এই কথাটা কে কতবার শুনেছেন বা মনে মনে ভেবেছেন বলুন ত? ভাল মানুষ চিনতে পারা বেশ একটা বড় গুণ হিসেবে ধরা হয়। আমার নিজের, এবং আশপাশের অনেক মানুষের মধ্যেই এই ব্যাপার টা নিয়ে একটা গর্ব থাকতে দেখেছি, উল্টোটাও হয়েছে, আমার গাধামো চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর জন্য অনেকবার অনেকেই বলতে বাধ্য হয়েছে, ‘তুমি অনেক কিছুই বোঝনা, কোন কথার কী মানে ধরতে পারনা… অথবা – এত বড় একটা কথা বলে দিয়ে গেল… তুমি বুঝলাও না!’ অন্যের কথা কী বলি, আমি নিজেই ত কতসময় বিজ্ঞের মত আত্মীয়স্বজনের একটা কথার আড়ালে, তার মুখোশধারী আসল রূপ প্রায় টেনে বের করে দিবালোকের মত স্পষ্ট করে দেয়ার চেষ্টারত ছিলাম!

হায় আল্লাহ! এই পুরো প্রক্রিয়াটা যে কত বড় অন্যায় আমরা কি কখনো সেভাবে চিন্তা করে দেখেছি? আমি ত আজকাল মনে প্রাণে ইসলাম কে সব মুশকিল আসান বলে ধরা শুরু করেছি। আমার চিন্তার ধরণগুলি এমন – যখনই কুরআন বা হাদীস এ পাই এই এই কাজগুলি আল্লাহর অপছন্দনীয়, আগে বিশ্বাস করে ফেলি যে কাজগুলি আসলে ভাল না, আমার বাদ দেয়া উচিৎ। তারপর অবসরে, আগে যে করতাম – সেই কাজগুলির কোথায় কী impact ছিল ধীরে ধীরে খুঁজে বের করার চেষ্টা করি। তাই আমি ব্যাখ্যা করার সময়ও আমার অতি সীমিত জ্ঞান দিয়ে আগে বলে নিব যে এটা একজন প্রকৃত মুসলিম এর বাদ দিলে ভাল হয়, তারপর সত্যিকারের জীবনে এর প্রভাব কতটুকু আলোচনা করার চেষ্টা করব। যারা আমার মত কানাই দাস হয়ে যান নি, অর্থাৎ যুক্তি দিয়ে ভাল মন্দ বিচার করেন, তারা স্বচ্ছন্দে প্রথম অংশটুকু বাদ দিতে পারেন।

আল্লাহ কুরআনে স্পষ্টভাবে বলেছেন, অদৃষ্টের জ্ঞান আমাদের দেয়া হয়নি, এর মধ্যে পড়ে ভবিষ্যদ্বাণী, রাশির মাধ্যমে কুম্ভ, কর্কট ইত্যাদি রাশির জাতকের সাধারণ বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি ইত্যাদি। একজন মানুষকে জন্মলগ্ন দিয়ে ভাগ করে যদি তার সারা জীবনের character define নিষিদ্ধ হয়ে থাকে, জন্মের অঞ্চলভেদে তাকে ভাগ করাটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত আমাকে কেউ বলবেন? খুব বড়জোড় চৌদ্দ গুষ্টির ইতিহাস ঘাটার একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যায়, কারণ পরিবারে মানুষ যা দেখে আসে তার অনেক কিছুই তার মধ্যে রয়ে যায়। কিন্তু নোয়াখালি, বরিশাল, চাঁদপুর, ফরিদপুর এইসব?? এই দেশে আমাকে এশিয়ান ভেবে কেউ অন্য চোখে দেখলে খুব গায়ে লাগে। আমি নিজে কি সব বাংলাদেশী কে এক চোখে দেখেছি?

এটুকু পড়ে অনেকেই ভাবছেন, আমি এত mean minded না, আমার কাছে সবাই এক। বেশ! একবার চিন্তা করে দেখুন ত, আপনার কোন সহপাঠী কোন এক দুর্বল মুহূর্তে নিজের রূপ/মেধা/আর্থিক অবস্থা নিয়ে অহংকার করেছে, আপনি কি ভাবেন নি, ‘ভাল অবস্থায় থাকলে সবারই দেমাগ বেড়ে যায়’? এক মুহূর্তের ছোট্ট একটা কাজ, তার আগের সব সুন্দর আচরণ কে মুছে দিল… যতবার তার কথা ভাববেন, ঐ একটা কথাই মনে পড়বে, ‘হুহ! ভাল আছে ত, তাই আমাদের কে আর চিনে না’। বলুন ত, ‘বগুড়ার লোক কিপ্টা হয়, আমি দুইজনের সাথে মিশছি দুইজনেই রাম চাউঠা’ আর ‘ওর যা দেমাগ… জান না একবার কী হইসে’ – দুটোর মধ্যে কি কোন সামঞ্জস্য খুঁজে পাচ্ছেন?

