ইদানীং বাসায় থাকিই কম কম। ভোরে উঠে নামাযের পর একটু পড়িলিখি। ৮টা-২টা হাসপাতালে থাকি। রোগী দেখা ছাড়াও অফিস-ওয়ার্ক থাকে। যুহরের পর বাসায় একটু খেয়েই চেম্বারে ২ ঘণ্টা বসি। আসরের পর মহল্লায় অফলাইন দাওয়াতের কাজ থাকে। বাসায় যাই একবারে এশার পর, তালিম শেষ করে। মনমেজাজ - শরীর ভাল না থাকলে মাগরিবের পরও যাই মাঝে মাঝে। আর হাসপাতাল-চেম্বার-মসজিদ সব কাছাকাছি, খাদীজাকে দেখতে মনে চাইলে এক ফাঁকে গিয়ে দেখে আসি। কিন্তু খাদীজার মায়ের দিকে এখন আর তাকানোর খুব বেশি ফুরসত হয় না।

বাসায় পার্মানেন্ট কাজের মানুষ নেই। দেড় বছরের ছোট্ট একটা খাদীজা আর খাদীজার একটা আম্মু। সকালের দিকে একজন বুয়া এসে মোটা মোটা কাজগুলো করে দিয়ে যায়। বাসন ধোয়া, কাপড় ধোয়া, ঘর ঝাড়া, আর মোছা। মাছটাছ থাকলে কুটে দেয়। খাদীজার মায়ের কাজ শুধু রান্না আর খাদীজা। অবশ্য যেদিন বুয়া কোন কারণে আসে না, সেদিন বেচারীর দিকে তাকানো যায় না।

কালেভদ্রে খাদীজার মায়ের দিকে চেয়ে থাকি, তার কাজ দেখি, ত্রস্ত এবং ব্যস্ত। এই বাচ্চার হাগু সাফ চলছে, কোলে করে বেসিনে নিলো শুচু করাবে, আবার ডায়পার পরিয়ে একটু রান্নাঘরে যেতেই দেখা গেল খাদীজা পানি ফেলেছে কোথাও, আবার ছোটো সেখানে। খাওয়ার সময় তো তিনবেলা তিন ঘণ্টা লাগে, দশ গাল খাবার দিলে তার পাঁচ লোকমা দেয় বের করে। আমারই মাথা গরম হয়ে যায়। আবার ঘুম পাড়াও, কখনো পায়ে দুলিয়ে, কখনও কোলে নিয়ে যিকির করে করে। আবার পুরো ঘর এলোমেলো করে রাখে বাচ্চা, সেগুলো গুছানো। নিজের গোসল, খাওয়া, কাপড় ধোয়া, নামায, তিলওয়াত আছে। আমি বাসায় থাকলে এর কিছু কাজ আমি করি, কিন্তু যখন থাকি না, তখন? রাতে আমি বেঘোরে ঘুমাই। কিন্তু মাঝেমধ্যে টের পাওয়া যায়, খাদীজা উঠে প্যাঁপুঁ করছে, রাতে ৩-৪ বার ওঠে স্ন্যাকস খেতে। তার মানে সারাদিন এসবের পর রাতেও ওর মার পূর্ণ ঘুম হয়ে ওঠে না। এই আধাখেঁচড়া ঘুম নিয়েই পরদিন আবার দৌড়াও, সারাদিন, এভাবে দিনের পর দিন। মাসের পর মাস। পরেরটার বেলায়ও এভাবেই ও ছুটবে, তার পরেরটার বেলায়ও, এভাবে বছরের পর বছর। কোন অভিযোগ নেই, কোন অপারগতা নেই। সাময়িক বিরক্তি যে নেই তা নয়, তবে তাতে দু'চামচ মমতা মেশানো থাকে।

কখনও সাহায্য করা থামিয়ে ওর মায়ের দিকে চেয়ে থাকি। তার কাজ করা দেখি। ভাবনার টাইম মেশিনে চড়ে পিছিয়ে যাই তিরিশটা বছর। খাদীজা দেখতে এমনিতেই আমার মত, বেশি রিপ্লেস করতে হয় না। খাদীজাটা হয়ে যায় ছেলে বাবু, আর খাদীজার মায়ের জায়গায় ভেসে ওঠে অন্য কেউ। চোখ রগড়ে টের পাওয়া যায় বহু চেনা এক নারীর মুখাবয়ব। একই দৌড়ঝাঁপ, একই খাবার নিয়ে পিছন পিছন ছোটা, একই রাতজাগা চেহারা, একই চুমু আদর, পোশাক বদল, বুকের সাথে চেপে ধরা। একই স্বপ্ন-আবেগ- ভালোবাসা। হাজার বছরের পুরনো সেই সিনারিও, বার বার, প্রতিদিন, প্রতি ঘরে, প্রতি প্রজন্মে।

