ঈদের দিনটা সবার মত আমারও অন্য সকল দিনের চাইতে আলাদা, ভিন্ন আমেজের। আজ সকালে আব্বা এবং মামা তাদের দাদাদের নিয়ে আলাপ করছিলেন। তাদের দাদারা দু’জন খুব ভালো বন্ধু ছিলেন, গোটা গ্রামে তাদের পারস্পারিক হৃদ্যতার কথা সবাই জানত। কোন কোন কাজ অপরজনের অপেক্ষায় বসে থেকে থেকে করতেন। নাতিদের পাঠাতেন বন্ধুকে ডেকে আনতে, নাতি বসে থেকে দাদার বন্ধুকে সাথে নিয়ে তবেই বাড়ি ফিরতে পারতো। তারা আজ কেউ নেই, এমনকি আমার দাদাজানও নেই। আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছেন সবাই… যেতেই হবে, যেতে হয় সবাইকে। চলে যাওয়াই নিয়ম…

জীবনের তৃতীয় দশকের শেষভাগে চলে এসেছি। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে চাকুরি জীবনেও কয়েক বছর কেটে গেছে। সময়ের হিসেবে অনেকগুলো বছর, অনেক। মাঝে মাঝে পেছন ফিরে তাকাই। বুকের ভেতর হু হু করে ওঠে। একটা প্রবল শূণ্যতা, একতা তীব্র শীতল অনুভূতি — অস্তিত্বকে কাঁপিয়ে দেয়। আমার অতীতের সময়গুলোর কথা ভেবে চলি। সেখানে আছে অদ্ভুত শৈশব, মুগ্ধ বাল্য, সফলতার কৈশোর, অসহায় তারুণ্য… কখনো অ্যাকাডেমিক সফলতা, কখনো ব্যর্থতা, কখনো খেলাধুলায় অর্জন, কখনো হাসপাতালে কাটিয়ে দেয়া সময়। আর্থিক টানাপোড়েন আর সৌখিন কেনাকাটার মুহূর্তও আছে। মোটকথা, জীবনের সময়গুলো যেমনই থাক, যত কঠিন অথবা সহজ, যত তিক্ত অথবা মধুর হোক — কেটে গেছে সব। সময় বহমান, থেমে থাকে না কখনো, কারো জন্য। কষ্টকর সময়ও স্থায়ী নয়, আনন্দগুলোও না। তাহলে ঠিক এই মুহূর্তে আমার জীবনের অর্জন কী? আমি ঠিক কীসের পেছনে ছুটে চলেছি জীবনভর? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনা বলেই হয়ত শরীর বরফশীতল হয়ে যায়, বুকের মাঝে উথাল-পাথাল হয়।

একসময় নিজেকে প্রশ্ন করলে ভয়ে, আশঙ্কায় আর লজ্জার অনুভূতি গ্রাস করত বলে চিন্তাগুলোকে এড়িয়ে যেতাম। মৃত্যুর কথা ভাবলেই জীবনের যথার্থতার প্রশ্নটা আসে। মৃত্যুচিন্তা এড়িয়ে গেলে কোন সমাধান আসে না, চিন্তার ও আত্মার দৈন্যতা বাড়তেই থাকে। সাহস নিয়ে চিন্তাগুলোর মুখোমুখি হতে হয়। জনকোলাহলে এমন প্রশ্নের উত্তর দেয়া সহজ না। নিজের জন্যই কিছুটা সময় বের করে নেয়া উচিত একদম নিজের সাথে। ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন, বন্ধুদের আড্ডা-গল্প ইত্যাদি প্রকৃতপক্ষে যন্ত্রণা যা মস্তিষ্ককে দখল করে রাখে অনবরত। এসবের হাত থেকে সাময়িকভাবে হলেও নিজেকে মুক্ত করে নিজেকে কিছু প্রশ্ন করা যেতে পারে–

– কেন আমার এই জীবন?
– কেন এসেছি পৃথিবীতে?
– আমি ঠিক কি চাই এ জীবন থেকে?
– আমি যা করছি তা কেন করছি?
– আমি যা করছি, তা কি সত্যিই আমি চাই?
– আমি যা চাই, তা পেলে কি আমি সফল হবো?
– আমার সফলতার মানদন্ড কে ঠিক করে দিচ্ছে?
– জীবনের শেষ দিন কী পেলে নিজেকে সফল মনে করবো?