রাসুলুল্লাহ (স) এর কাছে এক সাহাবী বলেছিলেন, ‘আল্লাহর কসম, সে একজন মুনাফেক’, রাসুলুল্লাহ (স) উত্তর দিয়েছেন, ‘যতক্ষণ সে সালাত আদায় করে আমি তাকে আমাদের একজন ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারিনা।’ রাসুলুল্লাহ (স) এই দাবি ঠিক না বেঠিক সেই তর্কেই যান নি। কারণ কে মনের মধ্যে কী এইসব ভাবার অবকাশ/অধিকার কোনটাই আমাদের নেই। এমনকি সালাত আদায় না করলেও বলা যাবেনা যে সে কাফের মুনাফিক ইত্যাদি ইত্যাদি.. বড়জোড় বলতে পার ‘সে নামায পড়ে না’। অর্থাৎ যে কাজ আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি কেবল সেটাই একটা screenshot এর মত তুলে ধরতে পারব, এর বাইরে এক ধাপ ও আগ বাড়িয়ে বিচার করার অধিকার আমাদের নেই।

this means generalization – categorizing the nature of a group of people based on common features OR deciding the character of a person based on his few acts are not permitted in islam.

একটা চমৎকার লাইন শুনেছিলাম, from Yaasir Fazaga’s Self Image Psychology-

‘we often fail to distinguish between the performance and the personality’ – অর্থাৎ মানুষের একটা দুটো পদস্খলনকে প্রায়ই তার চরিত্রের সাথে গুলিয়ে ফেলি। কত সহজে আমরা বলে ফেলি, সে মিথ্যে কথা বলে; অথচ একবার মিথ্যের বিপরীতে হয়ত সে লক্ষ টা সত্যি কথা বলে, আমরা মনেও রাখি না। যদি ধরতে পার মিথ্যে বলছে, জানতে চাও কারণটা কী, বোঝাও সত্যি বলেও কীভাবে পার পাওয়া যায়, গলায় একটা মিথ্যেবাদীর tag ঝুলিয়ে দিয়ে কি আমরা আরো বড় মিথ্যাচার করছি না?

যাই হোক, generalization যে শুধু খারাপ বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য তা কিন্তু না। আমরা মানুষকে একটু ভালবাসলে তাকে ফেরেশতার পর্যায়ে উন্নীত করে ফেলি। অনেক ছেলেমেয়েই বাবা মায়ের কোন খুঁত থাকবে এটা মেনে নিতে পারেনা। তাহলে কি ব্যাপারটা এমন, সন্তান হওয়ার সাথে সাথে তোমার আমার মত সাধারণ মানুষ হুট করে ফেরেশতা হয়ে যাবে?

মানুষ সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা অনেকটা এরকম – প্রথম তার সাথে মেশার এক দুই দিনের মধ্যেই তাকে আমরা নিজেদের আন্দাজমত ওজন করে ফেলি, এক কথায় তার স্বভাব চরিত্র, কোন কথায় কী মিন করে ইত্যাদি ইত্যাদি সব বুঝে ফেলি। বাকি দিনগুলি চলে সেই পাল্লায় চড়িয়ে বেশ একটা আত্মশ্লাঘা অনুভব করা – হু হু! কি, বলেছিলাম না? মানুষ চিনতে আমার ভুল হয়না…. আর যদি হিসেব টা ঠিক মত না মিলে তখন ভাবি – এই কাজটা ত তার সাথে যায় না! কত বড় হিপোক্রেট দেখেছ? বাইরে কী, আর একটু বেশি মিশলে আসল চেহারা বের হয়।

অথচ ব্যাপারটা কি এমন হতে পারত না, একজন নতুন মানুষকে চিনব, পুরোপুরি খোলা মনে গ্রহণ করব, আমার স্বভাবের সাথে মিলে গেলে খুশিতে আটখানা হব – গল্প করার অনেক কিছু পাওয়া গেল… আর যদি না মিলে, যদি হয় একটু গপ্পিবাজ অথবা রাশভারি – তখন তাল না কাটে এমনভাবে কাছে আসব। এমনকি কাছের মানুষ অচেনা হয়ে গেলেও ভাবব এটা একটা সাময়িক স্খলন – জীবনের এতগুলো ধাপ প্রবৃত্তির সাথে লড়াই করে স্বাধীন ছিল, এক মুহূর্তের জন্য না হয় মনের পশুটাকে দমাতে সমর্থ হয়নি, তাই বলে কি এই একটা অপ্রিয় মুহূর্তই নক্ষত্র হয়ে থাকবে, বাকি আর সব কিছু মিছে হয়ে যাবে? কেন আমরা আমাদের নিজেদের judgment এর উপর এত বেশি ভরসা করে থাকি, কেন ভাবি, ডুবোপাহাড়ের অল্পেকটু চূড়াটা দেখেই তলার সবটুকু আবিষ্কার করতে পারার জ্ঞান বুদ্ধি আমাদের আছে?

আশপাশের মানুষগুলিও ত ঠিক আমাদের মত করেই ভাবে। তারা কি আরেকটু বেশি শ্রদ্ধা, আরেকটু বেশি সহানুভূতি আশা করতে পারেনা?

এত বড় নোটের বটম লাইন এটাই – please don’t be so harsh on judging others’ faults. যে দোষ চোখে দেখা যায়, সেটাকে উপেক্ষাও করা যায়, যে আচরণ হৃদয়ে আঁচড় কাটে, ক্ষমা এবং ভালবাসাই পারে সেই ক্ষততে মোলায়েম নরম আঙুল ছোঁয়াতে।


6/27/2011, 3:14:00 PM