"সব তরকারির আলু" হওয়াটা আমাদের বর্তমান সমাজব্যস্থায় মোটামুটি সেফ সাইড। আলু এমন একটা সবজি যেটা মোটামুটি সব তরকারিতে থাকে, তাকে সবাই খায়, যে খায় না সেও তরকারিতে আলু দেখলেও মুখ সিটকায় না, যে রাঁধে সে তরকারিতে নিশ্চিন্তে ইচ্ছেমত আলু দিয়ে দিতে পারে, কারণ এই আলু দেখে কেউ রাগ করবে না, না খেয়ে উঠে যাবে না। 

আমার অনেক প্রিয় মানুষ আছে, যাদের কেউ কেউ এই দুনিয়াতে আর বেঁচে নেই, ইচ্ছে হয় তাঁদের নিয়ে কিছু লিখি, কিন্তু লিখতে পারি না, কারণ তাঁরা সব তরকারির আলু নয়। অনেকের সাথে ঘুরেছি, ফিরেছি, তাঁদের কেউ কেউ এখন আর মুক্ত বাতাসে আমার মত ঘুরে বেড়াতে পারে না, ইচ্ছে হয় তাঁদের নিয়ে একটা আবেগঘন স্ট্যাটাস দিই, পারি না, কারণ তাঁরা সব তরকারির আলু নয়। লিখি যদিওবা, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লিখতে হয়, পাছে কেউ বুঝে ফেলে, কারণ সব তরকারির আলুর মত এরা সহজে হজমযোগ্য নয়।

আমরা ফিলিস্তিন নিয়ে কথা বলি, প্রতিবাদ করি, সোচ্চার হই, কারণ ফিলিস্তিন হলো সব তরকারির আলু, সবাই ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলে, মুসলিম থেকে অমুসলিম, আব্দুল্লাহ থেকে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, সবাই আমরা ফিলিস্তিনের উপর ইসরাইলের চলমান জুলুম নিয়ে একমত, তাই এর প্রতিবাদ আলুর মত সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য, হজমযোগ্য, বিশেষ করে যতক্ষণ তা শান্তিপূর্ণ, অসহিংসু, সে ইসরাইল যতই মানুষ মারুক না কেন। কিন্তু ইসরাইলের এই জুলুমের বিরুদ্ধে কেউ হার্ড লাইনে দাঁড়ালে, এই জুলুমের ইটের বিরুদ্ধে পাটকেল মারার যে বিধান ইসলামে আছে, সেই পন্থা গ্রহণ করলে সে তখন আর তরকারির আলু হিসেবে গণ্য হবে না। ইসরাইলের সমস্ত জুলুম একপাশে ফেলে এই "সব তরকারির আলু" থেকে বেরিয়ে যাওয়া অদ্ভুত সবজিটাকে খাবার টেবিল থেকে সরিয়ে দেওয়াটা তখন ফরয হয়ে যাবে! 

আমেরিকা গত দুই দশক ধরে আফগানিস্তানে যা করছে আমরা সবাই জানি এটা অন্যায়, জুলুম, আমরা এর টুকটাক প্রতিবাদও করি। কিন্তু আমেরিকার এই জুলুম আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা তালিবানের পক্ষে আমরা নই, তাঁদের বিজয়ও আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ সে আমাদের কাছে, আমাদের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া মিডিয়ার কাছে "সব তরকারির আলু" নয়। ইরাক, সিরিয়া, আরাকানে যা হচ্ছে নিঃসন্দেহে তা ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়, এটাও আমাদের কাছে "সব তরকারির আলু", কিন্তু সেটা তাঁদেরকে চাল, ডাল, থাকার জন্য খুপরি, কম্বল এসব দেওয়া পর্যন্ত। এর বাইরে গেলে কিন্তু ব্যাপারটা আর আলুর পর্যায়ে হজমযোগ্য থাকবে না। 

কথাগুলো হতাশার, মন খারাপের। কিন্তু আমরা ইয়াকিনের সাথে বিশ্বাস করি, একদিন সময় পাল্টে যাবে। FBI এর মিথ্যা মামলায় ফেঁসে কারাগারে যাওয়ার আগে আদালতে দাঁড়িয়ে তারিক মেহান্না আমেরিকার ইতিহাস, চলমান ধ্বংসযজ্ঞ এসবকিছু বর্ণনা করার পর শেষে বলেছিলেন, "একটা দিন আসবে, যেদিন এই আমেরিকা বদলে যাবে, বদলে যাবে এর মানুষগুলো, তারা বুঝবে আজকের এই দিনটিতে আসলে কি প্রহসন হয়েছিল। তারা আবিষ্কার করবে কিভাবে হাজার হাজার মুসলিমদের হত্যা করেছিল, পঙ্গু করেছিল আমেরিকান সেনাবাহিনী, আর তারপরেও তাদেরকে নয়, কিভাবে কিভাবে যেন কারাগারে যেতে হচ্ছে এই আমাকেই।"

বিষ পান করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার সময় সক্রেটিসের অনেক ছাত্র সেদিন সেখানে উপস্থিত হয়েছিল। সক্রেটিস বিষ পান করে চোখ বন্ধ করে ছিলেন, হঠাৎ তিনি চোখ খুললেন, তাঁর এক প্রিয় ছাত্রের দিকে তাকিয়ে বললেন, "এই দিনটির কথা তোমরা মনে রেখো।" মানুষ সেই দিনটির কথা মনে রেখেছে, মনে রেখেছে বলেই আজ আমরা জানি "সব তরকারির আলু" হয়নি বলে সক্রেয়টিসের সাথে অন্যায় হয়েছিল, আজ সে মানুষের কাছে হিরো, সেসময়ের "মূলধারা" আজ ভিলেন।

৭০০ জন আলেম ফতোয়া দিয়েছিল ইমাম আহমাদ (রহঃ)-কে হত্যা করা উচিত। সেটাই ছিল সে সময়ের "মূলধারা"। আজ তাকিয়ে দেখুন ইমাম আহমাদ কোথায় আর সেই "মূলধারা" কোথায়! 

সুতরাং "সব তরকারির আলু" না হলেও জীবন কারো থেমে থাকে না। হয়তো অপরিচিত, অবহেলিত, অত্যাচারিত এক অসহায় "ভিন্ন জাতের সবজি" হয়ে তাঁদের জীবনটা কেটে যায়, কিন্তু একদিন সময় আসবে, নিশ্চয় আসবে...


Friday, 8 February 2019 at 15:20