বাসায় আমার রুমটা ছোটখাট! পাশে খোলা জানালা দিয়ে বাইরের পুরোটা দেখা যায়। কয়দিন থেকে দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙ্গে যায় নিয়মিত! হঠাৎ অন্ধকার ঘরটা কবরের মত মনে হয়! ভীষণ ভয় লাগে। মৃত্যুভয় জেঁকে ধরে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। আমাদের ক্ষমা কর ইয়া রব, আমাদের ক্ষমা কর! নিজের এই উপলব্ধিগুলো যেন সারাজীবন লালন করতে পারি। রহম কর ইয়া রব রহম কর! তোমার গুনাহগার বান্দাদের তুমি দয়া কর!

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

গত রামাদানের ঈদে আমার বড় চাচা আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে দিলেন। আমি যখন স্কুলে পড়ি তখন বড় চাচার প্যারালাইসিস হয়। একসময় হাঁটতেও পারতেন না, এখন কোনমতে নড়াচড়া করতে পারেন। উনি বেশ কয়েরকবার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছেন। আমার মস্তিষ্কে বড় চাচা নামাজ পড়তে গেছেন এমন কোন স্মৃতি নেই। সেই বড় চাচার গালে এখন দাড়ি, মাথায় টুপি, নামাজ পড়েন, সারাদিন তজবি জপেন এবং অনেকদিন পরপর আমাদের মত কাউকে দেখলে জড়িয়ে ধরে কাঁদেন! মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে মৃত্যু ভয়ে কাতর একজন মানুষের অন্তরের দৃশ্য আমরা জানিনা। আমরা সুখে আছি, শান্তিতে আছি আর এমন ভাব করে আছি যেন কোনদিন মরবই না!!

মানুষের জীবনটা ঘুড়ির মত, যার নাটাই আমাদের মহান রবের হাতে। একদিন সুতোয় টান পড়বে, আর আমাদেরকে তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে। কিচ্ছু করার নেই, কোন বিকল্প নেই, কোন অজুহাত নেই! আল্লাহ সুবাহানু ওয়া তায়ালা মৃত্যুর মাধ্যমে আমাদেরকে অনেক কিছুর নিদর্শন দিয়েছেন। যেমন আমরা এই পৃথিবীতে চিরস্থায়ী নই, দুনিয়ার সুখ শান্তির জন্য মৃত্যু একটি ফুলস্টপ, মৃত্যুই প্রমাণ করে আমরা একদিন মহান রবের কাছে ফিরে যাব আর এই দুনিয়ার আমল অনুযায়ী আল্লাহ আমাদেরকে অনন্ত সুখের জান্নাত কিংবা চিরশাস্তির জাহান্নামের সামনে নতজানু করে কাঁদাতে পারে। মানুষকে এই উপলব্ধি এনে দিতে পারে যে__ একদিন মহান রবের সামনে দাঁড়াতে হবে! কি জমা করছি সেই দিনের জন্য?

মানুষের ইহকাল এবং পরকাল এই দুইটাকে sum up করলে সূরা আলে ইমরানের ১৮৫ নং আয়াতটা দাঁড়ায় যার শুরুতেই আল্লাহ বলছেন, “প্রতিটি প্রাণীকেই মৃত্যুবরণ করতে হবে…”! আস্তিক, নাস্তিক সব আদর্শের মানুষের মাঝে একটা কমন মিল, আমরা সবাই জানি আমরা একদিন মারা যাব। আর পার্থক্যটা হল এই মৃত্যুর জন্য কে কি ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছি তার উপর। মৃত্যুর ভয়াবহতার স্মরণ যার যত বেশি আখিরাতের পাথেও সংগ্রহে সে তত বেশি তৎপর। কিন্তু আধুনিকতা, যান্ত্রিকতা আর দুনিয়ালোভী আমরা মানুষেরা মৃত্যু নাকের ডগায় না আসা পর্যন্ত এর কথা ভাবার ফুসরত পাইনা। মৃত্যুভয় আমাদের স্পর্শ করেনা। অন্তর শক্ত হয়ে যাওয়ার একটা লক্ষণ হল মানুষের মৃত্যুতে কোন ভাবান্তর না হওয়া।

