আমরা অনেক সময় ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’ জাতীয় কথাবার্তা শুনি। করোনাকালে কথাগুলো হয়তো একটু বেশিই শোনা যাচ্ছে। মজার ব্যাপারটা হল করোনাকে আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে শাস্তি বলা হলে যাদের ‘কেমন কেমন জানি লাগে’, তাদের অনেকেই গম্ভীর মুখে, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’-এর কথা বলেন। কিন্তু করোনা কিংবা এ জাতীয় বিপর্যয়কে আল্লাহ্‌র শাস্তি মনে করা ইসলামী বিশ্বাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও, ‘প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয়’ এটা ম্যাটেরিয়ালিসম, ন্যাচারালিযম, বিজ্ঞানমনস্কতা, নাস্তিকতা কিংবা প্রগতির আকিদাহর সাথে ঠিক মেলে না।

প্রকৃতির প্রতিশোধ কথাটার মানে কী?

প্রকৃতি এমন কিছু যা স্বাধীনভাবে চিন্তা করে। সিদ্ধান্ত নেয়। প্রকৃতি একটা ইন্টেলিজেন্ট এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট এজেন্ট। প্রকৃতি যেন কোন জীবন্ত, বিপুল শক্তিশালী, সার্বভৌম সত্তা।

এধরণের বিশ্বাস নতুন না। বনের আশেপাশে থাকা মানুষ বনদেবতাদের পূজো করেছে। পাহাড়ের মানুষদের চাপা স্বরের নিচে শোনা গেছে পাহাড়ী দেবতাদের কথা। ‘নদীর দেও’-এর কথা বলেছে নদীর পাড়ের মানুষ – হাজার বছর ধরে। প্রকৃতিপূজার ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো। ভারত থেকে আফ্রিকা, আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ অ্যামেরিকা - হাজার হাজার বছর ধরে হয়ে এসেছে আদিম দেবতাদের উপাসনা।

এসব বিশ্বাস কি আদৌ বিজ্ঞানসম্মত? আদৌ যৌক্তিক? এসব বিশ্বাস কি সায়েন্টিফিক ম্যাটারিয়ালিযমের সাথে যায়?

এধরণের বিশ্বাসকে ব্যাকডেইটেড, বর্বর এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন না বলার আসলে কোন উপায় নেই। কিন্তু নিজের প্রগতিশীল, বিজ্ঞানমনস্ক, আধুনিক এমনকি নাস্তিক দাবি করা লোকেরা দিব্যি এই অদ্ভুত বিশ্বাসের কথা বলে বেড়ায়। খুব সিরিয়াস মুখে প্রকৃতির প্রতিশোধের কথা বলে ইসলামী বিশ্বাস নিয়ে নাক সিটকানো লোকেরাই। ফিল গুড, সিউডো ফিলোসফিকাল হলিউড মুভি দেখে দেখে শেখা জ্ঞান আঁকড়ে অনেকে বলেন ‘কারমা’ এর কথাও। কেউ প্রকৃতির ওপর স্রষ্টার বৈশিষ্ট্য আরোপ করে, কেউ করে মহাবিশ্বের ওপর।

কেন আপাত আধুনিক মানুষ এ ধরনের ব্যাকডেইটেড, কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিশ্বাস ধারণ করে? কেন বিপর্যয়ের সময়ে তারা অদেখা জগত আর অপ্রমাণ্য সত্তার কথা বলে?

উত্তরটা সোজা। গ্বাইবের ওপর বিশ্বাস মানুষের গভীরে প্রোথিত। এভাবেই হাজার হাজার বছর ধরে ব্যাপারটা চলে এসেছে। আধুনিক মানুষ মুখে যাই বলুক না কেন, সে তার নিজের প্রকৃতিকে বদলাতে পারে না। আরামের সময়গুলোতে সে হয়তো শরীরে সুখ, দুনিয়ার রঙ্গিন বায়োস্কোপ কিংবা যান্ত্রিক জীবনের খুঁটিনাটি নিজেকে ব্যস্ত রাখে। কিন্তু বিশেষ কিছু সময়ে – জন্ম, মৃত্যু, দুর্যোগ, দুঃখ – তার চোখের সামনে থেকে রঙ্গিন চশমাটা সরে যায়। সে অনুভব করে, চিন্তা করে – বা করতে বাধ্য হয়। সে বোঝে যে দৃশ্যমান পৃথিবীর কলকবজার পেছনে অদেখা এক জগত আছে। আমাদের চিন্তার সীমার বাইরে আছে উচ্চতর কোন শক্তি। সে বোঝে বস্তুর জগত ছাড়া অন্য কিছু না থাকলে আমাদের অস্তিত্বের কোন মূল্য থাকে না। যদি কোন স্রষ্টা না থাকেন তাহলে শূন্যতা আর অর্থহীনতা ছাড়া কিছু বাকি থাকে না।

