إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا إِنَّمَا يَدْعُو حِزْبَهُ لِيَكُونُوا مِنْ أَصْحَابِ السَّعِيرِ

"শয়তান তোমাদের শত্রু; অতএব তাকে শত্রু রূপেই গ্রহণ কর। সে তার দলবলকে আহবান করে যেন তারা জাহান্নামী হয়।" - (সূরা ফাতির-৬)

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

বনী ইসরাঈলের 'আবেদ বারসীসার কাহিনী আমরা কমবেশি অনেকেই জানি। এই কাহিনীর প্রধান শিক্ষা কী? অনেকে বলেন নারী-ফিতনার ভয়াবহতা, কেউ বলেন 'আবেদ হলেও শয়তানের ধোঁকা থেকে মুক্ত নয় কেউই ইত্যাদি।

এগুলো অবশ্যই শিক্ষণীয় বিষয়। তবে আমার কাছে এই ঘটনার সবচেয়ে শিক্ষণীয় যে দিকটি মনে হয়েছে, তা হল- শয়তানকে আন্ডারএস্টিমেট করার পরিণাম। আমাদের প্রায় সবার মধ্যেই কমবেশি এই বস্তুটা বিদ্যমান। আমরা যেন এমন একটা ধারণা নিয়ে থাকি যে শয়তান আমাদের ধোঁকা দেওয়ার সময় জানিয়ে দেবে-এটা আমার ধোঁকা। অথচ ব্যাপারটা পুরো উলটা। শয়তান এমনভাবে ধোঁকা দেবে যেন আমরা বুঝতেই না পারি যে এটা তার ফাঁদ। সে গুনাহের কাজগুলো আমাদের কাছে খুব পজিটিভ ভাবে উপস্থাপন করবে। সে আমাদের ধোঁকা দেবে এমন কাজের মাধ্যমে, যা আমাদের কাছে খুবই ভালোকাজ বলে প্রতীয়মান হবে, অথচ এর মাধ্যমেই ধীরে ধীরে ইসলামের ট্র্যাক থেকে আমরা বিচ্যুত হয়ে যাব। সত্যি বলতে কী, শয়তানের মারাত্মক ধোঁকাগুলোর বেশিরভাগ এভাবেই হয়ে থাকে। বস্তুত শয়তান তার ধোঁকা নিয়ে এমনভাবে হাজির হয় যে, আপনি তাতে পা দিতে একরকম বাধ্য হন, এক যদি না আল্লাহ্‌ হিফাযত করেন।

পথভ্রষ্টতার সূচনাঃ

ধরুন আপনি খুব ভালো ইসলাম পালন করা কোন ছেলে/মেয়ে। গান শোনেন না, মুভি দেখেন না। এখন শয়তান যদি আপনার কাছে এসে বলে-হলিউডের মুভি দেখ, আপনি কস্মিনকালেও এ কাজ করবেন না। সে কীভাবে ধোঁকা দেবে? সে প্রথমে আপনার কোন বন্ধুর মাধ্যমে আপনাকে প্ররোচনা দেবে ভালো কোন মুভি দেখার জন্য। বন্ধু বলবে-"চল দোস্ত ঐ ছবিটা দেখে আসি" আপনি বলবেন-"আমি মুভি দেখি না। হারামে লিপ্ত হওয়াকে আমি ভয় করি।" বন্ধু বলবে-"দোস্ত এই ছবিতে একটা খারাপ সিনও নেই। এমনকি কোন নারী চরিত্র পর্যন্ত নেই। কোন গানও নেই। কিশোরদের জন্য উদ্দীপনামূলক ছবি। চল দেখে আসি।" আপনি বলবেন- "এখন নামাজের টাইম। নামাজ পড়ব।" বন্ধু বলবে-"ওকে। মুভি তো নামাযের টাইমের পরেই।" (বস্তুত শয়তান জানে যে নামাযের টাইমে মুভি হলে আপনি দেখবেন না, তাই সে সেভাবেই উপস্থাপন করল)। যা হোক, নামাযের পর বন্ধুর জোরাজুরিতে আপনি মুভিটা দেখলেন। সত্যিই খুবই ভালো লাগল। এতই ভালো লাগল যে বাসায় এসে আপনি নেটে সার্চ দিলেন এই পরিচালকের আর কী কী শিক্ষামূলক ছবি আছে। দেখা শুরু করলেন। আস্তে আস্তে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এ ধরনের আর কী ছবি হচ্ছে খুঁজতে লাগলেন। দেখতেও থাকলেন।

