকে সরে আসুক এবং সমকামী বিয়েসহ অন্যান্য বিকৃতি গ্রহণযোগ্য হিসেবে মেনে নিক। জর্জ সরোস ডেমোক্রেটিক পার্টির সাথে যুক্ত, এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির বিশ্লেষন হল অ্যামেরিকার সমাজকে এধরনের জাতিগত ও বর্ণগত পরিচয়ের দিক দিয়ে ভাগ করা তাদের নির্বাচনী রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একারণেই Black Lives Matter, Gender Fluidity সহ এধরনের বিভিন্ন ইস্যুকে তারা প্রচুর টাকা পয়সা খরচ করে সমর্থন দেয়। সহজেই বোঝা যায়, জর্জ সরোসরাও RAND এর মতোই তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কিছু মুসলিম নামধারী ‘শায়খ’, দা’ই কিংবা কমিউনিটি লিডারদের ব্যবহার করবে। ইতিমধ্যে লিন্ডা সারসুর জাতীয় মহিলাদের উত্থান ও তাদের প্রতি মিডিয়া সাপোর্ট থেকে এর প্রমাণও পাওয়া যায়।[গ]

৩. RAND Corporation 'মডারেট ইসলামের' প্রসারের ক্ষেত্রে দু’টো মূল হুমকি চিহ্নিত করেছিল। একটি হল ভারতীয় উপমহাদেশের বা একই ধারার অন্য মাদ্রাসাগুলো, এবং অন্যটি হল ‘ওয়াহাবি বা সালাফি’ ইসলাম। বিশেষ করে ‘ওয়াহাবি’ ইসলামকে তারা সবচেয়ে বড় আদর্শিক শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তাদের বিশ্লেষন অনুযায়ী ইসলামের সকল ধারার মধ্যে এই ধারা পশ্চিমের প্রতি সবচেয়ে শত্রুতাপূর্ণ, কট্টর ও যুদ্ধংদেহী।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলোর সরকারী স্বীকৃতি ‘অর্জন’ এবং মাদ্রাসাগুলোর সিলেবাসে সরকারী হস্তক্ষেপ তথা পরিবর্তন আনার ব্যাপারে বেশ কিছু খবর ও আলোচনা আমরা দেখছি। পাকিস্তানের মাদ্রাসাগুলোর ক্ষেত্রেও অনেকদিন ধরেই এধরনের পরিবর্তন আনার চেষ্টা চলছে। এ ঘটনাগুলোকে কাকতালীয় ভাবার কোন কারণ নেই। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব জুড়ে RAND এজেন্ডা বাস্তবায়নের যে কাজ চলছে, নিঃসন্দেহে এটা সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।

এই একই এজেন্ডার অংশ হিসেবে ‘ওয়াহ্‌হাবি ইসলামের’ মোকাবেলার জন্য সাউদি আরবে ইসলামি শিক্ষানীতি ও পাঠ্যসূচী পরিবর্তনের প্রক্রিয়া চালু হয়েছে।

অ্যামেরিকার সেক্রেটারি অফ স্টেইট রেক্স টিলারসান সম্প্রতি এক সেনেট হিয়ারিং এ ব্যাপারে কিছুটা আলোকপাত করেছে। টিলারসানের মতে ট্রাম্পের সাউদি সফর ও রিয়াদ সামিটে এ বিষয়ে সাউদি রাজপরিবারের সাথে একট সমঝোতা হয়। আর এরই অংশ হিসেবে সাউদি স্কুলগুলোর পাঠ্যসূচি থেকে ‘ওয়াহাবি’ আদর্শের বইগুলো বাদ দেওয়া এবং হচ্ছে, নতুন প্রজন্মের ইমামদের বিশেষ প্রশিক্ষন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।[ঘ]