নিজের স্ত্রীর পানে চেয়ে আবিষ্কার করা যায় নিজের মা-কে। একই সফটওয়্যার। মানুষ কীভাবে বিয়ের পর বাপমাকে ভুলে যায়, আমার এন্টেনায় ধরে না। বরং বিয়ের পর তো বাপমায়ের প্রতি অনুভূতিগুলো আরও ধারালো হবার কথা। সন্তানের প্রতি স্ত্রীর আচরণ দেখে আমার প্রতি আমার মায়ের আবেগ কেমন ছিল, কষ্ট-শ্রমটা কেমন ছিল এসব তো সহজে বুঝে আসার কথা। আজ আমি যেমন আমার সন্তানটার সাথে খেলি, অর্থহীন কিছু শব্দ আর বাবা ডাক শোনার জন্য আকুলিবিকুলি করি, অফিস থেকে ছুটে ছুটে আসি, বাচ্চার কণ্ঠ শোনার জন্য ফোন দিই, কষ্টার্জিত টাকাগুলো বাচ্চার স্রেফ হাবিজাবি কিনে তৃপ্তি অনুভব করি, একটা খেলনা কিনে কল্পনায় হারিয়ে যাই যে ও পেয়ে কেমন খুশি হবে, আজিব আজিব সব নামে ডাকি - আমার কলিজা, আমার গিলা, আমার মেটে, আমার পাখপাখালি। ঠিক তিরিশ বছর আগে এমনই আরেক টগবগে যুবক আমার জন্যও এমনটাই অনুভব করেছিলেন। আমার ছোট হাত আঙুলে পেঁচিয়ে এই মাটির উপরই হেঁটেছিলেন। নিজের বাচ্চার দিকে চেয়ে এই অনুভূতি যার হয় না, সে তো আলবৎ প্রতিবন্ধী।

সন্তানবৎসল বহু পিতাকে দেখা যায় নিজের বাপমায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করতে। নিজ বাপকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো লোকটারও সন্তান আছে। আশ্চর্য সব ডাবল স্ট্যান্ডার্ড এই ভোগবাদী সেকুলার পৃথিবীর। পুঁজিবাদের বিষে একপল ভাবার ফুরসত নেই, হিসেব মিলানোর ফুরসত নেই। মানুষ না বায়োবট আমরা? সংসারে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের পিতামাতার দিকে, আই মিন আপনাদের শ্বশুর শাশুড়ির দিকে একবার তাকান তো। তাকিয়ে ভাবেন, আপনার ভালোবাসার মানুষটিকে (স্বামী/স্ত্রী) এই মানুষ দুটো (শ্বশুর/শাশুড়ী) ঠিক আপনারই মত করে ভালেবেসেছে, আগলে রেখেছে, আহ্লাদ মিটিয়েছে, বড় করেছে ‘আপনার মনের মত’ করে; যেমনটি আপনি আজ আপনার সন্তানের জন্য করছেন। পাগলের মত ভালবেসে আজ আপনার হাতে তুলে দিয়েছে। তাঁদের মনের অব্যক্ত সেইসব অনুভূতি ফীল করার চেষ্টা করুন তো। অনুভূতি লিখে বুঝানো যায় না, অনুভূতিকে অনুভবেই বুঝতে হয়।

