আমার ছোট ভাইয়ের নাম তানভীর। চেহারা দেখেই বুঝলাম ওর মাথা ঘুরতেসে। সত্যি সত্যি মাথা ঘুরা না। হতবাক করা কিছু জানার পরে “এইডা আমি কি জানলাম” টাইপের মাথা ঘুরা। কি হইসে জিজ্ঞেস করলাম। ও যা যা বললো তার সারসংক্ষেপের ভাবার্থ হচ্ছে- .

সুরা কাহাফ, ঈমান, ঈমানদারের পরিচয় আর দাজ্জাল সংক্রান্ত হাদীসগুলো নিয়ে স্কলারদের বিশ্লেষণ পড়ে ওর মনে হচ্ছে, দাজ্জাল অলরেডী চলে এসেছে। সে এখনো আমাদের সময়ের মাত্রায় [যে মাত্রায় দাজ্জালের এক দিন আমাদের এক দিনের সমান সমান হবে সেই মাত্রায়] প্রবেশ করেনি, তাই আমরা ধরতে পারছি না। বাট পুরো দুনিয়া জুড়েই শেষ সময়ের চিহ্ন আর দাজ্জালের আগমনের “পরবর্তী সময়ের” প্রেক্ষাপট নিয়ে যে প্রফেসিগুলো আছে সেগুলো সব অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেছে অলরেডী। সারা দুনিয়া জুড়ে অলরেডী অনেক বছর আগে থেকেই প্রফেসি অনুযায়ী শেষ সময়ের চিহ্নগুলো সব সম্পন্ন হয়ে আসছে। শুরু হয়ে গেছে বর্ণিত যুদ্ধগুলো। [ক্লুঃ দাজ্জাল পরবর্তী সময়ের যুদ্ধ]

সর্বশেষ নির্বাচিত মেসেঞ্জার ﷺ স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে গেছেন পথভ্রষ্ট না হতে চাইলে কুরআন আর হাদীসকেই “দৃঢ়ভাবে” আঁকড়ে ধরতে। আর আমরা হালকাভাবেও ধরতে রাজি নই আর। সেই কুরআন আর হাদীসেই ঈমানকে যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, ঈমানদারের যে বৈশিষ্ট্যগুলো বর্ণনা করা হয়েছে সেইগুলো আর আমাদের মাঝে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দাজ্জাল যেভাবে চায় আমরা অলরেডী সেইভাবেই চলছি। আমাদের সফলতার সংজ্ঞা, জীবনযাপনের দর্শনের সাথে কুরআন আর হাদীসের কোন সত্যিকারের যোগসূত্র নেই।

যার সম্পদ আছে, উচ্চতর সেক্যুলার ডিগ্রী ইত্যাদি আছে, তাকেই আমরা “সত্যিকারের সফল” মনে করছি। তাকেই আমরা বাহবা দিই, শুধু তাকেই সম্মান করি, আত্মীয়তা তার সাথেই করতে চাই, সালামও [অর্থাৎ দু’আও] শুধু এদেরকেই করি, রিকশাওয়ালা বা টেম্পু হেলপারকে না। কক্ষণো না। আমরা কাজে কর্মে বুঝিয়ে দিচ্ছি আমরা আল্লাহর সংজ্ঞায়িত করা “সাফল্যে” নই, বরং দাজ্জালের সংজ্ঞায়িত করা “বস্তুবাদী” সাফল্যে বিশ্বাসী। [ক্লুঃ দাজ্জাল বর্ণিত সাফল্য]

আমরা বলি কুরআনকে ভালোবাসি। সেই ভালোবাসা সত্যিই আছে। তবে মুখে, অন্তরে আর কাজে কর্মে না। কুরআন যদি সত্যিই ভালোবাসতাম, আল্লাহর পাঠানো মেসেজ হিসেবে বিশ্বাস করতাম, তাহলে এই জীবনে কুরআন কয়েকবার বুঝে পড়া হয়ে যেতো, তাফসীর স্টাডি হয়ে যেতো এই বয়সেই [ওর বয়স সাড়ে ১৪]। যে মানুষটা সেক্যুলার ডিগ্রী আনতে আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপ বা অস্টেলিয়ায় যেতে পারছে তাকে নিয়েই আমরা সত্যিকারের গর্বিত, আনন্দিত। তাকে নিয়ে আমরা এমনই খুশি আর আশাবাদী হই, যেন সে জান্নাতেই চলে যাচ্ছে। [ক্লুঃ দাজ্জালের জান্নাত]