নিঃসন্দেহে RAND, Open Society Foundation এবং আল-সাউদের এই নীতিগুলোর উদ্দেশ্য এক। পশ্চিমাবান্ধব, আত্মকেন্দ্রিক এমন এক ফিল-গুড ‘ইসলাম’ তৈরি করা যা আদতে কুফর। এসত্য পরিষ্কার যে মুখে সন্ত্রাস আর জঙ্গিবাদের বিরোধিতার কথা বললেও পশ্চিমের আসল সমস্যা ইসলাম নিয়ে। কারণ পশ্চিম যাদেরকে সন্ত্রাসী বলে তাদের বিরুদ্ধে ১৬ বছরের বেশি সময় ধরে তারা দুই মহাদেশ জুড়ে যুদ্ধরত অবস্থায় আছে। কিন্তু তাদের এসব পরিকল্পনা, যেগুলোর পেছনে তারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঢালছে, সেগুলোর উদ্দেশ্য কোন ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’-এর ধ্বংস না। এগুলোর উদ্দেশ্য ইসলামকে বদলে দেয়া। যদি তাদের সমস্যা সন্ত্রাস নিয়ে হয়, তাহলে কেন তারা ইসলামকে বদলে দিতে, ইসলামের নতুন পশ্চিমাবান্ধব ব্যাখ্যা তৈরি করতে, ইসলামের নতুন ভার্সন তৈরি করতে এতো কষ্ট করছে?

লক্ষণীয় বিষয় হল প্রতিটি ক্ষেত্রেই পশ্চিম তার পলিসি বাস্তবায়নের জন্য কাজে লাগাচ্ছে মুসলিম হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনকে। যারা মুখে ইসলামের কথাই বলছে কিন্তু বাস্তবে কুফরের দিকে উম্মাহ টেনে নিয়ে যাচ্ছে। যদি আসলেই নিজেদের দুনিয়া এবং আখিরাত নিয়ে আমরা চিন্তিত হই, তাহলে আমাদের ভাবা উচিৎ কেন ফিরাউন হঠাৎ করে মুসলিমদের বইগুলোতে কী লেখা আছে সেটা পরিবর্তনে উঠেপড়ে লেগেছে। আমাদের ভাবা উচিৎ ফিরাউন যার কাজে সন্তুষ্ট, ফিরাউন যাদেরকে প্রমোট করতে চায় তারা আসলে কী শেখায়? ঈমান আর কুফরের মধ্যে তারা কোন ঘাঁটিতে? ফিরাউন যেই ইসলাম চায় সেটা আসলে কোন ইসলাম। ফিরাউন যেই স্বীকৃতি দেয়, সেটা আসলে কীসের স্বীকৃতি?

তারা তাদের মুখের ফুঁৎকারে আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ তাঁর নূরকে পরিপূর্ণ করবেনই যদিও কাফিররা (তা) অপছন্দ করে। [আস-সাফ, ৮]

যদি আসলেই আমরা ইসলাম ও উম্মাহকে নিয়ে চিন্তিত হই তাহলে সোশ্যাল মিডিয়া গসিপ আর সেনসেশানালিযমের বদলে এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের বেশি মাথা ঘামানো উচিৎ। বাতিলের বিরুদ্ধে বাতিলের কাঁদা ছোড়াছুঁড়িতে অংশ না নিয়ে, মডারেট আর মর্ডানিস্টের কামড়াকামড়িতে কে 'দোষী' কে 'নির্দোষ' সেই অর্থহীন, ফালতু আলোচনায় সময় নষ্ট না করে, নিজের খেয়ালখুশির অনুসরণ না করে শারীয়াহ ও প্রমাণের মাপকাঠিতে হক্ব ও বাতিলকে চিনে নেওয়া উচিৎ। ভাবা উচিৎ, আমাদের তুচ্ছ অস্তিত্ব ও আত্মকেন্দ্রিক জীবনের বাইরে, ভালো ও মন্দের যে সংঘাত চলছে, আলো ও অন্ধকারের যে দ্বন্দ্ব চলছে তাতে আমরা কোন পক্ষ নিচ্ছি।


