ক.

জাফর ইকবাল স্যার সমীপেষু,

কৃপণ হিসেবে আমার একটা বদনাম আছে। ঢাকা ভার্সিটির ছাত্র থাকাবস্থায় সোবহানবাগ থেকে কার্জন হল অবধি সাইকেল চালিয়ে যেতাম বলে বন্ধুরা এ মর্মে নির্দোষ টিটকারি মারত যে আমি যেন সাইকেলের বদলে রিকশা চালিয়ে যাই; এতে আমার ভার্সিটি যাওয়ার খরচ তো বাঁচবেই সাথে দু’পয়সা কামাইও হবে। বিদ্রুপ বন্ধুত্বসুলভ হলেও দাগ কিন্তু মনে একটু কাটেই। এই আমি যখন মুহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের “তোমাদের প্রশ্ন আমার উত্তর”- পড়লাম তখন সেই সব দাগ মুছে অহংকারের আল্পনা আঁকলাম মনে – আমার ছোট বেলার হিরো সাইকেল চালিয়ে কার্জন হলে যেত, আমিও যাই – বড় হয়ে আমি নিশ্চয়ই তার মত হতে পারব! আমার এ হিরোভক্তি নিয়েও কথা শুনতে হয়েছে – আমরা নাকি জাফর ইকবাল জেনারেশন – তার মত লেখার চেষ্টা করি, তার মত করে কথা বলি। কথাটা সত্য বিধায় খারাপ লাগলেও আপত্তি করিনি।

আমার হিরোর অবস্থান থেকে জাফর ইকবাল স্যারের পতন শুরু হয় একটা সাক্ষাতকার পড়ার পর থেকে। তিনি এক প্রশ্নের উত্তরে বললেন “মানুষের উৎপত্তি ক্রমবিবর্তন থেকে তা মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মত ধ্রুব সত্য” লেব্বাবা! আমি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র হিসেবে ক্রমবিবর্তন নিয়ে অনেক ঘাটাঘাটি করেও তো কোন বড় মাপের বিজ্ঞানীকে নিঃসন্দেহ প্রমাণ দিতে দেখলাম না। এরপর স্যারের আরো সব আচরণে খটকা বাড়তেই থাকল।

উনাকে মেইল করলাম – স্যার, আমি অধম আপনার বড় ভক্ত। আমার কটা প্রশ্নের উত্তর দেবেন দয়া করে –

১. আপনি কি আল্লাহকে একমাত্র উপাস্য হিসেবে বিশ্বাস করেন?

২. মুহাম্মদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহর প্রেরিত রসুল হিসেবে বিশ্বাস করেন?

৩. পরকালে সব কিছুর হিসাব নিকেশ হবে এটা মানেন?

তিনি আমার মেইলের উত্তরে বললেন তোমার যা খুশি ভেবে নাও।

আমি তাজ্জব হয়ে উত্তর দিলাম – হ্যাঁ না তো কিছু বলুন, আপনি যেটা সত্য মনে করেন সেটা স্বীকার করতে আপত্তি কোথায়?

তিনি উত্তর দিলেন “আই লাভ হেট মেইলস, আই হ্যাভ আ লার্জ কালেকশন অফ দেম”

যাচ্চলে! এটাই আমার আশৈশবলালিত মহাপুরুষের আসল চেহারা? এরপরে পদে পদে তার আদর্শের প্রতি আমার মনে ঘৃণা তৈরী হয়েছে, তিনি যা কিছু আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন তার মোহনী লেখনীর মাধ্যমে - তার প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মেছে। ইসলামবিরোধীতাকে যারা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে তার মধ্যে প্রথম আলো অন্যতম। সেখানে জাফর ইকবাল স্যারের সাম্প্রতিক লেখাটা পড়ে মনে হল তিনি তার মুখোশ ছেড়ে বেরিয়ে আসছেন। ইসলামের ব্যাপারে তার যে চরম আপত্তি আছে সেটা বলার সৎ সাহস তিনি অর্জন করেছেন। তিনি আমার এ খোলা চিঠির উত্তর দেবেন এত বড় আশা করি না, কিন্তু তার বিবেকে যদি ন্যুনতম সৌজন্যতাবোধ অবশিষ্ট থাকে তবে হয়ত তিনি এ লেখাটা পড়ে একবার ভেবে দেখবেন -

১. স্যার, ফতুয়া পড়া মেয়ে বিজ্ঞাপনের সুবাদে তরুণ প্রজন্মের প্রতিচ্ছবি হল, আর যে মেয়েটা নিজেকে গুনহীন পণ্যের মত বিক্রি করতে চাইল না সে হল ঘরে বন্দী? কখনও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কোন মুসলিমাকে জিজ্ঞাসা করে দেখেছেন সে কেন পর্দা করে? আমার স্ত্রী মুসলিম হবার পরে তার বিধর্মী মায়ের বাসায় পর্দা না করে যাবার চাইতে না যাওয়াই বেছে নিয়েছিল। আমাকে বোঝাতে পারবেন কেন সে জন্মদাত্রী মায়ের চেয়ে এই পর্দাকে অগ্রাধিকার দিল? ইসলামের প্রতি কতটা ভালবাসা থাকলে নিজের মায়ের ভালবাসাকে উপেক্ষা করা যায়? একজন মানুষের ভালোবাসাকে অপমান করার অধিকার আপনাকে কে দিল? আপনি তো আমাদের ছোটবেলা থেকে কেবল ঘৃণা করে শিখিয়েছেন, ভালোবাসার মূল্য আপনি কি বুঝবেন? পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ৭১ যা করেছিল সেই জন্য যদি সে সময়ে জন্ম না নেয়া পাকিস্তানীদেরও ঘৃণা করতে হয় তাহলে তো বাংলাদেশের মানুষ যত বাংলাদেশীকে মেরেছে সে কারণে সব বাংলাদেশীদেরও আমাদের ঘৃণা করতে হবে? কবে শেষ হবে এই ঘৃণার শৃঙ্খল বিক্রিয়া? যারা অপরাধ করেছিল তাদের তো আপনারা কিছু করতে পারেননি, সসম্মানে দেশে ফিরে যেতে দিয়েছিলেন। আমাদের প্রজন্মে বিদ্বেষের বীজ ছড়িয়ে আসলে কি আপনাদের ব্যর্থতার দায় মিটবে?

দুঃখিত স্যার, আমরা আপনার এই ঘৃণা-ব্যবসায় সঙ্গ দেব না। সৌদি আরবে বিচার করে দেয়া মৃত্যুদন্ডকে ‘হত্যাকান্ড’ বলা আমরা মেনে নেব না। কারণ যেদিন ১৬ বছরের আবদুর রহমান আল আওলাকিকে তার ১৭ বছরের ভাই সহ ড্রোন বিমান থেকে মিসাইল ছুড়ে মারা হয়েছিল সেটাকে আপনার হত্যাকান্ড মনে হয়নি। ফেলানিকে যখন মেরে কাটাতারের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল সেটাকে আপনার নিষ্ঠুর মনে হয়নি। যে নিজেকে মুসলিম বলে দাবী করে তাকে আমরা ভাই মনে করি। বাংলাদেশী মুসলিম যেমন আমার ভাই, আমেরিকান মুসলিম যেমন আমার ভাই, পাকিস্তানী মুসলিমও আমার ভাই, সৌদি মুসলিমও আমার ভাই। পাকিস্তানীরা বর্বর, সৌদিরা নিষ্ঠুর - এই ঘৃণার বীজ আমরা বুক থেকে বের করে ফেলেছি। আমাদের ভালবাসা আল্লাহর ওয়াস্তে, তাকে খুশী করার জন্য। এই ভালোবাসা কি যারা বুঝতে পেরেছে, তারা জানে একদিন এই মুসলিম ভাইরা আমাদের বিপদে পাশে এসে দাঁড়াবে। ইঙ্গ-মার্কিনীরা আমাদের গ্যাস তুলতে না পারলে আগুনে জালিয়ে দেবে, ভারতীয়রা আমাদের ফারাক্কা-তিস্তা-টিপাইমুখ বাঁধে, ফেনসিডিলের বন্যায় আমাদের তিলে তিলে হত্যা করবে। ওদের কাছে আগে আপনারা আকাশ বিক্রি করেছিলেন, এখন মাটি বিক্রি করছেন – আমরা কিন্তু ঠিকই বুঝি কে আমাদের ভালোবাসে আর কে আমাদের বাঁশ দেয়! আপনি যাদের ভালোবাসতে বলবেন আমরা তাদের ভালোবাসি না, আমরা বড় হয়েছি স্যার; কে বন্ধু কে শত্রু সেটা আমরা চিনতে পারছি।