একবার এক জানাজায় ইমাম জিজ্ঞেস করলেন, “লোকটি মরার আগে কেমন ছিল?” সাধারণত এতে নিয়ম হল ইমাম এই প্রশ্ন করার পর সবাই হাত উঁচিয়ে বলবে, লোকটি ভাল ছিল! সবাই একথা বললেও পেছন থেকে এক লোক বলল, “লোকটি মরার আগে জীবিত ছিল!” তারপর তার সাথে সাথে অনেকেই এই কৌতুক শুনে হাসাহাসি শুরু করে দিল! Amazing! আমরা মুসলিম!


একদিন রাসুল (সঃ) মসজিদে এসে কিছু মানুষকে হাসতে দেখলেন। তিনি বললেন, “মৃত্যুকে স্মরণ কর। সেই সত্ত্বার শপথ! যার হাতে আমার জীবন, আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে তাহলে হাসতে কম, ক্রন্দন করতে বেশী!” হযরত উমার (রাঃ) কা’বে আহবাব (রাঃ) কে মৃত্যুর ভয়াবহতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “মৃত্যু এমন, যেমন কোন কাঁটা বিশিষ্ট শাখা কোন মানুষের ভেতর প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয় এবং প্রতিটি কাঁটা তার সমস্ত রগ রেশায় বিদ্ধ হয়ে যায়। এরপর কোন শক্তিশালী ব্যক্তি শাখাটি ধরে টান দেয়। ফলে যা আসে তা আসে এবং যা থাকে তা থেকে যায়!”

শাদ্দাদ ইবনে আউস বলেন, “মুমিনদের নিকট কোন ভয় মৃত্যু অপেক্ষা বেশী নয়। মরণ কষ্ট করাত দিয়ে চিরা, দা-কাঁচি দিয়ে কাটা এবং ডেক্সিতে সিদ্ধ হওয়ার চেয়ে বেশী। যদি কোন মৃত জীবিত হয়ে জগতবাসীকে মৃত্যুর কষ্ট শুনিয়ে দেয়, তাহলে তারা নিজের জীবন দ্বারা কোন ফায়দা গ্রহণ করবে না এবং ঘুমেও শান্তি পাবেনা!” এক ব্যক্তি অনেক সময় রোগীদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেন মৃত্যু তোমার নিকট কেমন? যখন তিনি মৃত্যুশয্যায় শায়িত হলেন লোকেরা তাঁকে জিজ্ঞেস করল, মৃত্যু আপনার নিকট কেমন অনুভূত হয়? তিনি বললেন, মনে হয় যেন আশ এসে দুনিয়ার সাথে মিশে গেছে, আর আমার রুহ সূচের ছিদ্র দিয়ে বের হয়ে আসছে!” সুবাহানাল্লাহ! আল্লাহু আকবর! আমরা কোন সুখের পেছনে ছুটছি? কি ভাল কাজ করেছি যে মৃত্যুর বিষয়ে গাফেল হয়ে আছি? সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রাসুল (সঃ) পর্যন্ত মৃত্যুর সময় মুখ দিয়ে উচ্চারণ করেছেন, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মৃত্যু খুবই কঠিন!” আর আপনার আমার কি অবস্থা হবে একটু ভেবে দেখেছি কি?