[ক] Civil Democratic Islam - http://ow.ly/f88Q30foshL, Building Moderate Muslim Networks - http://ow.ly/bcuV30fosjT

[খ] Promoting Online Voices for Countering Violent Extremism -
http://ow.ly/RJmT30foNWs

[গ] Open Society Foundation এর অভ্যন্তরীণ মেমোঃ http://ow.ly/zgnT30fovXm

[ঘ] টিলারসানের বক্তব্যঃ http://ow.ly/MwZs30fowsL


[তিন]


ড. ইসরার আহমেদ (রহঃ) সমকালীন যুগে কোরআন বিশ্লেষকদের অন্যতম। পাকিস্থানি এই মনীষী তার শুরুর জীবনে মাওলানা মওদূদীর সাথে জামায়াতে ইসলামিতে অতিবাহিত করলেও পরবর্তী সময়ে ভিন্ন আফকারের কারণে নিজেকে এ থেকে সরিয়ে নেন। তার একশোরও বেশী কিতাব পাওয়া যায়, এছাড়া অনেক মুহাদারাহর রেকর্ড ইউটিউবে ছড়িয়ে আছে। ক্বিয়ামাতের আলামত, জিহাদ, খেলাফত ব্যবস্থা, রাসুলের দাওয়াতী জীবন ইত্যাদি বিষয়ে ডক্টরের লম্বা হাত। ২০১০ এর শুরুর দিতে এই মহান মনীষী মৃত্যুবরণ করেন। রেখে গিয়েছিলেন হাজারো রূহানী সন্তান।

এই ভিডিওতে তিনি ইসলামের কোন ভার্সনটি আমেরিকা ও পশ্চিমের অনুকূলে আর কোনটি তাদের জন্যে হুমকি স্বরূপ সে বিষয়ে বেশ চমৎকার আলোচনা করেছেন।

-
রেন্ড কর্পোরেশন অফ আমেরিকা সদ্য একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। যা বেশ উঁচু লেভেলের থিংকট্যাংক। যাদের পরামর্শ আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বেশ আমলে নেয়। তাদের রিপোর্টে মুসলিমদের চার প্রকারে ভাগ করা হয়েছে ।

প্রথম প্রকার, সে সমস্ত লোক যারা ইসলামকে জীবনব্যবস্থা মনে করে। ধর্ম হওয়া ছাড়াও রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনব্যবস্থাও মনে করে। ধর্ম, বিশ্বাস ও প্রথা ঠিকাছে । তবে এর সাথে সাথে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনব্যবস্থাও মনে করে। এরা হলো আমাদের প্রথম শত্রু। যে কোনভাবেই হোকনা কেন আমাদের তাদেরকে ধ্বংস করতেই হবে। কেননা আমরা আমাদের বিরোধী কোন সিস্টেমকে প্রতিষ্ঠিত হতে দিতে পারিনা।

একটু চিন্তা করে দেখুন, চল্লিশ বছর জুড়ে যে স্নায়ুযুদ্ধ চললো তা তো কেবল সিস্টেমের যুদ্ধ ছিল। ধর্মযুদ্ধের তো নামও ছিলনা। পশ্চিমের সবাই ছিল খ্রিষ্টান আর রাশিয়ানরা কি ছিল? কাজাকস্থান ও অন্যান্য কিছু মুসলিম দেশ ছাড়া সোভিয়েতেরও প্রায় সব দেশ খ্রিষ্টান ছিল। এই যুদ্ধে ধর্মের কোন গন্ধও ছিলনা। সিস্টেম ছিল মূল কারণ। আমাদের পুঁজিবাদী সিস্টেমের বিরুদ্ধে এই কম্যুনিস্ট সিস্টেম বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে। না সহ্য করা যাবেনা। তো চরমপন্থীদের ব্যাপারে তাদের পলিসি একদম পরিষ্কার। আমাদের তাদেরকে ধ্বংস করতেই হবে।