২. কওমি মাদ্রাসা নিয়ে আপনার মায়াকান্না দেখে আমার শুকনো ঠোঁটে হাসতে গিয়ে রক্ত ঝরেছে। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে না এবার মাদ্রাসার ছাত্রদের ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ না দেয়ার পায়তারা ছিল? শেষে মানবিক বিভাগের ভর্তিপরীক্ষায় এক মাদ্রাসা ছাত্র প্রথম হয়ে দেখিয়ে দিল যে মাদ্রাসা শিক্ষার যেটুকু সীমাবদ্ধতা আছে তা আপনার মত মানুষদের উন্নাসিকতার কারণে। শিক্ষার মূল্য আপনি বোঝেন টাকা কামাই করার মানদন্ডে – তাই একটা ছেলের কলা বিক্রিকে আপনার কাছে জীবনের অপচয় মনে হয়। আমার কাছে তাকে পাকা মানুষ মনে হয়, রিকশাওয়ালা তরুণকে খাঁটি মানুষ মনে হয়। এরা নিজেদের শরীরের ঘাম ঝরিয়ে টাকা কামাই করে বাসায় নিয়ে যায়, অভুক্ত ভাই-বোন দের মুখে তুলে দেয়। এরা মগজ বিক্রি করে দেশের ক্ষতি করে না, দেশের মানুষকে অন্যদের কাছে বিক্রি করে দেয় না। সৌদি শ্রমিকদের নিয়ে তো অনেক মায়াকান্না কাঁদলেন – এদের দেশে করার মত কাজের ব্যবস্থা করার তো কোন কথা বললেন না। পরিবার ছেড়ে মানুষ কি বিদেশে গতর খাটে নিজের সুখের জন্য? জানেন দেশে পাঠানো টাকায় সময় আমার ১৬ মাসের ছেলেটাকে দেখার জন্য কতটা হাহাকার মিশে থাকে? আপনারা হিসাব করেন ‘ফরেন রেমিটেন্স’ – আমার স্ত্রীর, আমার মায়ের অশ্রুর দাম আছে আপনাদের কাছে? আমাদের জন্য আপনার কোন স্বপ্ন নেই – আমরা দেশে এসে যেন কিছু করতে পারি সেই ইচ্ছাও নেই। বিদেশে থাকুক, পিএইচডির কামলা খাটুক কিংবা আকাশ-ছোঁয়া দালানের মিস্ত্রী হোক – টাকা পেলেই তো আপনারা খুশি তাই না? সৌদি জল্লাদ এক কোপে কল্লা নামায় কি ভয়াবহ কথা! আপনারা সুশীল কসাই – টাকা কামানোর হাইড্রোলিক প্রেসে চিপে চ্যাপ্টা করে তিলে তিলে মারবেন – এই না হলে সুখের মৃত্যু!

স্যার, পারবেন কখনও আপনার পশ্চিমা শিক্ষার মোড়কটা ছেড়ে বেরিয়ে এসে দেখতে কেন একটা ছেলে কওমি মাদ্রাসায় যায়? কারণ – দুটো: হয় তাদের বাপেদের সরকারী প্রাইমারী স্কুলে পড়ানোরও সামর্থ্য থাকে না, নয়ত তাদের বাবারা চায় তাদের সন্তান আলিম হোক। আলিম মানে কি বোঝেন? যে মানুষকে আল্লাহর পাঠানো জ্ঞান শেখায়। এই জ্ঞান ‘থিওরি অফ রিলেটিভিটির’ মত কয়েকদিন পর পর হুমকির মুখে পড়ে না, ‘ সেন্ট্রাল ডগমা অফ লাইফের’ মত একদিন হঠাৎ উলটো পথে হাঁটা ধরে না। এটা বিবিএ ডিগ্রী না স্যার, যাতে মানুষকে ভুলিয়ে ‘গ্রোথ’ এর কার্ভ উর্ধমুখী রাখতে শেখান হবে। এটা বার-এট-ল না যাতে চোর-ছ্যাচ্চরকে মুক্তি দেয়ার রাস্তা বাতলানো শেখাবে। যেটা পড়লে টাকা আসে না সেটা পরে কি লাভ সেটা আমি আপনাকে বোঝাতে পারব না। যারা ইসলাম শিখেছে, বুঝেছে তাদের কাছে এই দুনিয়ার ব্যাংক ব্যালেন্সের কোন দাম নেই – এরা টাকা কামাই করার মেশিনের জায়গা থেকে মানুষের পর্যায়ে উঠতে পেরেছে। ইসলাম শেখা আর শেখানোর জন্য যে মানুষগুলো নিজেদের জীবনের পার্থিব সুখ-স্বচ্ছলতাকে পরিত্যাগ করল তাদের অপমান করার অধিকার কে দিল আপনাকে?

৩. স্যার, অর্থনীতিতে শ্রমবন্টনের কথা পড়েছেন নিশ্চয়ই। আমাদের দেহের কোষ আর টিস্যুর মত আল্লাহ সমাজেও শ্রমবন্টন করে রেখেছেন সমাজটা যাতে চালু থাকে। মেয়েরা কোমল তারা এক ধরণের কাজ করবে, পুরুষরা রুক্ষ তারা অন্য ধরণের কাজ করবে। গাড়ীর টায়ার থাকবে বাইরে, সে শক্ত রাস্তার ঘর্ষণ সহ্য করবে, টিউব থাকবে ভিতরে – সে টায়ারটাকে ফুলিয়ে সচল রাখবে। টিউব কেন সারাজীবন ভিতরে থাকবে – এই বৈষম্য মানি না বলে সে যদি রাস্তায় নামে তবে কতদূর চলবে গাড়ী? মেয়েরা অবশ্যই শিক্ষিত হবে কিন্তু টাকা কামাই তাকে করতেই হবে এ দিব্যি কে দিয়েছে? শিক্ষার উদ্দেশ্য কি কেবল ডিগ্রি নেয়া আর চাকরি করা? আমার স্ত্রী যদি আমার ছেলের সাথে আরো দশটা বাচ্চা পড়ায় আমার আপত্তি নেই, কিন্তু তাকে কেন আমি শতাব্দী বাসের দমবন্ধ ধাক্কাধাক্কির মধ্যে ঝুলতে ঝুলতে গুলশানে অফিস করতে পাঠাব? সে যে টাকা কামাই করে আনছে তা যদি ডে-কেয়ার আর রেডিমেড ফুডেই খরচ হয়ে যায় তাহলে লাভটা হল কি? আমার স্ত্রী যদি ব্যাংকে বা মোবাইল কোম্পানীর কাস্টমার কেয়ারে হাজারো অজানা মানুষের সেবা করার চেয়ে তার প্রিয়জনদের সেবা করা বেশি পছন্দ করে তাহলে কেন আমি তাকে ঘরের বাইরে যেতে বাধ্য করব? সামর্থ্যনুযায়ী আমি তাকে ডাল খাওয়ালে সে যদি খুশী থাকে তাহলে আমি প্রতিদিন মাংশ খাওয়ার লোভে কেন নটা-পাঁচটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর দাসীগিরি করতে বাধ্য করব? সে ঘরে থাকবে এটা তার ‘চয়েস’ – এখানে আপনার এত গাত্রদাহ কেন?