মৃত্যু হল এক সুনিশ্চিত অনিশ্চয়তা! মৃত্যু আসবে জানি কিন্তু কখন আসবে তা আমরা নিশ্চিত নই। হতে পারে আজকে, কালকে, হতে পারে এই মুহূর্তে কিংবা ১০-২০ বছর পর! কিংবা এমনও হতে পারে আপনি লেখাটা পড়েই শেষ করতে পারলেন না! ক্লাসে স্যারেরা মাঝে মাঝে sudden-test নেন। মৃত্যু হল sudden-test এর মত, যে কোন দিন মালাকুল মউত এসে হাজির হতে পারে। যারা নিয়মিত পড়াশুনা করে তারাই sudden-test এ ভাল করতে পারে। আর যারা অবহেলায় দিন কাটায় তারা গোল্লা মারে! তাই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি দরকার যেকোনো সময়! হযরত লুকমান (আঃ) তার পুত্রকে ডেকে বললেন, “বাছা! মৃত্যু কখন আসবে তা তুমি জান না! সুতরাং হঠাৎ মৃত্যু আসার আগেই তুমি তার প্রস্তুতি গ্রহণ কর!” মৃত্যু এটা কোন মৌসুমি ফল কিংবা ফুল নয় যে বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে আসবে। এটা মনে করারও কোন কারণ নেই যে একেবারে বৃদ্ধ হয়ে কোমর বাঁকা হয়ে গেলে তবেই মৃত্যু আসবে। এটা মানুষের একটা শয়তান প্রদত্ত আশা যে মানুষ যুবক বয়সে বা কম বয়সে মৃত্যু আসাকে অবাস্তব মন করে। অথচ যতদিনে একজন বৃদ্ধ মারা যায় ততদিনে হাজারো যুবক ও শিশু মারা যায়। তাই মৃত্যুর বিষয়টা বারবার করে স্মরণ করাটাই একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসুল (সঃ) ইস্তেঞ্জা করার জন্য যেতেন। পেশাব শেষ করে তিনি মাটি দিয়ে পবিত্রতা হাসিল করে নিতেন। আমি বলতাম_ হুজুর! আপনার পাশেই তো পানি রয়েছে। তিনি বলতেন, “পানি পর্যন্ত যেতে পারব তার কোন নিশ্চয়তা আছে কি?” রাসুল (সঃ) আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) কে বললেন, “যখন তোমার সকাল হয়, তখন নিজেকে বিকেলের কথা শোনাবে না এবং বিকেল হলে সকালের আলোচনা করবে না। জীবিত থেকে মৃত্যুর জন্য কিছু গ্রহণ কর এবং সুস্থতা থেকে অসুস্থতার জন্য। হে আব্দুল্লাহ! তোমার জানা নেই আগামীকাল তোমার কি নাম হবে জীবিত না মৃত!” সুবাহানল্লাহ! আল্লাহু আকবর! আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় রাসুল (সঃ) এবং তার সাহাবারা মৃত্যুকে এভাবেই দেখতেন, এভাবেই ভয় করতেন! আর আমরা? আফসোস……


আনন্দ ফুর্তি আর চোখের সামনে রঙিন পর্দার আস্তরণ জমা মানুষের অন্তর এত কঠিন থেকে কঠিনতর হয়েছে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি তো দুরের কথা, এর কথা চিন্তা করার সময়ও আমাদের নেই। হঠাৎ করে মৃত্যুর কথা স্মরণ হলে নাফস বলবে—এখনও অনেক সময় আছে, বড় হয়ে তাওবা করে নিও। এরপর বড় বেলায় এসে নাফস ধোঁকা দেয়, বৃদ্ধ হয়ে তাওবা করে নিও! আর বৃদ্ধ বয়সে এসে—আরে ছেলে মেয়ের বিয়ে দিয়ে, বাড়ি ঘর করে, একেবারে হাজ্জে গিয়ে তাওবা করে ফেলব! এভাবে পালাক্রমে আমরা মৃত্যু ও এর প্রস্তুতি থেকে পালিয়ে বেড়াই! যে দুনিয়াতে আমাদেরকে মুসাফির হিসেবে পাঠানো সে দুনিয়াতেই আমরা প্রাসাদ নির্মাণ করি। অর্থ-বিত্ত-সম্পদের পাহাড় গড়ি! আর তাতেই আমাদের অন্তর এই দুনিয়াতেই আটকে থাকে। যখন মৃত্যুর সময় আসে তখন দুনিয়ালোভী অন্তরগুলো মৃত্যুর ভয়ে কাতর হয়ে পড়ে। তাদের চোখে মুখে অসহায়ত্ব ফুটে উঠে। আকুতি থাকে এই পৃথিবীতে হাজার বছর বেঁচে থাকার!