এরকম কিছু প্রশ্নের উত্তর বোধকরি নিজের কাছ থেকে নেয়া প্রয়োজন। কীভাবে, কী উত্তর চাই, তা জানিনা। সবচেয়ে বড় কথা, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে হলে ভাবতে হবে, একটু নিজের জন্য একান্ত সময় প্রয়োজন হবে। তাতেই নিজেদের জন্য একটা বড় কাজ হবে, যা গুরুত্বপূর্ণ।

সময়ই আমাদের জীবনের পুঁজি। এখান থেকেই ক্ষয় যায় এক একটি দিন, আমাদের মৃত্যুর দিন ঘনিয়ে আসে। জানিনা, পৃথিবীতে ক’দিন বেঁচে থাকবো আমরা। এসেছি শিশু হয়ে, যাবার বেলায় কোন নিয়ম নেই। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যেদিন ডেকে নিবেন, নির্দেশ দিবেন মালাকুল মাওতকে (মৃত্যুর ফেরেশতা) এই রূহ নিয়ে চলে যেতে, সেদিনই এই পৃথিবীর জীবনের সমাপন। সময় পাবো না একটুও বেশি। মায়ের কাছে ফিরে এসে যাবার আগে মাথায় হাত বুলিয়ে নিতে পারবো না। পারবো না বাবার কাছে এসে হাতটা ছুঁয়ে দু’আ চেয়ে নিতে। যাবার বেলায় অনেক প্রস্তুতি থাকে সবসময়, সেই বিদায়ের প্রস্তুতি আগে থেকেই নিয়ে রাখতে হয়, এই বিদায় সাময়িক না, এই বিদায় এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবী থেকে চিরবিদায়। অনন্ত জগতের পথে যাত্রার জন্য বিদায়…

বয়ঃসন্ধিকাল থেকেই এক ধরণের ভীষণ একাকীত্ব আমার সঙ্গ ছাড়েনি। ক’দিন আগে রাতে ইলেকট্রিসিটি চলে যাবার পরে ঘুটঘুটে অন্ধকারে নিজের সেই পুরোনো একাকীত্ব স্মরণ হতেই খেয়াল করে দেখলাম কোথাও আলো নেই চোখের সীমানায়। ঘুটঘুটে অন্ধকার চারিদিকে। আমার কবরের কথা মনে হলো। পরকালের জীবন নিয়ে শিখছিলাম যখন, এভাবেই অনুভব হচ্ছিলো একদিন। কবরে মাটি চেপে থাকবে শরীরের উপর, পোকামাকড়, সাপখোপ… আর প্রবল একাকীত্ব। সঙ্গিসাথী কেবলই নিজের করে যাওয়া কাজগুলো। ভালো কাজ বন্ধু হয়ে, খারাপ কাজ বিভীষিকা হয়ে সঙ্গ দেবে। এড়িয়ে যাবার উপায় নেই এই সুনিশ্চিত ঘটনা থেকে…

সবাই আমরা ‘লোনলি’ ফিল করি, কাজ না পেলেই ‘বোরড’ হয়ে যাই। ভবিষ্যতের জীবন নিয়ে আমরা কত কিছুই তো ভাবি, অ্যাপার্টমেন্ট-জমি-গাড়ি-ব্যাঙ্ক একাউন্ট। আসলেই অনুভব করিনি সেই প্রকৃত একাকীত্বের কথা। অনন্ত জগতে পাড়ি দেবার শুরুতেই যে জীবনের মুখোমুখি হবো আমরা সবাই; হতেই হবে…

দৈনন্দিন জীবনে স্বাভাবিকভাবেই ভালো চাকুরি, অনেক মুনাফার ব্যবসা, একটা থাকার ‘নিজস্ব জমিতে বাড়ি’ অথবা অ্যাপার্টমেন্ট, খ্যাতি, ক্ষমতার মোহে ঘোরগ্রস্ত আমরা। এই সমাজে অজস্র মানুষ এমন। ফিরাউন ছিলো, কারূন, হামান, নমরুদ, আদ, সামুদের সৈন্যবাহিনী, আবু জাহল, আবু লাহাব, ওয়ালিদ বিন মুগীরা, উতবা শাইবা আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত হয়ে রয়। ক্ষমতা-যশ-প্রতিপত্তি-সম্পদ কী ছিলো না তাদের? সেই পথের শেষটাই আল্লাহর নাফরমানিতে, যা টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যায় জাহান্নামের পথে। অনন্তকালের অপমান আর লাঞ্ছনার সেই পথ…