পথে খালি পায়ে বের হলে পায়ে ময়লা লাগে, শক্ত নুড়িকণা পা ক্ষত-বিক্ষত করে। সারা পৃথিবী চামড়ায় না ঢেকে নিজের পাটা জুতোয় পুরে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ। দেশ স্বাধীন হবার পরে আধুনিকতার জোয়ারে আপনারা সমাজকে যে স্রোতে চালিয়েছেন তাতে আত্মসম্মান রক্ষা করার সবচেয়ে ভাল উপায় পর্দা করা। একটা মেয়ে এই সরল যুক্তিটা বুঝে নিজেকে ঢেকে রাখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলে আপনার পরমতসহিষ্ণুতা হঠাৎ পালিয়ে যায় কেন? আপনাকে কেন আপনার ছাত্রীর চেহারা দেখে চিনতে হবে? চিনলে আপনার কটা পেপার বেশি পাবলিশ হবে? তার গ্রেড কত বাড়বে? সে তো দেহে পর্দা করেছে, মগজে না, তার মেধা দিয়ে তাকে পরিমাপ করতে আপনার কেন এত আপত্তি?

ভাষা আন্দোলনের বোরখার অনুপস্থিতি যদি নারী প্রগতি হয় তাহলে আজ কেন শাড়ির অনুপস্থিতি ক্ষয়িষ্ণু বাঙ্গালীত্ব না হয়ে আধুনিকতার চেহারা নিল? শাড়ি পড়া মেয়েরা আন্দোলন করে যে ভাষা আনল সেটাতে কেন জিন্স-ফতুয়া পড়া মেয়েরা কথা বলছে না? তারা যে ভাষায় কথা বলছে তার নাম কী? সুদূর আমেরিকাতে কেন বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম ভারতীয়দের সাথে হিন্দিতে কথা বলে? বাড়িতে বাড়িতে বিয়েতে হিন্দি গান বাজে, আপনাকেও সেই চটুল কথা-সুরের সাথে নাচতে দেখেছি। আপনার আপত্তি কি আসলে এখানে যে আমাদের হিন্দি গানের সাথে নাচতে রুচিতে বাধে? একটা মেয়ে স্বামীর বদলে হাজারো মানুষের সামনে বিকৃত অঙ্গভঙ্গি করে মনোরঞ্জন করবে এটাকে আমরা প্রগতি বলি না স্যার, নোংরামো বলি। একটা ছেলে ছটা মেয়ের সাথে শুয়ে বাপের পয়সা গুণে সপ্তমটাকে বিয়ে করবে – এটা আমাদের কাছে পবিত্র প্রেম মনে হয় না স্যার, দুঃখিত। এটা লুইচ্চামি, ভন্ডামী। আমি লম্বা জামা পড়ে, মুখে দাড়ি রেখে, গোড়ালি অবধি প্যান্ট গুটিয়ে মাথা নিচু করে পথ চলব, আমি আমার তরুণ ভাইদের তা করতে বলব। আপনি আমার গায়ে মৌলবাদের তকমা দেন, আমার একটুও যায় আসে না।

৪. স্যার আপনি যেমন আপনার আত্মাকে এক অজানা প্রভুর কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন তেমন আমিও আমার দেহ-মন-জীবন-মরণ আমার প্রভু আল্লাহর কাছে বিক্রি করে দিয়েছি। স্ত্রী- সন্তানসহ পুরো পরিবারকে উৎসর্গ করেছি। শুধু আমি না স্যার, আমার মত লাখো মুসলিম তরুণ আছে যারা নিজেদের এভাবেই আল্লাহর রাস্তায় কুরবানী করে দিয়েছে নিজেদের। পাকিস্তানে কেন এত জঙ্গী জানেন স্যার, কারণ সে দেশের কিছু মানুষ দেশটিকে আমেরিকার কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। আমরা আমাদের দেশকে কারো কাছে বিক্রি করতে দেব না, তাতে আপনি আমাকে হিজবুত তাহরির ভাবেন আর শিবির। জঙ্গী ব্যবসা মাল্টিমিলিয়ন ডলারের ব্যবসা, দেশে জঙ্গী আছে এই হুজুগ তুলতে পারলে অনেক টাকা ভিক্ষে পাওয়া যায়। আমাদের তরুণ সমাজকে লুলা-কানা বানিয়ে সুশীল সমাজকে ভিক্ষে ব্যবসা করতে দেব না, যদি মরে যাই তো যাব – আপনারা জঙ্গী বললেও আল্লাহ জানেন আমরা আমাদের দেশকে কত ভালবাসি, দেশের মানুষকে কত ভালবাসি। কারণ আমি মুসলিম, আমি নিজের জন্য বাঁচিনা, আল্লাহর জন্য বাঁচি।

আপনি আমাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখেন না কিন্তু আমরা আমাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখি। কিন্তু সেই স্বপ্ন শুধুই পার্থিব ভোগ-বিলাসের সুখস্বপ্ন না। প্রত্যেকটা পুরুষ যেন হালাল রুযি কামাই করে পরিবারসহ দু’বেলা খেতে পারে সেই স্বপ্ন। প্রত্যেকটা মেয়ে যেন শিক্ষিত হয়, সন্তানকে নিজের সৃষ্টিকর্তাকে চিনতে শেখায়, নীতিবোধ শেখায় সেই স্বপ্ন। আমরা শুধু স্বপ্ন দেখি না স্যার পরিকল্পনাও করি। আমরা সে অনুযায়ী কাজ করার চেষ্টা করি। কি কাজ শুনবেন? ইসলাম শিখি, নিজের জীবনে প্রয়োগ করি, অন্য মানুষকে ইসলামের সৌন্দর্যের দিকে ডাকি। ক্ষমতা চাই না, সম্পদ চাই না, খ্যাতি চাই না - সবাই যেন ভাল থাকে শুধু এটাই চাই - ব্যাস! আমাদের এ চেষ্টায় আপনার প্রভু যেমন খাপ্পা তেমনি আপনিও। কিন্তু বিশ্বাস করেন আমরা আপনার উপর ক্ষুব্ধ নই, আপনার জন্য শঙ্কিত। আপনি যাকে প্রভু হিসেবে নিয়েছেন সে মানুষকে প্রতারণা করে স্যার, সে মিথ্যা আশ্বাস দেয়। আপনার জন্য করুণা হয় স্যার, আপনি এত কিছু বুঝলেন – ইসলামটা বোঝার চেষ্টা করলেন না? যিনি আপনাকে মাথা ভরে মেধা দিলেন, সোনা দিয়ে গড়া লেখার হাত দিলেন তার বিরুদ্ধে কতক্ষণ যুদ্ধ করবেন স্যার? আর কতদিন যুদ্ধ করবেন? আপনি যে হেরে যাচ্ছেন সেটা কি আপনার চুলের পাক বলে দিচ্ছে না?

শ্রদ্ধেয় জাফর ইকবাল স্যার, আমি আপনার হিদায়াতের জন্য দু’আ করি যেন আপনি ইসলামের মর্ম বুঝে মুসলিম হয়ে মারা যেতে পারেন। আল্লাহ যদি বাঁচিয়ে রাখেন আমি যেন আমার শৈশবের হিরোর জানাযা পড়তে পারি।

খ.