“অবশ্যই তুমি তাদেরকে বেঁচে থাকার ব্যাপারে সকল মানুষ এমনকি মুশরিক অপেক্ষাও অধিক লোভী দেখতে পাবে, তাদের প্রত্যেকেই আকাঙ্ক্ষা করে থাকে যদি হাজার বছর আয়ু দেয়া হত, কিন্তু দীর্ঘায়ু তাদেরকে শাস্তি থেকে রেহাই দিতে পারবেনা, তারা যা করে, আল্লাহ তার দ্রষ্টা।” [২:৯৬]

পক্ষান্তরে মুমিনের ব্যাপারটা তার উল্টো! একজন সত্যিকারের মুমিন জানে এই দুনিয়ায় সে দুইদিনের মুসাফির মাত্র। সে জানে আখিরাতের জীবনই চিরস্থায়ী জীবন। আর তাই তার সব কাজ থাকে আখিরাতমুখী! সে দুনিয়ার সম্পদ দিয়ে আখিরাতেই প্রাসাদ নির্মাণ করে। তার সব ভাল কাজের প্রতিদান আখিরাতের জন্য রেখে দেয়। তাই স্বভাবতই সে চাইবে যেখানে তার নির্মিত প্রাসাদ, সঞ্চয় সেখানেই চলে যেতে। যে কারণে একজন মুমিন মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে হাসিমুখে। যে কারণে দুনিয়ালোভী মানুষের জন্য রাসুল (সঃ) মৃত্যুকে বলেছেন, “destructor of all pleasures”. আর একজন মুমিনের জন্য মৃত্যু হল অনাগত সুখের অনন্তজীবনের প্রথম ধাপ!


সময়টা উহুদ যুদ্ধের একদিন আগে। আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশ (রাঃ) আল্লাহর নিকট দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! আমাকে এমন প্রতিদ্বন্দ্বী দান কর যে হবে ভীষণ সাহসী ও দ্রুত উত্তেজিত! আমি তোমার রাস্তায় তার সাথে যুদ্ধ করব। সে আমাকে হত্যা করে আমার নাক কান কেটে ফেলবে। তখন আমি তোমার সাথে মিলিত হব এবং তুমি জিজ্ঞেস করবে, ‘আব্দুল্লাহ! তোমার নাক কান কিভাবে কাটা গেল?’ তখন আমি বলব, তোমার ও তোমার রাসুলের জন্য!” সুবাহানাল্লাহ! আল্লাহু আকবর! এরা ছিলেন আল্লাহর দিদার লাভে উদগ্রীব রহমতের বান্দা! আর আমি আপনি কি প্রস্তুতি নিচ্ছি আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়ার? কোন অবস্থায় আল্লাহর কাছে যাওয়ার আশা রাখি আমরা? কানে হেডফোন লাগিয়ে মাথা দুলিয়ে গান শুনছেন। অশ্লীল ভিডিও দেখেছেন। চুরি করছেন। অন্যের গীবত করছেন। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে মেয়েদের শরীর নিয়ে অশ্লীল মন্তব্য করছেন। তখনি মালাকুল মউত এসে আপনার রুহটা নিয়ে যেতে পারেন! কি অবস্থায় আল্লাহর কাছে যাবেন চিন্তা করেছেন? কি লজ্জা, কি অসম্মান মহান রবের সামনে! তাই সেসব কাজেই বেশী ব্যস্ত থাকুন যে অবস্থায় আপনি আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে পছন্দ করবেন। আর সেসব কাজ থেকে বিরত থাকুন যে অবস্থায় আপনি আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে অপছন্দ করবেন!


চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে ফ্লাইওভার ধ্বসের কিছুক্ষন পর আমার এক বন্ধু স্ট্যাটাস দিয়েছিল, “আল্লাহই বাঁচাইছে! একটু আগেই ঐদিক দিয়া আসলাম! আর এখন শুনলাম ফ্লাইওভার ধ্বসে পড়ছে!” আমার সেই বন্ধু সবসময় উদাস উদাস কবিতা আর গানের লিরিক স্ট্যাটাস দিত। এই স্ট্যাটাস দেওয়ার পর আবার সেই উদাস উদাস গানের লিরিক স্ট্যাটাস শুরু! সুবাহানাল্লাহ! মৃত্যুর কাছাকাছি যাওয়া মানুষগুলোর জন্য এটা একটা আল্লাহর নিদর্শন। কঠিন অন্তরে একটা ঝাঁকুনি! কিন্তু কি শিখি আমরা সেখান থেকে? জীবনবোধের কি পরিবর্তন হয়? যাদের হয় তাদের হয়, যাদের হয়না তাদের কিছুই হয়না! সাভার, তাজরিন ট্র্যাজেডি কিংবা ভূমিকম্পে মানুষের মৃত্যুতে আমরা হা হুতাশ করি, আফসোস করি, মায়াকান্না কাঁদি! কিন্তু এখান থেকে নিজের জন্য কি শিক্ষা নিয়েছি? মৃত্যুকে কতটুকু অনুধাবন করেছি? জীবনে কতবার জানাজায় শরীক হই, কতবার মানুষকে খাটিয়ায় করে বয়ে নিয়ে যেতে দেখি, কতবার মানুষকে কবর দিতে দেখি। কখনো কি অনুধাবন করি মৃতের জায়গায় নিজেকে? কখনো কি অন্ধকার কবরে একাকী থাকার ভয়াবহতার কথা চিন্তা করেছি? নাকি এসব চিন্তা করলে সুখের জীবনে অশান্তি নেমে আসবে তাই এসব চিন্তা বাদ??

এক সালাফ বর্ণনা করেন, “আমরা জানাজায় হাজির হতাম। তবে একথা জানার উপায় ছিল না যে, সমবেদনা কার নিকট প্রকাশ করব। কারণ প্রত্যেকেই সমান ভারাক্রান্ত মন”। পূর্ববর্তীরা এভাবেই মৃত্যুকে ভয় করত আর এখন যারা জানাজার সাথে থাকে, তাদের অধিকাংশই হাসে, গল্প করে এবং মৃতের সম্পত্তি নিয়ে কথাবার্তা বলে। মৃতের আত্মীয় স্বজনরাও ভাবে কিভাবে সম্পত্তির কিছু অংশ পাবে। কেউ চিন্তা করেনা তার জানাজা কখন বের হবে, তখন আল্লাহর ইচ্ছা কী হবে, তার দশা কী হবে? এই উদাসীনতার একমাত্র কারণ হচ্ছে মনের কাঠিন্যটা! অধিক পাপ করতে করতে আমাদের অন্তরগুলো কঠিন হয়ে গেছে। ফলে আল্লাহকে, কেয়ামতের দিনকে এবং পরকালের ভয়কে আমরা ভুলে গেছি। আল্লাহর নিকট দোয়া করি তিনি যেন আমাদেরকে উদাসীনতার নিদ্রা থেকে জাগ্রত করেন!

“আল্লাহ মানুষের প্রাণহরণ করেন তার মৃত্যুর সময়, আর যে মরে না, তার নিদ্রাকালে। অতঃপর যার মৃত্যু অবধারিত করেন, তার প্রাণ ছাড়েন না এবং অন্যান্যদের ছেড়ে দেন এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।" [৩৯:৪২]

আয়াতের শেষে খেয়াল করুন আল্লাহ বলছেন, “…নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে”। চিন্তা করুন প্রতিবার ঘুমের মধ্যে আল্লাহ তায়ালা আপনার রুহ নিয়ে নেন। এরপর দয়া করে শুধুমাত্র দয়া করে আপনার রুহ আপনার শরীরে ফিরিয়ে দেন বলে আপনি আবার জেগে উঠতে পারেন। আড়মোচা ভেঙ্গে আরামের কম্বল সরিয়ে কাউকে শুভ সকাল বলতে পারেন। দুনিয়ায় আবারো জীবনের খোঁজ করতে পারেন। কিন্তু একদিন আল্লাহ আপনার রুহ আর ফেরত দেবেন না। একদিন আপনি আর জেগে উঠতে পারবেন না। কখনো কি চিন্তা করেছেন প্রতিটা দিন আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার জন্য এক একটা সুযোগ!