কিন্তু আধুনিক মানুষ বিশ্বাস করতে চাইলেও ধর্ম, চায় না। সে আকিদাহ চায় না, আদর্শ চায় না। সে নৈতিক হতে চায়, কিংবা বলা যায় নিজেকে নৈতিক ভাবতে চায় – কিন্তু নৈতিকতার কোন কোড মানতে চায় না। সে নিয়মকানুন, বিধিবিধান চায় না। লাগাম দিতে চায় না নিজের ইচ্ছে, শখ, কামনাবাসনার ওপর। কিন্তু বিশ্বাস যে প্রশান্তি এনে দেয় – সে সেটা চায়। সে এমন বিশ্বাস চায় যা বিনিময়ে কিছু দাবি করে না। সে অদৃশ্যে বিশ্বাস করে, কিন্তু সেই বিশ্বাস নন-কমিটাল। আধুনিক মানুষ নিজেই নিজের বিশ্বাস বানিয়ে নেয়। স্পিরিচুয়ালিযম। এমন কিছু যার নির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। অর্থ নেই। তাৎপর্য নেই। কখনো সে স্রষ্টার বৈশিষ্ট্য আরোপ করে প্রকৃতির ওপর। কখনো মহাবিশ্বের ওপর। কখনো নিজের ওপর। সত্যিকারের আত্মঅনুসন্ধান আর তাদাব্বুরের সস্তা বিকল্প হিসেবে সে বেছে নেয় আরামদায়ক এই আধ্যাত্মিকতা।

বস্তুবাদ, নাস্তিকতা কিংবা ফ্যাশনেবল প্রগতিশীলতা হৃদয়ের ভেতরের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। তাই মানুষ সেই শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা করে ‘ডু ইট ইওরসেলফ’ আধ্যাত্মিকতা দিয়ে। আস্তিক-নাস্তিক, ‘জন্মসূত্রে মুসলিম’ আর ‘কালচারাল মুসলিম’ – সবাই এ কাজটাই করে। তাই করোনা আল্লাহ্‌র শাস্তি, আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে চিহ্ন, আমাদের কৃতকর্মের ফল, আমাদের সংশোধনের উপলক্ষে কথাগুলো বলাটাও প্রবলেম্যাটিক হয়ে যায়। কিন্তু প্রকৃতির প্রতিশোধ কিংবা কারমা-র কথা মেনে নিতে কষ্ট হয় না। তাওহিদের বিশ্বাসকে তাচ্ছিল্য করলেও হাস্যকর ধরনের, কুসংস্কারাচ্ছন্ন শিরক আধুনিক মানুষের কাছে ‘ডীপ’ মনে হয়।

সামনের দিনগুলোতে আরো তীব্র হবে আধুনিক মানুষের এই আধ্যাত্মিক সংকট। মহামারী, অনাবৃষ্টি, ক্ষরা, দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ যতো বাড়বে, ততো দুর্বল হবে প্রযুক্তি আর সায়েন্টিফিক ন্যাচারালিযমের ভিত। হঠাৎ করে আধুনিক মানুষ আবিষ্কার করবে রাষ্ট্র, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি তাকে নিরাপত্তা দিতে পারছে না। বাড়বে শূন্যতার অনুভূতি, সেই সাথে বাড়বে অদৃশ্যের ওপর, অলৌকিকের ওপর বিশ্বাস। দুর্বলতা আর অসহায়ত্ব উপলব্ধি করা মানুষ ভরসা করতে চাইবে কোন উচ্চতর শক্তির ওপর। আধুনিক মানুষ ঝুকবে ডু ইট ইওরসেলফ স্পিরিচুয়ালিযমের দিকে - কারমা, প্রকৃতি, গায়া, লাইফ ফোর্স, অ্যাসেন্ডেড ম্যাস্টার্স। সে বিশ্বাস করবে। কিন্তু কী বিশ্বাস করছে, কেন বিশ্বাস করছে, সেটা জানবে না। এভাবেই প্রস্তুত হবে মঞ্চ। এভাবেই মানবজাতি প্রস্তুত হবে ঐ একচোখা লোকটার জন্য, যে এসে অসম্ভব সম্ভব করে দেখাবে। আর তারপর…

তারপর আধুনিক মানুষ পরম বিশ্বাসে তাকে মুকুট পরাবে…

In the land of the blind, the one-eyed man is king


Wednesday, 25 March 2020 at 18:17