আজ আমার স্বপ্নগুলোর গল্প বলবো। হাসা যাবে না। আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে। মুচকি মুচকি হাসা যাবে।

স্বপ্ন জিনিসটাকে আমার সবসময় অদ্ভুত সুন্দর মনে হয়েছে। স্বপ্ন সম্ভবত ভেতরের সবচেয়ে সুন্দর সুন্দর আশার প্রতিফলন। ব্যাপারটা আমি এখনো ঠিক বুঝে উঠিনি, আর সেই চেষ্টাও নেই। আমি বড় বড় মানুষদের বড় বড় স্বপ্ন দেখেছি। তাঁরা বড় বড় স্বপ্ন দেখেন, মানুষকে স্বপ্ন দেখান। কিন্তু আমার কেন জানি মনে হয়েছে এই মানুষগুলো এতো এতো বড় হতে গিয়ে, এত বড় স্বপ্ন দেখতে গিয়ে জীবন থেকে মহামূল্যবান কিছু একটা খুইয়ে বসেছেন। তাঁদের স্বপ্নগুলো সুন্দর হয়, খুব সুন্দর, কিন্তু ওগুলোকে ছুঁয়ে দেয়া যায় না কখনো। বড়দের বোধহয় ওভাবে স্বপ্ন দেখতে হয়, যাতে ছোট কেউ ছুঁয়ে না দিতে পারে। ছোটরা যদি বড়দের বড় কোন স্বপ্নকে ছুঁয়ে ফেলে তাহলে তাঁদের চাপা অহংবোধ কেন আহত হয়, তা আমি এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। আমি খুবই সস্তা আবেগের ছোট আর সাধারণ একটা ছেলে। আমার স্বপ্নও তাই অতি অতি সস্তা আর সাধারণ।

সমাজের ক্যালকুলেটরে আমার স্বপ্ন গ্রাফ পেপারের নিচের দিকে নেমে গেছে। আমি আমার নিউরনে নিউরনে সাদাসিধে জীবনের স্বপ্ন বুনি। আমার স্বপ্নের থাকার ঘরটা কেমন বলবো? শুনলে হাসবে। কিন্তু হাসা যাবে না। মনে আছে, ছোটবেলায় টিভিতে সামুরাই এক্স নামে একটা কার্টুন সিরিজ দেখাতো? জাপানি কার্টুন। ওদের ঘর গুলো অদ্ভুত ছিমছাম। ঘরে কোন আসবাবপত্র নেই, কিচ্ছু না। শুধু ঘরের এক কোণে ভাজ করে রাখা তোষকের ওপর বালিশটা সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা। দেয়ালের এক পাশে মাঝারী আকারের একটা জানালা। সে জানালা দিয়ে আমার ঘরে আকাশ ঢুকে পড়ে।

ভাজ করে রাখা বিছানার পাশে সারি সারি বইয়ের রাশি। কোন শেলফে নয়, বরং ঘরের দেয়ালের সাথে লেপ্টে থাকা বইগুলো অনেকটা যেন বিচিত্র ওয়ালপেপারের কাজ করছে। ঘরে বিদ্যুতের সংযোগ না রাখায় ঘরে একটা পিচ্চি কিউট হারিকেন আছে। মাগরিবের পর ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা আওয়াজ আর বাইরের ঘুটঘুটে আঁধার আমার ঘরে ঢুকতে এসে হারিকেন দেখে বেশ অবাক হয়ে যায়। সেই হারিকেনের হলুদ আলোয় রাতের বেলায় মশারির ভেতর ঢুকে বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে যেতে ভারী মজা।

ফজরের আজানে ঘুম ভাঙলে জানালা দিয়ে বাইরের আকাশ দেখি। শেষরাতের আকাশ। শুয়ে শুয়ে দেখা। তারপর আড়মোড়া ভেঙ্গে উঠে মশারী, বিছানা গুছিয়ে উঠে পড়া। ভেজা ঘাসে খালি পায়ে হেঁটে হেঁটে টলটলে পানি ভর্তি পুকুর পাড়ে গিয়ে আঁজলা ভরা হাত মুখের সামনে ছিটকে ওঠে। আহ! ভোরের ওজুর পানি রাত্রি আর ঘুমের ক্লান্তি মুছে দেয়। মাসজিদে ফজরের সালাত পড়ে পাশের কোন কবরস্থানে যাওয়া। নিজের বাড়িতে ফিরে যাওয়া মানুষের জন্যে দু’আ করবো বলে। দু’আ শেষ করতে করতে ভোরের আলো ফুটে ওঠে। কিচিরমিচির চিকির চিকির শব্দে ভোরের কিউট কিউট পাখিগুলো হৈচৈ শুরু করে দেয়। আমি পুকুরপাড়ে বসে বসে সেই গান কান পেতে শুনি আর হাসি। তালগাছের পাতার ফাঁক চিরে সোনালি রোদ্দুর আমার কপাল ছুঁয়ে দেয় আলতো করে। পলকা বাতাস আমার চুলগুলোকে হালকা দুলিয়ে যায়। ভারী ভালো লাগে।

পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ি। টলটলে পানির উপর মাথাটা ভাসিয়ে সারা শরীর পানিতে ডুবিয়ে রেখে আকাশ দেখি। ঝকঝকে পরিস্কার নীল স্নিগ্ধ আকাশ। আহ! এই দৃশ্য আর সারা শরীর ঘিরে রাখা পানির শীতল অনুভূতি একবার চোখ বুজে অনুভব করতে পারলে জীবনে আর কি চাই? অনেকক্ষণ ধরে এভাবেই পানিতে থাকি। তারপর গোসল শেষে, চুল আঁচড়াই। নাস্তা বানাই। নাস্তা করে কাঁধের ব্যাগটাতে দুটো বই ঢুকিয়ে বেরিয়ে যাই স্কুল পানে। হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে থাকি আজ বাচ্চাদের কি পড়াবো? কিভাবে বললে বিজ্ঞানের মহাকর্ষ চ্যাপ্টারটা সবাই খুব মজা নিয়ে শুনবে আর বুঝবে? বায়োলজি ক্লাসে গিয়ে ওদেরকে পড়াতে পড়াতে ওদের মুখ দিয়েই মলিকিউলার বায়োলজি নিয়ে যখন প্রশ্ন বের করে আনতে পারি তখন কি যে আনন্দ লাগে আমার! ক্লাস শেষে কুরআন হতে কোন আয়াতটা সবাই মিলে তিলাওয়াত করবো আর গল্পে গল্পে আলোচনা করবো সেটাও মনে মনে আওড়ে নিই। গতকাল কোন গল্পটা যেন অর্ধেক বলেছিলাম ক্লাস সেভেনে? সুরা তোয়াহার মুসা আলাহিস সালামের গল্পটা, নাকি সুরা কাহাফের ঝকঝকে সেই দীপ্ত তরুণদের অসাধারণ গল্প? ইউসুফ আলাইহিস সালামের গল্পটা নাকি ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের মহান আত্নত্যাগ? ছোট ছোট বাচ্চাদের সাথে পড়া আর খেলায় উদ্দাম একটা দিন কাটে। কোন ভড়ং নেই, অহংকার নেই, ভণিতা নেই। সবাই একসাথে হেসে, মিশে, খেলতে খেলতে শিখা। আহ! আসরের ওয়াক্ত গড়িয়ে আসে। ঘন্টা বাজে ছুটির। বাচ্চাদের সাথে আমিও হাসিমুখে কাঁধে ব্যাগ তুলে নিয়ে ঘরে ফিরতে থাকি।

মাগরিবের ওয়াক্ত হলেই ডিম বা আলুভর্তা রেডি করি রাতের খাবারের জন্যে। সাথে তাওয়ায় সেঁকা আমার বানানো এবড়োথেবড়ো হাস্যকর রুটি। ইশার সালাতের আগেই খাওয়া পর্ব সেরে নিই। মাসজিদে সালাত পড়ে এসে বিছানা বিছিয়ে, ঝেড়ে, মশারিটা টানিয়ে একটা বই বুকে টেনে নিয়ে হারিকেনের আলোয় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ি। বইয়ের উত্তেজনায় কখনো কখনো ঘুম হয় না মাঝরাত পর্যন্ত। আবার কখনো বুঝতেই পারি না কখন ঘুমিয়ে পড়েছি। ফজরের আজানে ভাঙ্গে ঘুম আমার।

অনেকের কাছে আমার এই স্বপ্ন খুব হাস্যকর হবে জানি। কিন্তু আমার কাছে আমার এই স্বপ্ন খুব দামী, খু-ব। এই অতি সাধারণ সস্তা স্বপ্নকে একদিন আমি ছুঁয়ে দেবো। আমি অপেক্ষায় আছি। আমি এখনো হাসি, এখনো বাঁচি এই অতি ছোট্ট সাধারণ স্বপ্নটাকে ছুঁয়ে দেবো বলে।

নতুন করে বাঁচবো বলে।

সত্যি সত্যি বাঁচবো বলে।