আমার কিশোর সময়টা কেটেছে জাফর ইকবালের লেখা গোগ্রাসে গিলে। জাফর ইকবালের কোনো কিশোর উপন্যাস বের হয়েছে আর আমি তা পড়িনি তা অসম্ভব। একেকটা বই হা করে গিলতাম আর ভাবতাম একটা লোক এত ভালো লেখে কি করে? এত সুন্দর গল্প যে মানুষটা বলে এত জটিল সব সায়েন্স ফিকশন যিনি লিখেন তিনি না জানি কত্ত বড় বিদ্বান, কত্ত বড় মহাজ্ঞানী। কিশোর আমি মোহবিষ্ট হয়ে পড়েছিলাম তার ভাষার জাদুতে, গল্প বলার ধরণে।

একথা অনস্বীকার্য যে আল্লাহ তা’য়ালা মানুষটাকে আকর্ষণীয় রংচঙে মোড়কে অতি সাধারণ কথাকে অসাধারণ করে উপস্থাপন করে তোলার চমৎকার একটি ক্ষমতা দিয়েছেন।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে জাফর ইকবালের সমর্থক গোষ্ঠীর একটা বড় অংশ হচ্ছে উঠতি বয়সি ছেলেমেয়েরা বা তার লেখা পড়ে কৈশোর পেরোনো ছেলেপেলেরা।

রাসুল(সা:) “কথাকে” বলেছেন, ‘সিহর’ বা ‘জাদু’। আর জাদু শব্দটি ইসলামে কখনোই পসিটিভলি ব্যবহৃত হয়নি। কথার জাদুতে, এলোমেলো বিশ্রী, মিথ্যা কথাকেও সুনিপুণভাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে বলে মানুষকে বিশ্বাস করানো যায়, বা নিয়ে যাওয়া যায় নিজের স্বার্থসিদ্ধির পথে। এ কাজটাই অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বছরের পর বছর করে যাচ্ছেন আমাদের মুহাম্মাদ জাফর ইকবাল স্যার।

অন্য কারো দৃষ্টান্ত বা উদাহরণ আমি টানতে যাবো না, নিজের কথাই বলি। আমার জীবনের একটা বড় সময় পর্যন্ত রাজাকার শব্দটা আমার সামনে উচ্চারিত হলে যে চেহারাটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠতো সেটা দাঁড়ি-টুপি পড়া এক বৃদ্ধ লোকের। সাকা চৌধুরীর মতো ক্লিন শেভড লোকেরাও যে রাজাকার হতে পারেন, তা কোনদিন কখনোই আমার মাথায় আসেনি। না আসার কারণ- আমার মনে মননে অত্যন্ত সুচারুভাবে জাফর স্যারেরা গেঁথে দিয়েছেন দাঁড়ি-টুপি রাজাকারি লেবাস। আর কেউ নয়।

সময়ে-অসময়ে সুযোগ পেলেই ইসলাম বনাম মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞান বনাম ইসলাম, আধুনিকতা বনাম ইসলাম প্রভৃতি বিষয়কে তিনি বছরের পর বছর মুখোমুখি অবস্থান করিয়ে আমাদের বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন যে এগুলো সমান্তরালে চলতে পারে না। একটা আরেকটার বিপরীত। ফিল্টার পেপার তৈরি করা আমাদের শিখিয়েছেন কারণে-অকারণে। যে পেপারে আজ তিনি নিজেই আটকে একটা বেরাছেরা অবস্থা। তার সর্বশেষ লেখাটা পড়ে আমার মনে হয়েছে দিনের পর দিন মুক্তিযুদ্ধের সস্তা আবেগের যে নৌকাটা ভাসিয়ে তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন, ইসলামকে কটাক্ষ করার সুযোগ হাতড়ে বেড়িয়েছিলেন তার তলা ফুটো হতে শুরু করেছে। একজন ডুবন্ত মানুষ খড়কুঁটো আঁকড়ে বাঁচতে চাইবেন এটাই স্বাভাবিক। দিশেহারা স্যার আমাদের তাই সমর্থকদের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন- এ ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে, বাচিয়ে রাখতে। তার ভাষায়-

আমি আমাদের দেশের সেই তরুণদের কাছে আবার ফিরে যেতে চাই। তাদের অনুরোধ করে বলতে চাই, তোমরা আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশকে ফিরিয়ে দাও। মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের যে দেশ দিয়েছিল সেই দেশ নিলয়ের হত্যাকারীদের নয়। সেই দেশ আমাদের। আমরা যদি হত্যাকারীদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করে না আনি, তাহলে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের ঋণ শোধ হবে না।

আবার সেই একই পুরান কাসুন্দি। আহারে। মুক্তিযুদ্ধের ধোঁয়াশা পরিষ্কার হয়ে গেলেই যে বেরিয়ে পড়বে এদের আসল স্বরুপ, চেহারার রঙ, দ্বিমুখিতার গল্প...

গ.

শুরুতেই গণিত অলিম্পিয়াড ও সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতির মতো আমাদের দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য উনাকে ধন্যবাদ জানাই। এবং অবশ্যই উনি এইক্ষেত্রে ধন্যবাদ পাওয়ার দাবিদার।

আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েরা ছোটবেলা থেকে যার বই পড়ে বড় হয়, যার বইয়ের প্রতিটি কথা তাদের মননে গেঁথে যায় তিনি হলেন জাফর ইকবাল। আমি নিজেও স্কুল লাইফে থাকার সময় টেক্সট বইয়ের উপরে তার বই রেখে পড়তাম। আম্মু আসলেই লুকিয়ে টেক্সট বই পড়ার ভান করতাম। এতো সুন্দর করে লিখার ক্ষমতা তার এক বই পড়া শেষ হলেই আরেক বই পড়তে ইচ্ছা করে। এমন কোন ছেলে-মেয়ে পাওয়া যাবে না যে তার লিখা বই না পড়ে বড় হয়েছে। সমকালীন সকল লেখকের মধ্যে কিশোর বয়সীদের উপর তার আধিপত্য শীর্ষে।

কলেজ লাইফে থাকাকালিন একদিন মসজিদের ইমাম হুজুর কুরআনের তাফসির করার সময় কথা প্রসঙ্গে বললেন আজকের ছেলে-মেয়েরা কুরআন হাদিস পড়ার পরিবর্তে হুমায়ুন আজাদ, জাফর ইকবালদের বই পড়ে ছোটবেলা থেকেই ব্রেইনওয়াশড হয়ে বড় হচ্ছে। পরে হুজুরের সাথে এই ব্যাপারে কথা বললে উনি আমাকে বিস্তারিত বলেন। কিন্তু আমার মাথায় কোনভাবেই ঢুকে না যে জাফর ইকবালের মতো একজন মানুষ কিভাবে ইসলামবিদ্বেষী হতে পারেন।

তার বইয়ে তো ইসলামের বিরুদ্ধে সরাসরি কিছুই বলা নেই তারপরও কেন তার বিরোধিতা করা হয়????

বছর দু’য়েক ধরে প্রথম আলোতে লিখা তার কলামগুলো মনযোগ দিয়ে পড়া শুরু করি। সত্যিই তার মতো ধূর্ত মানুষ বাংলাদেশে একটিও আছে কিনা আমার সন্দেহ আছে। কলমের খোঁচায় এতো নিপুণভাবে হিজাবের বিরোধিতা, দাড়ি-টুপি-পাঞ্জাবীকে রাজাকারের প্রতীক এবং দুষ্ট লোকের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন খুব কম লেখকের পক্ষে লিখাই সম্ভব। এমনভাবে লিখে যে “সাপও যেন মরে লাঠিও যেন না ভাঙে” ধাঁচের! উনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলেন, তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিতে বলেন অথচ যুদ্ধের সময় তিনি একজন তরুণ ছিলেন কিন্তু যুদ্ধে কেন যাননি তার জবাব তরুণ প্রজন্ম কখনই পাবে কিনা সন্দেহ। চেতনার আড়ালে উনি উনার সায়েন্স ফিকশন + গল্পের বইগুলোতে দাড়ি-টুপি-হিজাব সম্পর্কে কিশোর বয়স থেকেই এক ধরণের নেগেটিভ ধারণা তৈরি করে চলেছেন।

...