রবি ইবনে খাইছাম নিজের ঘরের ভেতর একটা কবর খনন করেছিলেন। যখনি তিনি অন্তরের কঠোরতা অনুভব করতেন, তখনই উক্ত কবরের ভিতর দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত শুয়ে থাকতেন। এরপর, “ইলাহি! আমাকে ফিরিয়ে দাও যাতে কিছু ভাল কাজ করতে পারি” এই আয়াতটা কয়েকবার পাঠ করতেন। এরপর নিজেকে নিজে বলতেন, হে রবি! এখন তো তোমাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এবার কিছু ভাল আমল কর! সুবাহানাল্লাহ! আমরা যখন কবরস্থানে যাই আমাদের মনে রাখা উচিত একদিন আমাদেরকেও একাকী এমনি কোন অন্ধকার ঘরে শুয়ে থাকতে হবে। এখানে যারা শুয়ে আছে একদিন তারাও বেঁচে ছিল। সমাজের বিত্তশালী- ক্ষমতাবান ছিল। আজ তাদের শরীরে পোকামাকড় বাসা বেঁধেছে। তারা সবাই আল্লাহর কাছ থেকেই এসেছিল আবার আল্লাহর কাছে ই ফিরে গেছে। আমি আপনি আমরা সবাই সেই দিনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছি। একদিন ডাক আসবে! কিছুই করার থাকবেনা, কিছুইনা!

“জীবমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। অতঃপর তোমরা আমারই কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে” [২৯:৫৭]

শেষকথাঃ

মসজিদের সামনের কাতারে কিছু নিয়মিত মুসল্লি দেখতে পাবেন। এরা সবাই বৃদ্ধ, বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে। ব্যতিক্রম অবশ্যই থাকতে পারে, কিন্তু খোঁজ নিলে দেখবেন এদের বেশীরভাগই যুবক বয়সে নামাজ পড়ত না। মৃত্যুর দ্বার প্রান্তে দাঁড়িয়ে আমরা জীবনের অর্থ বুঝতে পারি। তার আগ পর্যন্ত দুনিয়ার পেছনে ছুটতে ছুটতে ভুলেই যাই জীবনের অলিতে গলিতে চলতে চলতে অনেক দূর চলে এসেছি। মৃত্যু সামনেই। তখন আফসোস করি ফেলে আসা সময়ের জন্য। আরও কিছু সময় চাই ভাল কাজ করার। জীবনটা আবার শুরু থেকে শুরু করতে ইচ্ছে করে তখন! জীবনের ভুলগুলো খুব বেশী করে মনে পড়ে তখন! নাস্তিকদের কাছে মৃত্যু হতে পারে একটা স্বাভাবিক ব্যাপার! স্টিফেন হকিং-এর কাছে মৃত্যু হতে পারে কম্পিউটার নষ্ট হওয়ার মত ঘটনা, তাই পরকাল বলে কিছু নেই(!)। আর এসব গাঁজাখুরি থিউরি জীবনের টগবগে সময়ে হয়তো আমরা স্বগ্রাসে গিলে বুদ্ধিজীবীও সাজতে পারি। কিন্তু বাস্তবে মৃত্যুর সামনে দাঁড়ানো মানুষটিই বুঝতে পারবে মৃত্যু কত ভয়ংকর, কতটা কষ্টের!