তো আসলে যেটা বলতে চেয়েছিলাম আপনাদের। খাদীজাকে আমি ডায়পার পরালে ওর মা বলে - হয়নি। খুলে আবার নিজে পরায়, আবার খুলে আবার পরায়, রাবারগুলো আঙুলে টেনে ঠিক করে, আবার কোমরের কাছে আঙুল ঢুকিয়ে মাপে যথেষ্ট টাইট এবং একই সাথে যথেষ্ট লুজ আছে কি না। স্ট্র্যাপগুলো একদম সোজা, আমি লাগাইসিলাম তেড়াব্যাকা করে। আবার আমি প্যান্ট পরালে বলে- হয়নি। পাজামার মাঝের সেলাইটা একপাশে সরে আছে, বাচ্চা কষ্ট পাচ্ছে। সরিয়ে আবার মাঝামাঝি নেয়, আবার একটু তাকিয়ে দেখে ঠিকমত পজিশন হয়েছে কি না। খাবার বানানোর টাইমে আজিব আজিব সব রেসিপি তার মাথায় আসে, কেকা আপুও ফেল। সেরেলাকের মধ্যে ডিমের কুসুমের ভর্তা, এই টাইপ। মাথা নষ্ট। পায় কই এসব আইডিয়া? আবার খাওয়ানোর সময় আরেক সার্কাস। এই ভাউ আসলো, এই দাদীআপু লাঠি নিয়ে আসলো, এই দেখ বেবিটা খায়। এক লোকমা মুখে নিলে মায়ের চোখেমুখে কী খুশি, যেন ঈদ। পরের লোকমা বের করে দিল, পরেরটাও। আবার শুরু হল, এই ভাউ, এই পা (পাখি)। রাগে আবার চিৎকার করে ওঠে কখনো- ইয়া বিনতি। খাওয়ানোর সময় যেগুলো বলে তার সবচেয়ে কম আজগুবিগুলো আপনাদের বললাম। আমি আম্মুর কাছে শুনেছি, আমি ছোটবেলায় খাবার নিয়ে গালের একপাশে রেখে দিতাম। কখনো ওভাবেই ঘুমিয়ে যেতাম, লালা পড়ে বিছানাবালিশ নষ্ট হত। আম্মা বসে বসে ‘গেলো রে’ ‘চাবাও রে' করত, আঙুল দিলে গালে ঘষে চাবানোর চেষ্টা করত, ঘণ্টা পেরোতো। খাদীজার খাওয়া দেখতে দেখতে মন ভিজে ওঠে। রাব্বিরহামহুমা কামা রাব্বাইয়ানী সাগীরা। আবার গোসলের সময় আমাকে পানি ঢালতে দেয় না। বাচ্চার পেটে চলে যাবে, দম আটকে যাবে। মাথায় পানি ঢেলেই চেহারার উপরের পানিটুকু সাপটে নামিয়ে দেয়। হাগুর শুচুর তোয়ালে আলাদা, গোসলের তোয়ালে আলাদা। গোসলের পর মুছে, ক্রীমট্রীম মেখে ফিটফাট বানিয়ে এবার ঘুম। আমি শিল্পীর কাজ দেখি। পৃথিবীর সবচেয়ে নিপুণতম শিল্প। মানবশিল্প।

পশ্চিমা পুঁজিবাদ আমাদের শিখিয়ে দিয়েছে, ঘরে থাকো মানে তুমি অকম্মা, বেকার। তোমার স্ত্রী কী করে? কিছু করে না, হাউজওয়াইফ। গর্দভ, তোমার স্ত্রী শিল্পী, মানবশিল্পী। পুঁজি কামানো-জমানো, বস্তু কেনা, ভোগ করাই জীবনের অর্থ-সার্থকতা-মন্ত্র; এই দাসত্বের চশমা খোল, আর দুনিয়া দেখ। যে টাকা কামায় সে কম্মা, আর যে টাকা বাঁচায় সে অকম্মা, কিছু করে না। এই ছাগল প্রজাতির সাইকোলজি থেকে বের হন ভাইজান। আপনার স্ত্রীর কারণে আপনার সন্তানের টিচার খরচ, ডাক্তার খরচ, ডেকেয়ার খরচ, আরও কত খরচ বেঁচে যায় সেটা চোখে পড়ে না? মাস শেষে যে টাকাটা আপনি ব্যাংকে রেখে স্বপ্নের জাল বোনেন, ওটাই আপনার স্ত্রীর ইনকাম। মানবশিল্পের পিছনে বেঁচে যাওয়া মূল্যটাই জমানোর মওকা মেলে আপনার।