অন্যদিকে, যে মানুষটা কুরআন অধ্যয়ন আর সেই অনুযায়ী জীবনটাকে যাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাকে ভয়ংকর বেকুব মনে করি। নিশ্চিত জানি যে এই গর্দভ বেকুবের ভবিষ্যত অন্ধকার। এই বেকুবতো সামনে “মোল্লা” বনে যাবে, তীব্র কষ্ট আর হতাশার কালো আঁধারে ডুবে যাবে। এই গবেটেরতো পুরো জীবনটাই বৃথা, ব্যাকডেটেড আইডিয়ায় ভর্তি থাকবে। এই জীবন আমরা কেউ চাই না আর [ক্লুঃ দাজ্জালের জাহান্নাম]।

ওর কাছে মনে হচ্ছে, এটাই সেই সময়, যে সময় নিয়ে বলা হয়েছে যে মানুষ ভাববে তার ঈমান আছে, অথচ সে জানবেও না যে তার ঈমান নাই। সে বুঝবেও না যে সে দাজ্জালের ফাঁদে পড়ে গেছে, আর তার অনুসারী হয়েই আছে অলরেডী। ওদিকে আমাদের প্রিয় রাসুল ﷺ ভাবতেন আর ভয় করতেন যে এই বুঝি দাজ্জাল এলো, সন্দেহ করতেন যে দাজ্জাল চলেই এসেছে, অথচ কাউকে বর্তমান অবস্থার সাথে হাদীস আর কুরআনের আয়াতের বিশ্লেষণ দেখিয়ে শত বুঝালেও সে এটাকে হাস্যকর কল্পনা বলেই উড়িয়ে দিবে! [ক্লুঃ দাজ্জাল পরবর্তী সময়ের দর্শন]

আমরা ভাবছি “আমার আসলে ঈমান আছে”। আর এইটার পক্ষে আমরা নিজ নিজ মস্তিষ্কপ্রসূত নানারকম যুক্তি দাঁড়া করায়ে স্বস্তি খুঁজছি, নিজের যুক্তির পক্ষে সাফাই গাইতে পারার জন্যে স্কলারদের মত খুঁজছি, অথচ কুরআন আর হাদীস অনুযায়ী যে আমাদের ঈমান নেই, সেইটা পাত্তাই দিচ্ছি না। ফজর আর ইশার সলাত মাসজিদে জামাতে আদায় না করলে তার মুনাফিক্বি প্রকাশ হয়ে গেছে ধরে নেয়া হতো সেই কুরআন নাজিলের যুগেই। সেই যুগেই, যখন মদ নিষেধ হওয়ার আয়াত নাজিল হয়নি, তখন আল্লাহ বলে দিয়েছিলেন যেন মদ খেয়ে সলাতের আশেপাশেও কেউ না যায়। কারণ? কারণ সালাত তাহলে বুঝে আদায় করা হবে না। আজ আমরা মদ খাই না, কিন্তু জীবনে দুই রাকাত সালাতও কয়জন বুঝে পড়েছি? কয়জন রাসুল ﷺ সাহাবীদের মতো অনুভব করে অন্তত দুই রাকাত সালাত এমনভাবে আদায় করেছি যে দুনিয়া হতে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছি, আর মনে হয়েছে আমি সত্যিই আল্লাহর সামনে? দুই রাকাত সালাতও জীবনে ঠিকমতো আদায় করা হয়নি, চেষ্টাও করিনি, সত্যিকারের কোন আক্ষেপও নেই অন্তরে, অথচ সেই অন্তর দিয়েই আজ আমরা ভাবি যে আমরা মুনাফিক্ব না, বরং পাক্কা মুসলিম। ঈমানের তেজ আমাদের সর্বাঙ্গে জ্বলজ্বল করছে।

ওদিকে সুদ হলো আল্লাহ আর তাঁর রাসুলের ﷺ বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা। আমরা প্রত্যেকেই কি কোন না কোনভাবে আল্লাহ আর তাঁর রাসুলের ﷺ বিরুদ্ধে সেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়িনি একটু হলেও? অথচ আমরা ভাবছি “আমাদের ঈমান ঠিক আছে। আমি ঈমানদার”, ঠিক যেভাবে দাজ্জালের সময়ে মানুষ ভাবার কথা। [ক্লুঃ দাজ্জাল পরবর্তী সময়ের ঈমান]

আমাদের এই ধারণাগুলো কি আল্লাহ আর তাঁর রাসুলের দেয়া ইসলামের ধারণা, নাকি নিজের মনগড়া? এইসব হাংকি পাংকি বলে এইখানে না হয় মানুষকে ভুজুংভাজং দিচ্ছি, কিন্তু আল্লাহর কাছে এইসব হাবিজাবি কি বলতে পারবো?

আগামীকাল থেকে ঠিক হয়ে যাবার প্ল্যান করি আমরা। অথচ বুঝি না যে এই ধারণাটাই একটা ধোঁকা। বিভ্রান্তি। আগামীকাল যে কখনোই আসে না। বরং এক দিন এক দিন পার হয়ে যায়।

আরো ঘনিয়ে আসে।
ফেরার সময়।