মাগরিবের পর মাঠে একজনের জানাযা পড়লাম। পরিচিত ছিলেন, কয়েক বছর আমরা তার বাসায় ভাড়া ছিলাম। বয়স হয়েছিল চল্লিশের মত, পিতার রেখে যাওয়া অঢেল সম্পদ ছিল, উপার্জনের পেছনে ছুটতে হয়নি কখনো। সুস্থই ছিলেন। গতরাত নয়টার দিকে ল্যাব এইডে গেলেন এক অসুস্থ বন্ধুকে দেখার জন্য। সেখানে গিয়ে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। দ্রুত ইমার্জেন্সিতে পাঠানো হলো। পরে পাঠানো হলো আইসিইউতে। কয়েক ঘন্টা সেখানে থেকে আজ সকালে ইন্তেকাল করলেন তিনি।

এলাকায় পরিচিত ছিলেন, জানাযায় অনেকেই এসেছিলেন। জানাযায় দাঁড়িয়ে মনে পড়লো, গতকাল এই সময়ে তিনি জীবিত ছিলেন। হয়তো তিনি শহরের ডেঙ্গু সমস্যা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন, অথবা মহল্লার যানজট নিয়ে। কিন্তু আজ এ সময় পৃথিবীর সকল চিন্তা থেকে মুক্তি পেয়েছেন তিনি।

গিয়েছিলেন একজন অসুস্থ মানুষকে দেখতে। তখন কি জানতেন আর ঘরে ফেরা হবে না তার ? মা, স্ত্রী কারো থেকেই বিদায় নিয়ে যাননি। জানতেন আবার ফেরা হবে ঘরে। হয়তো পরবর্তী দিনের কর্মসূচীও ভেবে রেখেছিলেন। জানাযায় কয়েকজন বলাবলি করছিল, সে এত দ্রুত চলে যাবে ভাবতেও পারিনি। তাদের কথাটা একটা চিন্তার প্রতিনিধিত্ব করে। যে চিন্তা আমরা সবাইই কমবেশি লালন করি। চিন্তাটা হলো, মৃত্যু বৃদ্ধ বয়সের ব্যাপার। মোটামুটি ৬০/৭০ বছর বয়স হবে, শরীর দূর্বল হবে, তখন কদিন রোগে ভুগে মানুষ মারা যাবে।

একদিন মৃত্যু হবেই, এ বিষয়ে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস আছে। কিন্তু এক সেকেন্ড পরেও যে মারা যেতে পারি, কিংবা যে কাজ করছি তা সমাপ্ত করার আগেই মৃত্যু হতে পারে সে অনুভূতি আমাদের মধ্যে খুব কমই কাজ করে। ফলে আমাদের দৈনন্দিন জীবন চলতে থাকে আগের মত এক অনর্থক চক্রে। আমরা আশা করি, আরো কিছুদিন পরে সব ঠিক করে ফেলব, কিন্তু আরো কিছুদিন সময় পাব কিনা সে ব্যাপারে কোনো নিশ্চয়তা নেই।

হাম্মাদ ইবনু সালামাহ সম্পর্কে আবদুর রহমান বিন মাহদি বলেছিলেন,

"যদি হাম্মাদকে বলা হত, আপনি আগামিকাল মারা যাবেন, তবুও তার সুযোগ ছিল না নিজের প্রতিদিনের আমলে নতুন কিছু সংযুক্ত করবেন"। (সিয়ারু আলামিন নুবালা)

অর্থাৎ তিনি মৃত্যুর জন্য সদাপ্রস্তুত ছিলেন। প্রতিদিনের আমলের রুটিনও সেভাবেই তৈরী করে নিয়েছিলেন।

আমরা যে জীবন উপভোগ করছি তা একটি সুযোগ মাত্র। এ সুযোগ রবের দিকে প্রত্যাবর্তনের, এ সুযোগ নিজের পাপাচারকে বিসর্জনের। মৃত্যুর আগমনের সাথে সাথে এ সুযোগ বন্ধ। মৃত্যু কেড়ে নেয় সকল ভালোবাসা ও ঐশ্বর্য। খলিফা মামুনুর রশিদ মৃত্যুর সময় দুহাত তুলে বলেছিলেন,

"হে মহান সত্তা, আপনার রাজত্ব কখনো শেষ হবে না। আপনি দয়া করুন ওই ব্যক্তির উপর যার রাজত্ব শেষ হয়ে গেছে"। (মুরুজুয যাহাব)

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

"বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি যে নিজের পরিচয় লাভ করেছে এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য কাজ করেছে"। (তিরমিযি, ৩৩৮৩)

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমাদের হাতে সময় আছে প্রত্যাবর্তনের। কিন্তু আমরা জানি না এই সময়সীমা কতক্ষণ। মৃত্যু আসতে পারে যেকোনো সময়ে। আর তাই আমাদের পরিবর্তনটাও দরকার ঠিক এই মুহূর্তেই।