ক্যাম্পাসে একটা টং দোকানে আমি নিয়মিত চা খেতে যেতাম। দুধ চা খেলেও সাথে একটু আদা দিতে বলতাম। একসময় খেয়াল করলাম আমাকে আর আদা দিতে বলতে হয় না। দোকানদার নিজ থেকেই আদা দিয়ে দেয়। চায়ের বিল নেওয়ার সময়, বিল নিয়ে বাকি টাকা ফেরত দেওয়ার সময় বেশ বিনয়ের সাথে এক হাত বাড়িয়ে আরেক হাত কুনুইয়ের কাছে ধরে সে বিনয়ের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। হ্যাঁ, এই কাজটা সে আগে করতো না, এই কাজটা শুরু হয়েছে যখন থেকে আমি পাঞ্জাবী, টুপি, পাগড়ী পরে তাঁর দোকানে যাওয়া শুরু করলাম।

ব্যাপারটা ভালই লাগে। আপনার ইসলামী লেবাসের জন্য আরেকজন আপনাকে সম্মান করছে এর মধ্যে অনুপ্রাণিত হওয়ার ব্যাপার আছে। কিন্তু লেখার শুরুতে এই প্রসঙ্গটি আনার কারণ, এই সমাজ, এই রাষ্ট্র, আপনার আমার পরিবার ইসলামকে সহ্য করবে একটা পর্যায় পর্যন্ত। একটা সীমা পর্যন্ত তারা আপনার ইসলামকে খোলা মনে গ্রহণ করবে। কিন্তু যখনই আপনি পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, দুই ঈদ, শেষ বয়সে একবার হাজ্জ—এই ইসলামের সীমানা ডিঙিয়ে রাসূল (সাঃ)-এর তাওহীদ আর কালিমার পরিপূর্ণ ইসলামের কথা বলবেন তখনই আপনি উপলব্ধি করতে পারবেন There is something wrong with the people around you. যে দোকানদার হুজুরকে এত সম্মান করছে তাকে নামাযে ডাকলে, নামাযের সময় দোকান বন্ধ রাখতে বললে, বিড়ি সিগারেট বেচা হারাম বললে একসময় সে আপনাকে আর আগের মত দেখবে না। হুজুরের অনধিকার চর্চায় তখন সে হবে চূড়ান্তভাবে বিরক্ত—পরীক্ষিত সত্য।


১৪০০ বছর আগে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই উম্মাতের জন্য রহমত স্বরুপ পাঠিয়েছিলেন একজন মহামানবকে। সারা মক্কাবাসী তাকে এক নামে চিনত। আল আমিন হিসেবে তাঁর ছিল সুখ্যাতি। তাঁকে সবাই ভালোবাসতো, তাঁর কাছে আমানত রাখাকে নিরাপদ মনে করত, তাঁর প্রতি ছিল সকলের অগাধ বিশ্বাস। এই মানুষটিই যখন মহান আল্লাহর একত্ববাদ আর তাওহীদের সত্য প্রচার করা শুরু করেন—তখন আমরা দেখেছি তাঁর সাথে কেমন আচরন করা হয়েছিল। এতদিন যারা তাঁকে এক বাক্যে বিশ্বাস করত তারাই তাঁকে পরিত্যাগ করল। মক্কার গোত্রীয় নেতাদের ডেকে তাওহীদের বাণী শুনিয়ে রাসূল (সাঃ) যখন জিজ্ঞেস করলেন, "কে কে আছ আমার সাথে?"—আট বছরের এক বালক ছাড়া সেদিন কেউ তাঁর পাশে দাড়ায়নি। একসময় সকলের কাছে প্রিয় পাত্র রাসূল (সাঃ) এর উপরই তারা চালাল অত্যাচার, তাঁকে করল বিতাড়িত, তাঁর সাথে করল যুদ্ধ। এটাই সত্য—এটাই ইসলামের পথে চলার পূর্বশর্ত যে আপনাকে স্রোতের বিপরীতে দাড়াতে হবে—হতে হবে অত্যাচারিত। সেক্রিফাইস করতে হবে জীবনের প্রিয় সব বস্তু। হ্যাঁ, এটাই ইসলাম—এটাই তাওহীদ।


দুনিয়াবি ক্যারিয়ার গড়তে জান প্রাণ বিলিয়ে দিয়ে, দিনে কয়েক ওয়াক্ত সালাত পড়ে, সামাজিক ছবি(!) দেখে আর জীবনবোধের গান(!) শুনে, চেতনার আঁধার অন্তরে লালন করে, টেবিলভর্তি সেক্যুলার বইয়ের উপর কাপড়ে বাঁধা কুরআনে সাজানো রুম—এই ছেলেটারই সমাজ থেকে মিলবে 'গুড বয় ইমেজ'। আখিরাতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে দুনিয়ার অর্জনগুলোতে ছাড় দেওয়া ছেলেটার শুনতে হবে—অমুক তো তোর মতই নামাজ রোজা করে, সে কি সব করছে না! কি করে বুঝাই, ঐ জীবন ফড়িঙের, ঐ জীবন জোনাকি পোকার। কি করে বুঝাই এই জীবনে পৃথিবীর ঐ পারে কিছুই নেই। কি করে বুঝাই—আমি ঐ জীবন চাইনা।