চিনি শিল্প, লৌহ শিল্প, জাহাজ শিল্প, রেশম শিল্প, তামাক শিল্প। একটা কাঁচামালকে আরও দামী আরও ব্যবহারযোগ্য পণ্যে পরিণত করাটাই তো শিল্প, তাই না? একটা র' মানবসন্তানকে মেহনত করে একজন সচেতন সুস্থ বিবেকবান সুনাগরিক মনুষ্যত্বওয়ালা দামী মানুষ বানানোর শিল্প এটা। মানবকে মানুষ বানানোর শিল্প। মানবশিল্প। মানুষ গড়ার শিল্প। আজ থেকে গৃহিণী - হাউজওয়াইফ - হোমমেকার সব বাকওয়াস বাদ। বোনেরা গলা চড়িয়ে নিজের পরিচয় দেবেন, আমি মানবশিল্পী। আর ভাইয়েরা নিজেদের স্ত্রীদের পরিচয় দেবেন বুক চাপড়ে, আমার বউ মানবশিল্পী। তোমার বউ পশ্চিমা পুঁজিবাদের দাসী? আর আমার বউ শিল্পী। ডোন্ট মাইন্ড।

আমার দ্বীনি চিন্তার বয়স কম। তাই গল্পগুলো রিপিট হয়। রাগ হয়েন না। মেডিকেলের এক ম্যাডাম ছিলেন, সাত ভাইবোন। কেউ ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-আমলা-শিল্পপতি। ওনার মা ‘রত্নগর্ভা’ অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। ম্যাডাম একদিন ক্লাসে শোনাচ্ছিলেন। আমার মনে উঁকি দিচ্ছিল একটাই প্রশ্ন- ম্যাডাম, আপনি কি কখনো পারবেন রত্নগর্ভা হতে। ওনার মা ছিলেন মানবশিল্পী। সাত সাতটা শিল্প তৈরি করেছেন ঘুমিয়ে- না ঘুমিয়ে, খেয়ে-না খেয়ে। ম্যাডাম তো আর পারবেন না। পুঁজিবাদ কেড়ে নিয়েছে তাঁর শিল্পীসত্তা। তাঁকে কেবলই চাকুরিজীবী বানিয়েছে, পুঁজির দাসী বানিয়েছে, উনি শিল্পী হওয়াকে আজ ছোট মনে করেন। সৃষ্টিশীলতাকেই, শিল্পকেই আজ পরাধীনতা মনে করেন। আর ৯টা- ৫টা গোলামির মাঝে হাতড়ে বেড়ান স্বাধীনতা আর সম্মান। ওয়াহ বিবেক ওয়াহ।