এক বছর পর দেখা গেল আপনি হলিউডের মুভিতে আসক্ত। সেই ছবিতে অশ্লীল দৃশ্য আসলেও আপনি স্বাভাবিক বস্তু বলে ধরে নেন। এক বছর আগে কেউ আপনাকে যদি বলত আপনি এক বছর পর এমনটা করবেন, আপনি হয়তো বলতেন "আল্লাহ্‌ মাফ করুন। অমনটা হওয়ার আগে যেন আমার মৃত্যু হয়।" যে আপনি মুভি দেখাকে পাপ গণ্য করে বন্ধুকে রিফিউজ করছিলেন, সেই আপনি আজ হলিউডের মুভি দেখে সেটাকে "অনেক শিক্ষণীয় বিষয় আছে" বলে জাস্টিফাই করেন। অথচ এর শুরুটা হয়েছিল আপাতদৃষ্টিতে নির্দোষ এক মুভি দেখার মাধ্যমে।

মুভি দেখা সংক্রান্ত যা বললাম, এগুলো কোন কল্পকাহিনী নয়। আমাদের চারপাশের অনেক ইসলাম পালন করা ছেলেমেয়েই এভাবে শয়তানের ধোঁকায় পড়ে বদলে গেছে। অথচ শুরুটা ছিল হয়তো খুবই সামান্য একটি গুনাহের কাজ দ্বারা। সেই গুনাহের কাজটিকেও হয়তো তিনি 'ভালোকাজ' ভেবেই করেছিলেন।

জিম ভাই গতকাল একটা লেখায় বললেন, মুসলিমদের মধ্যে খেলাধুলার আসক্তি দূষণীয়। নিজেরা খেললেও একটা কথা থাকে, কিন্তু অন্যের খেলা ঘণ্টার ঘণ্টার পর দেখায় কোন কল্যাণ থাকতে পারে না।

অনেকেই বলবে, কেন? আপত্তি কেন? আমি তো খারাপ কিছু দেখছি না। চিয়ারলিডারদের আইপিএল-বিপিএলও দেখছি না। সাদা পোশাকের টেস্ট ম্যাচ বা লা-লীগাই তো দেখছি মাত্র। সমস্যা কোথায়?

হ্যাঁ, এটা ঠিক যে আপনি হয়তো গান-বাজনা বা মুভি দেখার মত সরাসরি নিষিদ্ধ কিছুর সাথে জড়িয়ে পড়ছেন না। কিন্তু আপাত নির্দোষ এ বিনোদনের মধ্যে শয়তানের বহু ফাঁদ জাল বিস্তার করে আছে। যেমন- প্রথমত, ঘণ্টার পর ঘণ্টা হওয়া খেলাগুলো আল্লাহ্‌র স্বরণ থেকে গাফেল রাখার মোক্ষম হাতিয়ার।

দ্বিতীয়ত, খেলাগুলো দেশকেন্দ্রিক হওয়ায় এবং নির্দিষ্ট দলের প্রতি সমর্থন থাকায় অন্তরের মধ্যে কুফরী জাতীয়তাবাদ ব্যাপক আকার ধারণ করে। 'মুসলিম' পরিচয়ের চেয়ে জাতীয়তাবাদী পরিচয় তখন মুখ্য হয়ে ওঠে। অনেক ইসলামপন্থীর মধ্যেও এটা দেখেছি। বাংলাদেশ কোন খেলায় জিতলে নিজেকে "বাংলাদেশী হিসেবে গর্বিত" বলে প্রকাশ করেন। অথচ এই আচরণ ইসলামের মূলনীতির সাথে কোনভাবেই যায় না।

তৃতীয়ত, কোন অমুসলিম খেলোয়াড়ের খেলা ভালো লাগায় ঐ মানুষের প্রতি ভালোবাসা জন্মাতে পারে, যা আল ওয়ালা ওয়াল বারাহ এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। নিজেকে ইসলামিস্ট বলে পরিচয় দেওয়া অনেককেই দেখেছি মেসি-রোনালদো বলতে অজ্ঞান। উপরন্তু এদের প্রতি আসক্তির কারণে এদের জাহেলিয়াতে পূর্ণ জীবনপ্রণালী দ্বারাও অনেকে প্রভাবিত হয়ে থাকেন। এভাবে শয়তানের প্ররোচনায় কখন যে অন্তরের মধ্যে ইসলামবিরোধী চেতনা লালিত হতে শুরু করবে, আপনি টেরই পাবেন না।