তার লিখা কিছু বইয়ের উদাহরণ দিলাম।

বইয়ের নামঃ জারুল চৌধুরীর মানিকজোড়

লেখকঃ মুহম্মদ (মোহাম্মাদ না কিন্তু) জাফর ইকবাল

একুশে বইমেলা ৯৫-তে জ্ঞানকোষ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত

বইয়ের প্রধান চরিত্র ও গল্পকথক বার বছরের মুনিরের বাবার যে বৈশিষ্ট্যগুলো সেই শিশুদের জন্য লেখা বইয়ে বর্ণনা করা হয়েছে তা হল,

মুনিরের বাবা

১- নিয়মিত নামায পড়েন। কখনো নামায ক্বাযা করেন না।

২- তার থুতনিতে এক গোছা দাড়ি আছে। এই কারণে তাকে পশু মনে হওয়া বিচিত্র কিছু নয়।

৩- সন্তানদের পিটিয়ে খুব মজা পান। তাই কোন দোষ না পাওয়া গেলেও নিজ সন্তানদের প্রচণ্ড মারধর করেন।

৪- ওষুধের কোম্পানিতে চাকরী করেন। সেখান থেকে ওষুধ চুরি করেন আর ভেজাল ওষুধের ব্যবসা করেন।

৫- সন্তানদের 'শুওরের বাচ্ছা' এবং 'হারামজাদা' ছাড়া অন্য কিছু বলে ডাকেন না।

৬- নিয়মিত সুর করে কোরআন তেলাওয়াত করেন।

এই লেখাগুলো বইয়ের পাঁচ থেকে আট নম্বর পৃষ্ঠার মধ্যে রয়েছে।

দুষ্টু ছেলের দল” বইয়ের কিছু অংশ তুলে ধরলাম--

“ওরা দল বেধে যাচ্ছে, সবার থেকে একটু পিছনে আরিফ। ও সব সময়ই এরকম, দলের ভেতর থেকেও দলছাড়া, ওর হাতে একটি ছোট লাঠি, সেটা ঘোরাতে ঘোরাতে যাচ্ছে। হঠাত কী মনে পড়ায় এগিয়ে এসে বলল, মানুষকে সালাম দিলে কয় নেকী জানিস? ওকে ঠাট্টা করে ফজলু বলল, কয় নেকী? আরিফ তার তোতলামো নিয়ে ঠাট্টা তামাশায় কখনো কিছু মনে করেনা। তাই না ক্ষেপে গম্ভীর গলায় বলল, বিশ নেকী। তুই কীভাবে জানিস? আমাদের বা-বাসায় পিছনে মাইকে ওয়াজ হয়, সেখানে মৌলভী সাহেব বলেছেন। ফজলুর সব কিছুতেই ঠাট্টা, এবারও তার ব্যতিক্রম হল না। এক নিশ্বাসে সবাইকে সালাম দিয়ে বুক ঠুকে বলল, আমার পাঁচ কুড়ি একশ নেকী হয়ে গেল! কত নেকী হলে বেহেস্তে যাওয়া যায়রে? আরিফ সেটা বলতে পারল না। ওয়াজে বলা হয়নি। ফজলুরের বুদ্ধিটা অবশ্য খারাপ না, একবার সংখ্যাটা জেনে নিলে শুধু মানুষকে সালাম দিয়েই বেহেস্তে যাওয়া যেত, কষ্ট করে আর নামাজ রোজা করতে হত না।”

আরও কিছু বইয়ের রেফারেন্স দিলাম। নিজ দায়িত্বে যাচাই করে নিবেন আশা করি।

  • বাচ্চা ভয়ংকর কাচ্চা ভয়ংকর (ধার্মিক লোকটাকে খচ্চর-গোয়ার-দুষ্ট হিসেবে উপস্থাপন)
  • আমার বন্ধু রাশেদ (হিজাব বিরোধীতা, রাজাকারের চরিত্রে দাড়িওয়ালা-পাঞ্জাবী-টুপি পরা)
  • সায়রা সায়েন্টিস্ট (হুজুর বন্ধু যা বলবে তার উল্টা কাজ করতে উৎসাহিত করা হয়েছে)
  • রাজু ও আগুনালির ভূত (ভিলেন হলেন জোব্বা পরা-দাড়ি-টুপি ধারী হুজুর)
  • বুবুনের বাবা (ভিলেন হল দাড়িওয়ালা-টুপি-জোব্বা পরা)
  • টি-রেক্সের সন্ধানে (এই বইতে সরাসরি খোদা নেই, খোদার উপরে বিশ্বাস নেই বলেই উল্লেখ করা হয়েছে, নামাজ পড়লেও কাজ হবে কিনা সন্দেহ তুলে ধরা হয়েছে)

এভাবে তার "প্রায়" প্রত্যেক বইতে ভিলেন হচ্ছে দাড়ি-টুপি-পাঞ্জাবী পরা লোকেরা। আর প্রথম আলোতে বিভিন্ন সময় লিখা তার কলামগুলো তো আছেই যেখানে হিজাবের বিরুদ্ধে উনার চুলকানি সরাসরি প্রকাশ পেয়েছে। (লিঙ্ক চেয়ে আমাকে লজ্জিত করবেন না আশা করি!)

নাটক ও সিনেমায় ইসলামকে ব্যঙ্গঃ

বৃষ্টি ও তার ভয়াবহ নানা” গল্পে নানাকে দেখানো হয়েছে “একজন কুৎসিত কুসংস্কারছন্ন মানুষ, যে কিনা গোড়ালির এক বিঘৎ উপরে লুঙ্গি পরে।”

[গোড়ালির উপরে পোশাক পরা রাসুল(সঃ) এর সুন্নাত]

ভুতের বাচ্চা সোলায়মান” নাটকের ভিলেন (দবির চাচা) একজন সৌদি ফেরত দাঁড়ি ও সৌদি পোশাক পড়া লোক। তিনি বাচ্চাদের একেবারে পছন্দ করেন না, সারাদিন হিন্দি গান দেখেন এবং একপর্যায়ে সোলায়মানকে বেসরকারি টিভি চ্যানেলের সন্ত্রাসীদের কাছে বিক্রি করে দিতে চায়।

শান্তা পরিবার” নাটকে দুটো ভিলেন ক্যারেক্টার। একজন হলেন রাঙ্গা ফুপু নামক একজন বয়স্কা মহিলা, তিনি যখন বাচ্চাদেরকে প্লেট পরিষ্কার করে খেতে বলেন (খাবার নষ্ট না করা, যা কিনা রাসুল(সঃ) এর সুন্নত) তখন বাচ্চারা তাকে নিয়ে খুবই হাসাহাসি করে। অপরজন হলেন বয়স্ক ভদ্রলোক আফতাব চাচা (টুপি, পাঞ্জাবী ও পায়জামা পড়া), তিনি দান-খয়রাত নিয়ে “হাস্যকর” কথা বলেন এবং খুবই ছোট মনের “সাম্প্রদায়িক”! (বাচ্চাদের দৃষ্টিতে উপস্থাপিত)। বাচ্চাদের হাতে এই দুই ব্যক্তিকেই অনেক নাজেহাল হয়ে বাসা ছাড়তে হয়। অবাক ব্যাপার হল, এই একই নাটকে সাইদ ভাই (বেয়াদব টাইপের ভ্যাগাবন্ড ছেলে) কেও অনেক বেশি পজেটিভ ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এই দুই ভিলেন ক্যারেক্টারের চাইতে।

আমার বন্ধু রাশেদ” সিনেমার সব রাজাকাররা পাঞ্জাবী ও টুপি পরে এবং অধিকাংশের মুখে দাঁড়ি ও কপালে অধিক নামাজ পড়ার ফলে তৈরি কালো দাগ। মজার ব্যাপার হল, শফিক ভাই (নায়ক) যখন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিবে তার আগে সে ক্যামোফ্লাজ নিতে দাঁড়ি গজিয়ে বসে বসে নামাজ শিক্ষা বই থেকে “আত্তাহিয়্যাতু” মুখস্ত করছে। ইবু যখন তার সাথে দেখা করতে আসলো তখন সে তাকে জিজ্ঞেস করে, “মুসলমানের কালেমা কয়টা জানিস?”এক পর্যায়ে শফিক ভাই মাথায় টুপি দিয়ে ইবুকে জিজ্ঞেস করলো, “আমাকে কেমন লাগছে?” ইবু বলল, “আমাদের স্কুলের দপ্তরির মত”। উত্তরে শফিক ভাই বলল, “দূর বোকা! আমি হচ্ছি তালেবুল এলেম, মাদ্রাসার ছাত্র”! সিনেমার প্রায় শেষের দিকে ইবু আর তরু আপাদের ফ্যামিলি শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে চলে যায়। যাত্রার এক পর্যায়ে যখন নৌকার মাঝি বলল, “আর ভয় নাই, এই গ্রামে মিলিটারিরা ঢোকে না, এই গ্রামে সব জয় বাংলা”। তখন তরু আপা (নায়িকা) খুশিতে আত্মহারা হয়ে তার বোরকা আর হিজাব খুলে ফেললো! সে কি পালানোর জন্য / লোকদেখানোর জন্য বোরকা আর হিজাব পরেছিল?”। তাহলে বাইরের লোকদের সামনে হিজাব খুলে ফেললো কেন?