দ্বিতীয় প্রকার হলো, ঐতিহ্যবাদী মুসলমান। ঐতিহ্যবাদি ওলামা। এরা নিজস্ব মসজিদ মাদ্রাসায় কুরআন হাদীস নিয়ে সীমাবদ্ধ আছেন। এরা নিজেরা অতটা ভয়ংকর নয়। কিন্তু এরা যদি চরমপন্থীদের সাথে মিলে যায় তাহলে খুব বেশী ভয়ংকর হয়ে উঠে।

কেননা এদের সাধারণ মানুষের সাথে বেশ ভালো সম্পর্ক রয়েছে। প্রতি জুমায় তাদের সমাবেশ হয়। ছোট সমাগম করতেও আপনার কত কসরত করতে হয়, পোস্টার প্রচার করতে হয়, কতভাবে প্রচারণা চালাতে হয় এরপরও কয়জন আসবে? দুইশো চারশো চলে আসলেও অনেক।

আর এখানে মানুষ নিজেরা গোসল করে নতুন কাপড় পড়ে, আতর লাগিয়ে চলে আসছে। তো এরা চরমপন্থীদের সাথে মিলে গেলে খুব বেশী ভয়ংকর হয়ে যায়। তো এদেরকে পরস্পর থেকে দূরে রাখতে হবে। আর এদের মধ্যকার মতভিন্নতাকে উসকে দিতে হবে। যাতে এই ঐতিহ্যবাদিরা এক শক্তিতে পরিণত হতে না পারে।

তৃতীয় প্রকার হলো, আধুনিকমনা মর্ডানিষ্ট। যারা ইসলামকে পশ্চিমের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে ব্যাখ্যা করে। এই যে, পশ্চিমা সভ্যতার সাথে মিলিয়ে ইসলামের পুনর্ব্যাখ্যা হচ্ছে তারা বলে এটাই হলো কাজের কাজ। আমাদের এদেরকে সাপোর্ট ও সাহায্য করা উচিত। আর মিডিয়ায় এদের উপস্থিতিকে বড় করে দেখানো উচিত। কেননা মর্ডানিষ্টদের তো আর কোন মাধ্যম নেই। মসজিদে কে তাদেরকে ডুকতে দিবে? কে তাদের পিছনে নামাজ পড়বে? কে তাদের খোতবা শুনবে? জুতা মারামারি শুরু হবে। একারণে এদেরকে মিডিয়ায় সুযোগ দাও। আর সেই অনুযায়ীই করা হচ্ছে।

আর তারা চতুর্থ প্রকার বললো, সাধারণ মুসলিম জনগণ। এরা তো আমাদেরই লোক। এদের ব্যাপারে কোন কিছু বলার নেই। এরা তো শুধু এটুকু ধারণা করে যে, ইসলাম শুধু নামাজ, রোজা, হজ্জ, আকায়েদ ও যাকাতের নাম। আকীকা, বিয়েতে কবুল বলা, মৃত ব্যক্তির দাফন কাফন এগুলোই। ব্যস এগুলো তো করতেই পারে। এসবে আমাদের সাথে তাদের বিরোধ নেই। তারা এই ধর্মকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনব্যবস্থাও মনে করেনা। সেক্যুলার।

অতএব শেষ দুই প্রকারকে সাপোর্ট কর, আর প্রথমোক্ত দুই প্রকারের বিরুদ্ধে যা করার কর। সদ্যই এই পরামর্শ দেওয়া হয়েছে আমেরিকান সরকারকে।


[এক] সংগ্রহ করা হয়েছে Sohug Ahmed ভাই থেকে (আংশিক সম্পাদিত)

[দুই] সংগ্রহ করা হয়েছে Asif Adnan ভাই থেকে

[তিন] সংগ্রহ করা হয়েছে Arshad Ansary ভাই থেকে