এভাবেই শয়তান ইসলামপন্থীদের পথচ্যুত করতে সাধারণত আপাতনির্দোষ কাজগুলোকেই ব্যবহার করে। "এটা তো গুনাহের কাজ নয়" ভেবে স্ট্রিকটনেস থেকে সামান্য ছাড় দেওয়াই হতে পারে বিরাট ক্ষতির কারণ। আল্লাহ্‌ আমাদের রক্ষা করুন।

রিয়া ও অহংকার জন্মানোঃ

কিছুদিন আগে একটা পোস্টে বলেছিলাম, আমাদের মসজিদের এক বয়স্ক মুসল্লি কিছু কথা বলছিলেন। তা এই যে, যখন একজন মানুষ ইসলাম পালন শুরু করে তখন শয়তান তাকে নানাভাবে ধোঁকা দেয়। প্রথমে শয়তান আমলগুলোকে অগুরুত্বপূর্ণ করে দেখায়। যেমন- "এটা তো খুবই ছোট আমল, এখন না করলেও চলবে"। এই ধোঁকাকে বুঝতে পেরে যখন মানুষ আরো দৃঢ়তার সাথে "আমি এটা এখনই করব" বলে সংকল্প করে, তখন শয়তান অন্যভাবে ধোঁকা দেয়। বলে, "তুমি তো খুবই ভালো ছেলে/মেয়ে। আশেপাশের ছেলেমেয়েরা কত অন্যায়ে লিপ্ত, অথচ তুমি কত ভালোভাবে ইসলাম পালন করছ।"

এভাবেই শয়তান আমাদের মধ্যে অহংকার সৃষ্টি করে। আমরা যারা ইসলামকে বুঝে পালনের চেষ্টা করি, তারা যেন শয়তানের এ ধোঁকায় পা দিয়ে কোনভাবেই আত্মতুষ্টিতে না ভুগি। আশেপাশের নন-প্রাক্টিসিং মুসলিমদের দেখে কোনভাবেই যেন মনের মধ্যে গরিমা না আসে। কখনোই যেন নিজেকে অন্যদের চেয়ে "উত্তম মুসলিম" না মনে করি। বরং যদি গুনাহে লিপ্ত হওয়া থেকে বেঁচে থাকতে পারি এটা একমাত্র আল্লাহরই অনুগ্রহ। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতায় আরো বেশি করে তাঁর দাসত্বে মনোনিবেশ করা জরুরি, অথচ অহংকার হল কৃতজ্ঞতার বিপরীত।

হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (রহ) এর মৃত্যুর পূর্বে শয়তান তাঁকে বলেছিল-"আমি একজন ফেরেশতা। আমি এই বার্তা নিয়ে এসেছি যে, তোমার ইবাদাতে খুশি হয়ে আল্লাহ্‌ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তোমার জন্য ইবাদাত মাফ করে দিয়েছেন। যত সময় বাঁচবে আল্লাহ্‌র ইবাদাত না করলেও চলবে।" আব্দুল কাদির শয়তানের ধোঁকা বুঝতে পারলেন। কেননা তিনি স্মরণ করলেন রাসূল (সা) এর কথা, যিনি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নামায ছাড়েন নি। তখন শয়তান তাঁকে বলল-"আব্দুল কাদির, আজ তুমি তোমার জ্ঞানের কারণে আমার ধোঁকা থেকে বেঁচে গেলে।" বস্তুত এ কথাটিও শয়তানের ধোঁকা ছিল। এই কথার মাধ্যমে সে আব্দুল কাদিরের মনে নিজের জ্ঞানের কারণে অহংকার জন্মানোর চেষ্টা করেছিল। আব্দুল কাদির এবারেও বুঝতে পেরে বলেন-"আমি কখনোই আমার জ্ঞানের কারণে শয়তান থেকে রক্ষা পাইনি, আমি পেয়েছি কেবল আল্লাহ্‌র দয়ার কারণেই।"

আব্দুল কাদির (র) এর মত বুজুর্গ ব্যক্তিকেও শয়তান এভাবে পথভ্রষ্ট করার চেষ্টারত থাকলে ভেবে দেখুন আমার-আপনার অবস্থা কী হবে!! আমরা প্রতিনিয়তই শয়তানের ধোঁকায় পড়ছি। তবু আমরা উদাসীন, যেন আমরা নিশ্চিত আছি শয়তান আমাকে পথভ্রষ্ট করতে পারবে না!! আমরা আমাদের ঈমান নিয়ে তুষ্ট আছি!! নিজেদের বড় ঈমানদার ভাবছি!! যেখানে সাহাবা (রা) এর অনেকে নিজেদের মুনাফিক ভাবতেন সেখানে আমাদের মত দুর্বলতম ঈমানের লোকদের অন্যের চেয়ে নিজেকে "উত্তম মুসলিম" ভাবা কতটা বোকামি, চিন্তা করে দেখছি কী???