মাঝেমাঝে সময় করে মৃত্যুপথযাত্রী মানুষগুলোকে দেখতে যাবেন। খুব সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করবেন এদেরকে। এদের অসহায় চোখের দৃষ্টি, এদের শুন্যতা মাখা একেকটা দীর্ঘশ্বাস, এদের জীবনের ফেলে আসা একেকটা সময়ের আর্তনাদ সাক্ষ্য দেবে এই পৃথিবী ছেড়ে একদিন আপনি কঠিন সময়ের দিকে যাবেন। বস্তা পচা থিউরি, দেড় কেজি মগজের অহমকে একদিন বুড়ো আঙ্গুল দেখাবে আল্লাহর বাণী…

“বলুন! তোমরা যদি মৃত্যু অথবা হত্যা থেকে পলায়ন কর, তবে এ পলায়ন তোমাদের কাজে আসবে না। তখন তোমাদেরকে সামান্যই ভোগ করতে দেয়া হবে।" (Al-Ahzaab:16)

ইন্তিকালের সময় রাসুল (সঃ) এর নিকট একটি পেয়ালাতে পানি রাখা হয়েছিল। তিনি সে পানিতে হাত মুবারাক ভিজিয়ে ভিজিয়ে মুখমণ্ডল মুছতেন এবং বলতেন, “হে আল্লাহ আমার উপর মৃত্যু যন্ত্রনা আসান কর”। আল্লাহু আকবর! আমাদের ক্ষমা কর ইয়া রব, আমাদের ক্ষমা কর! আল্লাহর পেয়ারা হাবিব, নবুয়তের পদমর্যাদা এখানে তাকদিরকে হারাতে পারেনি এবং তার পরিবারের বেদনার দিকে লক্ষ্য করেনি। অথচ তিনি আল্লাহ তা'য়ালার নিকট মাকামে মাহমুদ ও হাউযে কাউছারের মালিক ছিলেন! সেই মানুষটিকে যদি মৃত্যুযন্ত্রণা ছুঁয়ে যায় তাহলে আমাদের মত গুনাহগারদের কি হাল হবে ইয়া আল্লাহ! আনন্দ ফুর্তির ধ্বংসকারী মৃত্যুকে বারবার স্মরণ করুন। মৃত্যুকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন ভেবে পরকালের জন্য আমল করতে থাকুন। মৃত্যুর সময় হযরত ফুযাইল (রঃ) অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এরপর চোখ খুলে বললেন, “হায় আফসোস! এত দীর্ঘ পথ আর এত সামান্য পাথেয়!” হযরত আবু মুসা আশয়ারি (রাঃ) তার স্ত্রীকে বলতেন, “বাহন কষে নাও! জান্নাতে নামার কোন কিছু নেই!” অর্থাৎ আমলই জান্নাতে নামার বাহন, কাজেই এজন্য খুব বেশী চেষ্টা কর!

মৃত্যু আসবে! অবশ্যই আসবে! কারো জন্য ভয়ংকর শাস্তির দুঃসংবাদ নিয়ে, আর কারো জন্য অনন্ত জান্নাতের সুসংবাদ নিয়ে।

স্বার্থপর, দুনিয়ালোভী, ভোগ বিলাসে মত্ত অহংকারী মানুষগুলো ঘুমিয়ে আছে। তারা জেগে উঠবে তখনি যখন মৃত্যু এসে দুয়ারে দাঁড়াবে। এরপর কবর, হাশর, পুলসিরাত, জান্নাত কিংবা জাহান্নাম! কত দীর্ঘপথ! কি ভয়ংকর কি ভয়ংকর! মানুষ মরে লাখে লাখে, কোটিতে কোটিতে! যে মৃত্যুর সময় বলতে পারে, হে আল্লাহ তোমার জন্যই বেঁচে ছিলাম, আর তোমার জন্যই মরে যাচ্ছি, সেটাই তো জীবন! সে জীবন কখনো মরে না, কখনো ফুরায় না! কখনো না …

সবকিছুর সমাপ্তি নিয়ে মৃত্যু আপনার আমার অপেক্ষায়। এইতো, একটু ডানে হয়ে বায়ে গেলেই, সামনে …