তাহলে কি আমি নারীর চাকুরি-ব্যবসার বিরুদ্ধে? প্লিজ ‘মা খাদীজাহ তো ব্যবসায়ী ছিলেন’, এই দলিল দেবেন না। মুসলিম হবার আগে কী করেছেন, এসব দলিল না। ইসলাম আসার পর নারীর জীবিকা অর্জনের হাদিস, ঘটনা ও পরবর্তী ইতিহাসগুলো সামনে নিলে ইন জেনারেল যে পিকচার উঠে আসে তা হল, নারীকে পেশা নেবার অনুমোদন ইসলাম দেয়। তবে সে পেশা অফিসে পুরুষ কলিগদের সাথে ৯টা-৫টা দাসত্ব নয়। সেটা ঘরোয়া পরিবেশে, স্বাধীন ভাবে, ইচ্ছেমত, যেদিন ভালো লাগে পেশা করলাম, যেদিন ভালো লাগছে না করলাম না। এবং সৃষ্টিশীল কাজ, ডাটা এন্ট্রি বা কেরানিগিরি না। ঐ হাদিসটা তো খুব পরিচিত, এক সাহাবী এসে বলে, ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আমার খুব অভাব। নবীজী বলেন, বিয়ে কর। আবার এসে বলে, আমার খুব অভাব; নবীজী আবার বললেন, বিয়ে কর। এভাবে ৪ টা বিয়ের পর ৪ নম্বর বউ ছিলেন সূচিশিল্পে পারদর্শী। তার থেকে বাকি ৩ বিবি শিখে নিলেন। এবার ঘরই হয়ে গেল ফ্যাক্টরি। মহিলা সাহাবী-তাবেঈনদের মাঝে শিক্ষকতা পেশা বেশ প্রচলিত ছিল। হাদিস-ফিকাহ ছাড়াও ভাষা ও সাহিত্য, গণিত ও হিসাববিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যার ক্লাস নিতেন তাঁরা নিজেদের ঘরেই। আর নার্সিং ও প্রসূতি সার্ভিস তো ছিলই। পর্দার হুকুম আসার আগে তো আর্মি মেডিকেল কোর মহিলা সাহাবীগণই সামলাতেন। উমাইয়া আর আব্বাসী খিলাফতে মেয়েরা আরেকটা পেশা খুব নিতেন— ক্যালিগ্রাফি, হস্তলিখনশিল্প। নারীর পেশা গ্রহণের জন্য ইসলাম কয়েকটা শর্ত দিয়েছে বলে ‘আমার মনে হয়েছে’। পর্দা যেন লংঘন না হয়, আর স্বামী-সন্তানের হক যেন নষ্ট না হয়, মানে মানবশিল্পের যেন ক্ষতি না হয়। পর্দার বিষয়টা একদম কঠিন না, আজকের দিনে গার্লস-অনলি স্কুল বা কলেজ বা ইউনিভার্সিটি করা কোন ব্যাপারই না। হাসপাতালের একটা ফ্লোর উইমেন-অনলি করা কোন ব্যাপারই না (খিদমাহ হাসপাতাল একটা উদাহরণ মিনিমাম মিক্সিং-এর)। গার্মেন্টসের একটা-দুটো ফ্লোর গার্লস-অনলি করা কোন বড় ইস্যুই না। তাহলেই পর্দা সহজ হয়ে যায়, কর্মক্ষেত্র আর বাসার মাঝের রাস্তাটুকু শুধু বোরকা পরে যাওয়া লাগে। আর এখন অনলাইনের যুগে নারীর পেশা কত সহজ হয়ে গেছে— অনলাইন ব্যবসা করা যায় ফুড আইটেম বা পোশাকের, ফ্রীল্যান্সিং। আসলে সদিচ্ছা আর আল্লাহর ভয়টাই আসল। পুঁজিবাদী কর্পোরেট কেরানিগিরি নারীর জন্য না, ৯টা-৫টা বাধ্যশ্রম নারীর নাজুক শরীরের জন্য না, যে শরীরকে বিশেষভাবে বানানো হয়েছে মানবশিল্পের জন্য, কর্পোরেট কালচারের ক্যারিয়ার উদ্বেগ-টেনশন নারীর মন-আবেগের সাথে যায় না, যে মনকে আবেগকে বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে মানবশিল্পের জন্য। বিস্তারিত নিয়ে একটা বই হচ্ছে ইনশাআল্লাহ, শুধু বোনদের প্রশ্ন নিয়ে। মোদ্দাকথা, ‘তোমাদের’ সারভাইভালের জন্য প্রজন্মকে ফিটেস্ট করে গড়ে তোলার শিল্পী কারা? নারীরা।