অন্যদিকে অভাবের প্রবলতায় আক্রান্ত ছিলেন পৃথিবীর বেশিরভাগ সেরা মানুষ। আমরা জানি সায়্যিদিনা ঈসা আলাইহিস সালামের কথা, জানি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাদের সাহাবাদের কথা — জীর্ণ পোশাকের নিচে তাদের যেই আত্মা ছিলো, তা ছিল উজ্জ্বল ঝকঝকে। তাতে ছিলো প্রশান্তি, তাতে ছিলো ভালোবাসা, তাতে ছিলো মানবতাকে মুক্ত করার প্রেরণা। তৎকালীন ‘সুপার পাওয়ার’ রোমান আর পারস্য সাম্রাজ্য যেই ‘সাদামাটা ও কম সংখ্যার’ সাহাবীদের মুখোমুখি হতে গিয়ে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলো। কারণ, এই মানুষগুলো জানতেন তাদের পৃথিবীর জীবনের উদ্দেশ্য, জানতেন তাদের প্রাণের অর্থ, জানতেন তাদের জীবনের মূল্য ও সম্মান কীসের মাঝে। তাদের অন্তর ছিলো ঈমানে পরিপূর্ণ, ঈমানের শক্তিতে তারা ভাস্বর ছিলেন। পার্থিব জীবনের পরীক্ষাগুলোর প্রবল আঘাত তাদের কাবু করে ফেলতে পারেনি। দুনিয়ার সাময়িক মোহ, চাকচিক্য তাদের অন্তরকে স্পর্শও করতে পারেনি। ক্ষুদ্র বোধের সীমাবদ্ধ দৃষ্টির দুনিয়াবী মানুষদের হিসাবের যন্ত্রে তাদের অপ্রাপ্তি ছিলো বটে, কিন্তু তারা জানতেন প্রকৃত প্রাপ্তি কোথায়, কেমন এবং কতটা সম্মানের। আল্লাহ তাদের প্রতি খুশি, তারাও আল্লাহর প্রতি খুশি ছিলেন এবং প্রশান্ত চিত্তেই তারা এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন।

মানুষের জীবনে অনেক অপ্রাপ্তি থাকবেই। আল্লাহর উপরে ভরসা রাখাই সম্পদ। এই পৃথিবীতে প্রতিটি সময়েই আমাদের মতন এমন শত কোটি মানুষ ছিলো, সবাই একটা প্রাণ, একই অনুভূতি নিয়ে ছিলো। অপ্রাপ্তিতেই ভরা ছিলো সবাই। এখানে অন্তর কারো পূর্ণ হবে না। শরীরের চাওয়ার শেষ নেই, সম্পদের প্রতি চাওয়ার শেষ নেই মানুষের; কিছুতেই সে লোভ পূর্ণ হবে না। দুনিয়ার জন্য যেসব সম্পর্ক, সেগুলোও ভেঙ্গে যাবে এখানে কেননা মানুষ এখানে থাকবেই অল্প সময়। এখানে তাই সুখ খোঁজা বোকামি। অবিমিশ্র সুখের স্থান জান্নাত, পৃথিবী তো নয়!

আল্লাহ যেন আমাদেরকে মৃত্যুর আগে জীবনের উদ্দেশ্য বুঝে, তার উপরে আ’মাল করে দুনিয়া থেকে এমনভাবে বিদায় নেয়ার সুযোগ দান করেন যেন আমরাও তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকি, তিনিও আমাদের উপরে সন্তুষ্ট থাকেন। আমরা যেন আল্লাহর দ্বীনের জন্যই, তার সন্তুষ্টির জন্য এই দুনিয়াতে নিজেদের সর্বোচ্চ ত্যাগ করতে পারি। আল্লাহ যেন আমাদের কবুল করেন। নিশ্চয়ই তার অনুগ্রহ ছাড়া কোন কিছুই হয় না, সমস্ত ক্ষমতা ও শক্তি কেবলই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার; যিনি এক এবং অদ্বিতীয়, যিনি বিচার দিনের মালিক।