যখন রাজাকার আজরফ আলি রাশেদকে “পাকিস্থান জিন্দাবাদ” বলতে বলল, কিন্তু রাশেদ “জয় বাংলা” বলাতে তাকে গুলি করলো। তারপর রাশেদকে কালেমা পড়তে বলায় সে না পড়েই মারা গেল।

মৃত্যুর পূর্বে তার কাছে কালেমা বলার চেয়ে “জয় বাংলা” বলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।


কতো সূক্ষ্মভাবে বুরকা, হিজাব, কালেমা, টুপিকে ব্যঙ্গ করা। সত্যিই এমন জঘন্য কাজ করতেও যোগ্যতা থাকা লাগে। যা জাফর ইকবালের কাছে আছে।

এইভাবেই পিচ্চিকাল থেকেই মগজ ধোলাই হচ্ছি আমরা!

যেসব তরুণরা আজকে ইসলামি মূল্যবোধের বিরুদ্ধে কথা বলে তারাই তার বই পড়ে এবং অন্তরে ধারণ করে গড়ে উঠা আজকের কথিত “নতুন প্রজন্ম” দাবিদার। এখনই সময় আমাদের ছোট ভাইবোনদের এইসব ইসলামবিদ্বেষী লেখকদের বই পড়া থেকে বিরত রাখা।

মনে রাখবেন এদের বই পড়ে সামান্য জ্ঞান অর্জন করতে গিয়ে আপনার আমার ভাইবোন যেন ইসলামি বিধিবিধানকে অবজ্ঞা করতে না শিখে। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সহিহ বুঝ দান করুন এবং ইসলাম বিরোধী সকল ফিতনা থেকে হিফাজত করুন। আমিন।

ঘ.

বিসমিল্লাহহির রাহমানির রাহিম

স্যার আমি জানি আমার এই লেখা হয়তো আপনার কাছে পৌঁছবেনা, পৌঁছলেও হয়তো পড়ে দেখার সময় আপনার হবে না। তারপরেও লিখলাম যেন আপনার অন্ধ অনুসারীরা আপনাকে অনুসরণ করার আগে, আপনার কথাগুলো, আপনার চিন্তাগুলো মেনে নেয়ার আগে একটু চিন্তা করেন।

স্যার প্রথমেই বলে রাখি আমি কোন শিবির কর্মী না বা জামাতের কেউ না। তারপরেও আপনার "তোমরা যারা শিবির করো" লেখাটির উত্তর দিতে বসলাম কারণ আপনার এই লেখার কিছু কিছু বিষয় এতই নিচু মানের মূর্খের মতো মনে হয়েছে যে একজন রিক্সাওয়ালাও আপনার চেয়ে এই বিষয়গুলোতে ভালো বুঝে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আপনি ছাত্র শিবিরের ছেলেদের নিয়ে অনেক হতাশার কথা প্রকাশ করেছেন অনেকটা লোক দেখানো কপট ভালোবাসার মত। হয়তো অনেকেই আপনার এই কপট চরিত্রটি বুঝে উঠতে পারবেনা কারণ আপনি হচ্ছেন বাংলাদেশের অন্যতম একজন শ্রেষ্ঠ ধূর্ত অমানুষ (অমানুষ বললাম কারণ যে তার সৃষ্টিকর্তাকে চিনেনা আমি তাকে অমানুষই বলি)। ছাত্র শিবিরের ছেলেদের নিয়ে আপনার যে হতাশা তা কিন্তু এই জন্যে নয় যে তারা যুদ্ধাপরাধী জামাতের আনুগত্য মেনে নিয়েছে বরং তারা যে ইসলামকে পছন্দ করে বা ইসলামী অনুশাসন মেনে চলতে চায় এই জন্যেই আপনার এত হতাশা। কারণ আমি কোনদিন আপনাকে ছাত্রলীগ আর ছাত্রদলের ছেলেদের নিয়ে আক্ষেপ করতে দেখি নাই কারণ তারা সন্ত্রাসী করুক, চাঁদাবাজি করুক আর ধর্ষণের সেঞ্চুরি করুক বা আর যাই করুক না কেন অন্তত তারা মৌলবাদী না, তারা ইসলাম মানেনা। তারা ক্যাম্পাসে অস্ত্রের মহরা আর মেয়েদের ওড়না টেনে নিয়ে গেলেও আপনি তাদের নিয়ে অনেক আশাবাদী, আপনি তাদের নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেন কারণ তারা আর যাই করুক না কেন তারা অন্তত ইসলামের ধার ধারেনা, নৈতিকতার ধার ধারেনা।

আমি ভালো করেই জানি আপনার কাছে ছাত্র শিবির, তাবলীগ, এমনকি কোন দল না করা ইসলামপন্থী ছেলেমেয়েদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। ইসলামপন্থী সবাই আপনার কাছে মৌলবাদী, ধর্মান্ধ, সেকেলে এবং উগ্রবাদী। আপনার যত হতাশা সকল ইসলামপন্থী ছেলেমেয়েদের নিয়েই। আপনার এই চরিত্রটা এখন আর কোন সচেতন মানুষের অজানা নয়। আপনি নিজেকে খুব মুক্তমনা দাবী করেন করেন কিন্তু আপনি নিজেকে নিয়ে কখনো একবার ভেবে দেখেননি যে আপনি কত বড় সঙ্কীর্নমনা, কত বড় সেকেলে। আপনার মতো বুদ্ধিজীবিদের(?) উদ্দেশ্য করেই ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ সত্যই বলেছিলেনঃ-

“তোমাদের যত বড় বড় পিএইচডি ডিগ্রি আর সার্টিফিকেট থাকুক না কেন, যদি আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসুলের(সাঃ) সাথে সম্পর্ক না থাকে তাহলে তোমরা মূর্খ, গণ্ডমূর্খ"

আপনি আপনার লেখায় লিখেছেন যে ছেলেমেয়েরা যেন এই তরুণ বয়সে এইসব ধর্ম কর্ম বাদ দিয়ে মুক্তমনা হয়, অসাম্প্রদায়িক হয়, রবীন্দ্রসংগীত শোনে আরও কত কি? তবে সবচেয়ে ভয়াবহ যেটা বলছেন সেটা হল আপনি চান এই বয়সে তরুণ ও যুবক ছেলেরা মেয়েদের সাথে প্রেম করবে!! ঘুরে বেড়াবে!! আড্ডা দিবে এবং মাঝে মাঝে সইতে না পেরে লিটনের ফ্লাটে যাবে।

স্যার এবার আপনাকে কিছু কড়া কথা বলবো। স্যার আপনি যেমন মুক্তিযুদ্ধের সকল হত্যাকাণ্ডের জন্যে জামাত ও ছাত্রসংঘকে দায়ী করেন ঠিক এমনিভাবে মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী বাংলাদেশে যতগুলো ধর্ষণ হয়েছে, বয়ফ্রেন্ডের দ্বারা যতগুলো মেয়ের সেক্স ভিডিও বের হয়েছে, যতগুলো ছেলেমেয়ে প্রেমঘটিত বিষয়ে আত্মহত্যা করেছে, এসিড নিক্ষেপের শিকার হয়েছে তার সবগুলোর জন্যে দায়ী হচ্ছেন আপনি, আপনার মত পরগাছা বুদ্ধিজীবিরা আর আপনার এবং অশ্লীলতার প্রচারক প্রথম আলো গংরা। কারণ আপনি, আপনার মত কুবুদ্ধিজীবিরা এবং প্রথম আলো গংরা এইসব মতবাদ ও অশ্লীলতার ধারক, বাহক এবং প্রচারক।