‘আমার মতে’, আজকে নারীবাদী এজেন্ডাগুলোতে মুসলিম মেয়েরা পা দেবার মূল কারণ আমরা পুরুষরাই। আমার মনে হয়, আমার তো কতকিছুই মনে হয়। পারিবারিক ইনসিকিউরিটি, সমাজের পুঁজিবাদী মূল্যবোধ আর নারীর প্রতি মুসলিম পুরুষের অনৈসলামিক আচরণ-ই তাদেরকে পুঁজিবাদের সহজ শিকারে পরিণত করেছে। মেয়েদের বুঝানো হয়, তুমি তো পরিবারে স্বামীর কাছে নিরাপদ না, স্বামী বের করে দিলে তুমি কী করবে? নারীর ক্ষমতায়ন হলে, তুমি চাকরি করলে তোমার গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে, অবদান বাড়বে, তখন স্বামী তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করবে না, তোমাকে বের করে দিলেও তুমি তো স্বাবলম্বী, বা স্বামী খারাপ আচরণ করলে ডিভোর্স দেয়া তোমার জন্য সহজ হয়ে যাবে। সমাজ ভাবে, যে টাকা আনে না সে অকম্মা। আমার স্ত্রী অমুক চাকরি করে, বলার মধ্যে একটা আত্মতৃপ্তি আছে। বা আমি টাকা কামাই করি, বস্তুবাদী দুনিয়ায় আমার বস্তু কেনার সামর্থ্য আছে, আমার ক্যারিয়ার আছে, এর মধ্যে আত্মতৃপ্তি খুঁজে ফেরে আমাদের মেয়েরা। আমরা পুরুষেরা যদি তাদের পারিবারিক অবস্থানটা তাদের দিতাম, যেটা ইসলাম তাদেরকে দেয়, আজ হয়তো বাঁধন ছেঁড়ার জন্য তারা এতটা ব্যাকুল না-ও হতে পারত। হাজার হাজার নির্লজ্জ বেদ্বীন মুসলিম পুরুষের যৌতুকের দাবি, টাকা চেয়ে প্রহার, লবণ কম হওয়ায় প্রহার, নারীর শ্রমের মূল্যায়ন না করা, প্রাপ্য আচরণটুকু না করার খেসারত আজ দিতে হচ্ছে। নিজ স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞ হোন। আজ আপনি যে ‘আপনি’, তার পিছনে একজন শিল্পীর বছরের পর বছরের শ্রম আছে, বিনিদ্র রাত আছে, মেশানো মমতা আছে, নিপুণ কারিগরি আছে। সেই শিল্পীকে ‘মা’ বলা হয়। আপনার ‘ব্যক্তি’ স্ত্রীর প্রতি না হোক, কমপক্ষে এই হাজার বছরের শিল্পের প্রতি কৃতজ্ঞ হোন। এই শিল্পের খাতিরে আপনার স্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধানত হোন। আপনার স্ত্রী একজন রক্ত-মাংসের মানুষ নন শুধু, একজন শিল্পী, হাজার বছরের পুরনো সেই শিল্পের অসংখ্য কারিগরের একজন গর্বিতা কারিগর, আপনার বিবি একজন ‘মা’। এবার তাকান তো আপনার স্ত্রীর দিকে।

আর বোনেরা, ক্যারিয়ারের দাসত্ব কখনোই এই ঐতিহ্যবাহী নিপুণতম শিল্পের চেয়ে আরাধ্য হতে পারে না। পুঁজিবাদ আপনাদেরকে পুরুষের প্রতিযোগী বানিয়ে জবমার্কেটে যোগান বাড়াতে চায়। যোগান বাড়লে চাহিদা কমে, ফলে দাম কমে। পুঁজিবাদের লাভ হয়। আপনারা পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন না, পুঁজিপতিদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন। যাতে কম পারিশ্রমিক দেয়া লাগে, মুনাফা বেশি থাকে ‘জেন্ডার সমতা’র নামে সেই চালই চেলেছে ক্যাপিটালিজম। এটা আপনি যত সহজে বুঝে নিবেন, তত আপনার জীবন মসৃণ হবে, আনন্দদায়ক হবে। নয়তো ক্যারিয়ারিজমের যাঁতাকলে আপনিই পিষবেন। নিজ শিল্পীসত্তাকে অশিক্ষিত বুয়ার হাতে তুলে দিয়ে, আপনি আনফিট একটা প্রজন্মের জন্ম দিয়ে যাচ্ছেন, আর কিছুই না। আয় করা আর ক্যারিয়ারিজমের বিষ এক না, ইসলাম আপনাকে আয় করতে নিষেধ করে না। কিন্তু ইসলাম নিজ শিল্পীসত্তাকে ব্যবহার করে মনের আনন্দে আপনাকে আয় করতে বলে, ঘরোয়া নিরাপত্তার সাথে। ইসলাম আপনার থেকে ৯টা-৫টা বাধ্যশ্রম নিতে চায় না। কেবল এই মানবশিল্পের খাতিরেই আপনাকে ইসলাম অব্যাহতি দিয়েছে রোজগারের বাধ্যবাধকতা থেকে, যুদ্ধের দায়িত্ব, শাসনের গুরুভার থেকে। মাকাসেদে শরীয়া বা ইসলামী সিস্টেমের ৫টা মৌলিক উদ্দেশ্যের একটা ‘আন-নছল’ বা ‘প্রজন্ম’, অর্থাৎ মানবশিল্প। ইসলাম মানব চায় না, মানুষ চায়। আর সেই মানুষ গড়ার শিল্পের শিল্পীরা কীভাবে জবাবদিহি করবে আসন্ন নষ্ট প্রজন্মের কাছে সেটাই দেখার বিষয়।

পৃথিবীর সকল মানবশিল্পীদের আমার সেলাম।