শিরকের সূত্রপাতের প্ররোচনাঃ

আদম (আ) এর মৃত্যুর পর তাঁর প্রচারিত দ্বীনকে মানুষ যখন ভুলে যেতে শুরু করল, শয়তান প্ররোচনা দিল-"হে মানুষেরা, তোমরা অতীতের আবেদদের মূর্তি নির্মাণ কর। তাহলে তাদের মূর্তি দেখলে তোমাদের তাঁদের কথা স্মরণ হবে, তোমরাও ইবাদাত করতে উৎসাহ পারবে।" মানুষেরা তা ই করল। উদ্দেশ্য ছিল অতি মহৎ। কিছুদিন পর শয়তান বলল-"এই মৃতদের শ্রদ্ধা জানাতে তাদের উদ্দেশ্যে খাবার, ফুল উৎসর্গ কর।" মানুষেরা তা ই করল। এভাবে একসময় দেখা গেল তারা মূর্তিপূজা আরম্ভ করেছে। অথচ শয়তান যদি প্রথমেই তাদের বলত-"তোমরা মূর্তিপূজা কর", তাহলে কেউই রাজি হত না।

কী ভয়ংকর ব্যাপার, তাই না!! আজকে আমরা দেখি মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালানো, বর্ষবরণ উৎসব, শহীদকে শ্রদ্ধা জানাতে কবরে ফুল, এসব যেন আমাদের মুসলিমদের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। অথচ এই ব্যাপারগুলো শিরকের ভয়াবহতা ডেকে আনার মাধ্যম ব্যতীত কিছুই নয়। যা হোক, এই ব্যাপারগুলোর সাথে কীভাবে শিরক জড়িত তা আমরা চিন্তা করলেই বুঝতে পারি। তাই এ বিষয়ে আর কথা বাড়াবো না।

এমনিভাবে ইসলামের সংস্কৃতি ছাড়া অন্য সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে পড়লে কতভাবে যে অন্তরে কুফর আর শিরকের বীজ বোনা হয়ে যায়, আমরা কল্পনাও করতে পারি না।

আমাদের করণীয়ঃ

শয়তান থেকে বাঁচার প্রধানতম উপায় হল- আল্লাহ্‌র কাছে শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা। মনে রাখতে হবে, আল্লাহ্‌র সাহায্য আসবে আমাদের প্রচেষ্টার অনুপাতে। সেই প্রচেষ্টা হল দ্বীনের প্রতি সর্বোচ্চ ডিভোশন, ইসলামের ব্যাপারে কঠোর স্ট্রিকটনেস বজায় রাখা। যেহেতু শয়তান খুব ছোট কোন ব্যাপার দ্বারা তার ধোঁকার কাজ শুরু করে, কাজেই দ্বীনের ছোটখাট বিষয়ে ছাড় দেওয়ার অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে। ইসলামের বিধানের প্রতি পুরোপুরি আপোসহীন মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি কাজের আগে চিন্তা করতে হবে, আল্লাহ্‌র রাসূল (সা) এ কাজ করতেন কি না। তাছাড়া তিনি করলেও আমরা যে পদ্ধতিতে করছি ঠিক সেই পদ্ধতিতেই করেছেন কি না, যাচাই করে দেখতে হবে। কেননা হালাল কাজও রাসূল (সা) এর পদ্ধতিতে না করা পথভ্রষ্টতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

আল্লাহ্‌ আমাদের শয়তানের ফিতনা থেকে নিরাপদ রাখুন এবং দ্বীনের জন্য সর্বস্ব ত্যাগের মানসিকতা গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন।

"আর যদি শয়তানের প্ররোচনা তোমাকে প্ররোচিত করে, তাহলে আল্লাহর শরণাপন্ন হও; তিনিই শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী।" - (সূরা 'আরাফ-২০০)