স্যার আমার খুব জানতে মন চায় আপনার মেয়ে যদি কোন ছেলের সাথে প্রেম করে সেক্স করে তারপর ছেলেটি সেই সেক্স ভিডিও বাজারে ছেড়ে দেয় তখন আপনার প্রতিক্রিয়া কি হবে? আমি জানি আপনি বলবেন প্রেম করাটা, প্রেম করে সেক্স করাটা কোন অপরাধ নয় কিন্তু ভিডিও করাটা, তারপর প্রেম ভেঙ্গে গেলেই সেই ভিডিও বাজারজাত করাটা অন্যায়, প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা। এমনকি আপনি তখন আপনার মেয়ের সাফাই গাইতেও ভুলবেন না, বলবেন আপনার মেয়ে কোন ভুল করেনি, আপনার মেয়ে ছেলেটিকে বিশ্বাস করেছে, বিশ্বাস করে ভালোবেসে বিছানায় গিয়েছে। স্যার আপনাদের মত জাফর ইকবালদের কারণেই আজকের এই পৃথিবীতে এত অশান্তি, এত সন্ত্রাস, এত চাঁদাবাজি, এত নোংরামি। আপনাদের মতো জাফর ইকবালদের কারণেই এই পৃথিবীটা সুস্থ মানুষদের জন্যে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। আপনাদের মত জাফর ইকাবালদের কারণেই পৃথিবীটা অনৈতিকতায় ভরে গেছে, আপনাদের মত জাফর ইকবালদের কারণেই একজন মা তার মেয়েকে বাহিরে পাঠিয়ে শঙ্কিত থাকে কখন না জানি তার মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয় কারণ আপনাদের মত জাফর ইকবালরা ধর্ষণ মতবাদের প্রচারক, নৈতিকতাহীন মতবাদের প্রচারক। স্যার মনে করিয়েন না আপনাদের এইসব কর্মের জন্যে কোন হিসেব বা জবাবদিহিতা করতে হবে না। ক্ষমতা আর প্রতিপত্তি দিয়ে এই পৃথিবীর কাঠগড়া পাড়ি দিতে পারলেও আখিরাতের কাঠগড়া কখনোই পাড়ি দিতে পারবেন না যতদিন না বেঁচে থাকতে এইসব কাজের জন্যে তওবা করে পরম করুণাময়ের পথে ফিরে আসেন। স্যার শেষ করার আগে আপনার সাথে সুর মিলিয়ে আমিও কিছু কথা বলতে চাই-

“কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করে এই ছোট্ট জীবনে সবচেয়ে বিচিত্র, সবচেয়ে অবিশ্বাস কি দেখেছ আমি অবশ্যই বলবো জাফর ইকাবালদের দেখেছি, দেখেছি তাদের অনুসারীদের। তার কারণ, যে জীবনটি হচ্ছে একটা পরীক্ষা ক্ষেত্র, রবের ইবাদত করে কাটানোর সময় সেই সময়ে তারা কি করে সেই রবের অকৃতজ্ঞতায় কাটায়, ইসলাম বিরোধিতায় কাটায়। যে সময়টাতে তাদের হাতে থাকার কথা আল কোরআন, আল হাদিস, আল্লাহ্‌ রাসুলের জীবনী সেই সময়টাতে কি করে তারা রাসেল, আরজ আলী মাতাব্বর আর নৈতিকতাহীন প্রেমের উপন্যাস পড়ে কাটায়। আমি স্বপ্ন দেখি একদিন জাফর ইকবালদের হাতে, তাদের অনুসারীদের হাতে এইসব বইয়ের পরিবর্তে থাকবে আল কোরআন, আল হাদিস আর আল্লাহ্‌ রাসুলের জীবনী। আমার সেই স্বপ্ন যেন আল্লাহ্‌ তায়ালা বাস্তবে পরিণত করেন এই দোয়া রেখেই আমার এই লেখা শেষ করছি।” তবে শেষ করার আগে পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করতে চাই। আল্লাহ্‌ তায়ালা বলেনঃ-

“আর যার আমলনামা তার বাম হাতে দেয়া হবে সে বলবেঃ হায়! আমাকে যদি আমার আমলনামা আদৌ দেয়াই না হতো এবং আমার হিসেব যদি আমি আদৌ না জানতাম তাহলে কতই না ভালো হতো। হায়! আমার মৃত্যুই যদি আমার শেষ হতো! আজ আমার অর্থ সম্পদও কোন কাজে আসলো না। আমার সকল ক্ষমতা ও প্রতিপত্তিও বরবাদ হয়ে গেল।” [৬৯:২৫-২৯]

ঙ.

হ্যাঁ। জাফর। জাফর ইকবাল। আজ এই লেখার উদ্দেশ্য তাকে ধন্যবাদ জানানো। তাকে প্রাণঢালা শুভেচ্ছা জানানো। তাকে শুকরিয়া জানানো।

সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই জাফরের “তোমরা যারা শিবির কর” পড়লাম। শুরুতে খুব একটা গায়ে লাগলো না। জীবনের কোন সময়েই আমি জামাত শিবিরের আশপাশেও যাইনি বলেই হয়তো কোন অনুভূতি কাজ করেনি। কিন্তু যতই লেখাটির এক লাইন এক লাইন করে এগুচ্ছিলাম, আমার মনে হতে লাগলো কিছু একটা সমস্যা আছে এখানে। চোখ কচলে নিলাম। হ্যাঁ। ঠিকই তো। এই লেখায় তো শিবির একটা উপলক্ষ্য মাত্র! জাফর তো পিছু নিয়েছে ইসলামের!

ইসলাম তো জামাতের পিতার সম্পত্তি নয়। জামাত এবং ইসলাম তো এক বিষয় নয়। জামাতের ভুল থাকলে সেটা দেখিয়ে দেয়া দোষের কিছু নয়। কিন্তু জামাতের দোষ ধরতে গিয়ে ধান ভানতে শিবের গীত গাইলেন জাফর। তিনি ইসলামের কিছু প্রথাকে আক্রমণ করলেন তার কলম দিয়ে। কাজটা তিনি কিভাবে করলেন? খুবই সূক্ষ্ম চাতুর্যের মাধ্যমে। তিনি সেইফ শট খেললেন। নাম নিলেন শিবিরের। হাতুড়ি চালালেন ইসলামের ওপর। দেখে যেন মনে হবে এই কাজগুলো শিবিরের। কোন সাধারণ মুসলিমের নয়! একজন শিবির আল্লাহ্‌ কে রব মানে । একজন দলহীন মুসলিম ও আল্লাহ্‌ কে রব মানে । কেউ যদি এখন শিবির আল্লাহ্‌ কে রব মানে বলে আল্লাহ্‌ কে রব মানা অযৌক্তিক ও শিবিরের কাজ বলে দাবি করে, সেটা কি গ্রহণযোগ্য? জাফর ঠিক এমন খেলাই খেলেছেন। তিনি ইসলামের কিছু মৌলিক আমলকে শিবিরের কপিরাইট বলে চালিয়ে দিয়েছেন। ফলাফল যা হবার তাই। তার একান্ত অন্ধ অনুসারীগণ, যারা তার কথা আসমানী ওয়াহির মত মান্য করে, তারা তার বক্তব্যকে ডিফেন্ড করে শুরু করলো এবং জাফরের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ইসলামের সেইসব মৌলিক আমলকে শিবিরের নিজস্ব আবিষ্কৃত আমল বলে মেনে নিল। জাফর হয়ে গেলেন শতভাগ সফল।

কিন্তু না। ঘটনা যদি এখানেই শেষ হয়ে যেত, তাহলে আর কথা ছিলনা। জল অনেক দূর গড়িয়ে গেছে। জাফরের এই মিথ্যাচার, ভন্ডামি ও হিপোক্রিসির সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে অনলাইন সমাজ। মুহুর্মুহু পোস্ট পড়তে থাকে তার এই মুনাফিকি মানসিকতার। তেমনই এক সমালোচনাকারী হলেন তানভীর আহমাদ আরজেল ভাই। জাফরের হিপোক্রিট চেহারা উন্মোচন করে একটি লেখা তিনি তার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে শেয়ার করেন। শয়ে শয়ে শেয়ার পড়ে সেই লেখা। অনেক সাধারণ মুসলিমরাও জাফরের আসল রূপ নতুন করে চিনতে শুরু করে। তারা ভাবতে শুরু করে, যে না। জাফর ইকবাল কোন প্রভু নয়, যার সব কথাই হবে সঠিক।

ইসলাম যেদিন প্রকাশ্যে আত্মপ্রকাশ করে, সেদিন থেকেই শুরু হয় এর বিরোধীদের চক্রান্ত। চক্রান্ত শেষমেশ রূপ নেয় অত্যাচারে। রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুরু করে তার সাহাবীরা পর্যন্ত সকলেই এক আল্লাহ্‌য় বিশ্বাস ও হক এর পথে অটল থাকার কারণে মুখোমুখি হন কাফিরদের অমানুষিক অত্যাচারের। শরীরের চামড়া জ্বলা, আগুনের উপর চিৎ করে রেখে শরীরের চর্বি পুড়িয়ে গলিয়ে ফেলা থেকে শুরু করে দুর্বল অঙ্গে বর্শা বিঁধিয়ে হত্যা পর্যন্ত সকল ধরনের অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে ওঠে তাদের ইসলামি জীবন। সেই সাহাবাদের উত্তরসূরি আজকের মুসলিম সমাজও মুক্ত হতে পারেনি সেই অত্যাচারের হাত থেকে। যার সর্বশেষ টাটকা উদাহরণ তানভীর ভাই।

জাফরের মুখোশ উন্মোচন ও ইসলামের কথা লেখার কারণে ছাত্রলীগের কতিপয় সুসন্তান তাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে হাসপাতাল পাঠিয়ে দিয়েছে। তবে এই অত্যাচারের সাথে সাহাবাদের অত্যাচারের একটা পার্থক্য আছে। তখনকার অত্যাচার করতো কাফিরগণ। আর আজকের অত্যাচার করে আমাদের মুসলিম নামধারী ভাইরা। তারা বলেন কুরাআন হাদীস যার যার নিজের ব্যাপার। এর বাইরে কোন ইসলাম নাই। এর বাইরে ইসলাম আনার ফলাফল সোজা হাসপাতাল।

জাফর ইকবাল। আপনি স্বপ্ন দেখেছিলেন আজকের ছেলেরা মুক্তচিন্তা শিখবে, গান গাইবে, নাটক করবে, আদর্শ নিয়ে ভাবালুতায় ডুবে থাকবে। শিবির আপনার সেই আশায় গুড়েবালি দিয়ে সেই সময় তারা ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে নিজেদের আটকে রাখে, সাম্প্রদায়িক হতে শেখে, বলে আপনার বিস্তর অভিযোগ। অথচ কি অদ্ভুত ব্যাপার দেখুন, আপনার অনুসারীরা, আপনার লেখার ভক্তরা, তাদের মধ্যে কতিপয় প্রাণী আমার ভাইটাকে মুক্তচিন্তা করতে দিলোনা। তারা গান করলোনা, নাটক করলোনা, আদর্শের ধারেকাছেও গেলনা। এসে আমার ভাইকে ডান্ডা মেরে ঠান্ডা করার চেষ্টা করে গেলো। তারা কি খুব বিশাল গন্ডিতে নিজেদের মেলে ধরে? সাম্প্রদায়িকতা কি শুধু ধর্মভিত্তিক? কোন দলভিত্তিক কি হতে পারেনা? কোন আদর্শ ভিত্তিক কি হতে পারেনা? এই যেমন ধরুন সেকুলারিসম কিংবা অধুনা আবিষ্কৃত মুক্তমনা চর্চা? এই ছেলেগুলো তো আপনার আদর্শ বিরোধি লেখা লেখার কারণে প্রতিবাদ করতে গিয়ে আমার ভাইকে পেটালো। এটা কে কি সাম্প্রদায়িকতার সংজ্ঞাধীন করা যায়না? নাকি সাম্প্রদায়িকতাকে আভিধানিক গন্ডিতে বেঁধে রাখবেন? “আদিবাসী” শব্দ নিয়ে আপনার বিশ্লেষণ দেখে আমার অন্তত এটা বিশ্বাস আছে যে আপনি ডিকশনারীর অন্ধ অনুসারী নন।

আপনি বলেছেন মুসলিমরা [যদিও শিবির শব্দ দিয়ে এটাকে লুকিয়ে রেখেছিলেন] ছেলেমেয়ের সহজ ভালোলাগার অনুভূতিকে শ্রদ্ধা করেনা। এর জন্যে যে কতদূর তারা যেতে পারে, তা কাউকে বলতে পারবেন না আপনি। অথচ দেখুন, আমার যেই ভাইটি সহজ সরল সহজাত ধর্মীয় অনুভূতিতে আপনার আঘাতের কারণে আপনার লেখার প্রতিবাদ করলো, তখন আপনার স্বপ্নে দেখা আধুনিক ছেলেগুলো তার অনুভূতির শ্রদ্ধা না করে শ্রাদ্ধের ব্যবস্থা করে এলো। এই অশ্রদ্ধার জন্যে তারা কতটুকু যেতে পারে তা আমিও কাউকে বলতে পারবো না। আপনার মত আমিও শিউরে উঠি।

আপনি বলেছেন এই নতুন পৃথিবী হচ্ছে মুক্তচিন্তার পুরোপুরি অসাম্প্রদায়িক একটা পৃথিবী। এই নতুন পৃথিবীর মানুষেরা অসাধারণ, তারা একে অন্যের ধর্মকে সম্মান করতে শিখেছে, একে অন্যের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যকে উপভোগ করতে শিখেছে, একে অন্যের চিন্তাকে মূল্য দিতে শিখেছে।

দেখুন জনাব ইকবাল, দেখুন আপনার স্বপ্নের যুবসমাজ কতটা পেরেছে কারো ধর্মকে সম্মান করতে। কতটা কারো ইসলামি সংস্কৃতিকে আর ঐতিহ্যকে উপভোগ করতে পেরেছে। কতটা পেরেছে অন্যের চিন্তাকে মূল্য দিতে।

আপনার স্বপ্নের যুবসমাজকে একপাশে রাখুন। আপনি নিজেও কি পেরেছেন?

ধন্যবাদ আপনাকে জাফর ইকবাল। আপনি যদি সেদিন সেই লেখাটা না লিখতেন, দল মত নির্বিশেষে বাংলার মুসলিমরা এক হয়ে প্রতিবাদ করা হয়তো ধীরে ধীরে ভুলেই যেত। হোক তা ভার্চুয়াল। এক হতে লাগে কিছু সত্ত্বা আর একটা আইডিওলজি। শরীর নয়। আপনি যদি ওই লেখা না লিখতেন, বাংলার যুবসমাজ আপনার দ্বিমুখী নীতি সম্পর্কে ধারণা পেত না। জানতে পারতোনা আপনার মত ইসলাম বিরোধীদের জবাব দিলে ছাত্রলীগের মাইর খেতে হয়। বাংলার মুসলিমরা বুঝতে পারতোনা এই দেশে যারা ইসলাম পালন করতে চায় তারা কতটা অসহায়।

আপনার এই লেখায় হয়তো মুসলিম উম্মাহতে কোন বিপ্লব হবেনা। তবে আমি নিশ্চিৎ, বহু মুসলিম নতুন ভাবে আপনাকে নিয়ে ভাবতে শুরু করবে। ইসলামকে নিয়ে ভাবতে শুরু করবে। জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ কার বাপের সম্পত্তি, সেটাও নতুন করে ভাবতে শিখবে। এক সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে।

আপনাকে ধন্যবাদ জাফর ইকবাল। আল্লাহ্‌ আপনাকে হিদায়া দান করুন। পরিশেষে ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ এর একটা কথা মনে করি চলুন।

“তোমার যত বড় পিএইচডি ডিগ্রী থাকনা কেন, তোমার যদি আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাথে সম্পর্ক না থাকে, তবে তুমি মূর্খ। তুমি গন্ড মূর্খ।”

আল্লাহ্‌ সর্বজ্ঞানী।


[ক] [খ] [গ] [ঘ] [ঙ]