মুসআব ইবনু উমায়ের ছিলেন মক্কার ধনী পরিবারের আদরের সন্তান। চাকচিক্য আর আভিজাত্যে তাঁর মত খুব অল্প ছেলেই ছিল। রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে মানুষজন মুগ্ধতার চোখে তাকাত। সেই মুসআব ইবনু উমায়ের (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করে হয়ে গেলেন বিপরীত মেরুর মানুষ। তাওহীদকে গ্রহণ করায় তাঁর উপরও এসেছিল অত্যাচারের খড়গ। আদরের ছেলেকে তাঁর মা মারধর করত, বন্দি করে রাখা হত ঘরে। তিনি যখন হিজরত করতে চাইলেন আর তাঁর মা তাতে বাঁধা দিলেন এবং ছেলেকে বন্দি করে রাখতে চাইলেন তখন এক বুক আবেগ নিয়ে তিনি তাঁর মাকে বলেছিলেন, "যদি তুমি এমনটি কর এবং যারা তোমার এই কাজে সাহায্য করবে তোমাদের সবাইকে আমি হত্যা করব।"


মদীনায় একদিন মুসলমানদের একটি দল রাসূল (সাঃ) এর পাশে বসে ছিলেন। এমন সময় পাশ দিয়ে তারা মুসআবকে যেতে দেখলেন। তাকে দেখে উপস্থিত সবার ভাবান্তর হল, কারো দৃষ্টি নত হয়ে গেল, কারো কারো চোখে পানি এসে গেল। কারণ মুসআবের গায়ে তখন শত তালি দেওয়া জীর্ণ শীর্ণ একটি চামড়ার টুকরো। তাতে দারিদ্রের ছাপ সুস্পষ্ট। অথচ ইসলাম পূর্ব জীবনে তাঁর পরিচ্ছদ ছিল বাগিচার ফুলের মত কোমল চিত্তাকর্ষক ও সুগন্ধিময়। এ দৃশ্য দেখে মুচকি হেসে রাসূল (সাঃ) বলেছিলেন , "মক্কায় আমি এই মুসাবকে দেখেছি। তাঁর চেয়ে পিতামাতার অধিক আদরের কোন ছেলে মক্কায় ছিল না। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের মুহাব্বাতে সবকিছু সে ত্যাগ করেছে।" উহুদের যুদ্ধে শহীদ হওয়ার পর কবরস্ত করতে গিয়ে এই মুসআবের জন্য ছোট্ট এক টুকরো কাপড় পাওয়া গিয়েছিল যা দিয়ে মাথা ঢাকলে পা দেখা যায়, পা ঢাকলে মাথা বেরিয়ে পড়ে। রাসূল (সাঃ) মুসআবের লাশের পাশে দাড়িয়ে পাঠ করলেন, " ...মুমিনদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে যারা আল্লাহর সাথে তাঁদের অঙ্গীকার সত্যে পরিণত করেছে।"


সর্বপ্রথম মুহাজির ছিলেন আবু সালামা (রাঃ)। তিনি যখন তাঁর স্ত্রী পুত্র নিয়ে হিজরত করতে চাইলেন তখন তাঁর শ্বশুর বাড়ীর লোকজন তাঁর স্ত্রীকে যেতে দিলনা। তাঁর বাচ্চা নিয়ে তাঁর পরিবার আর শ্বশুর বাড়ীর লোকজন টানাটানি শুরু করে দিল যাতে তাঁর বাচ্চার একটি হাত উৎপাটিত হয়ে যায়। স্ত্রী সন্তানকে ফেলে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে হিজরত করেছিলেন আবু সালামা। এ ঘটনার পর থেকে স্বামীর মদীনার উদ্দেশ্যে যাত্রা এবং সন্তান থেকে বঞ্চিত হওয়ার পর উম্মে সালামার অবস্থা ছিল—প্রতিদিন ভোরে তিনি আবতাহে চলে যেতেন, যেখানে স্বামী সন্তান থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন হয়েছিলেন, আর সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি সেখানে কাঁদতে থাকতেন। এভাবে আত্মীয় পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা, কাফেরদের অত্যাচার মুখ বুঝে সহ্য করে তারা তাওহীদের ঝাণ্ডা বহন করেছিলেন।


মাঝে মাঝে কিছু আলেমের বই দেখি, লেখক শায়খের নামের পাশে লেখা "May Allah hasten his release" "May Allah save him" । পরিবার পরিজন, দুনিয়ার সুখ শান্তির মোহ ছেড়ে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য আজও কিছু মানুষ তাওহীদের ঝাণ্ডা বহন করে চলেছে। সত্য আর হক্বের বার্তা প্রচারের অপরাধে তাদেরকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে তাগুতের কারাগারে। তারা হয়ত দুনিয়ার মানুষের কাছে কোন পরিচিত বা মুখে মুখে উচ্চারিত কোন নাম নয়, তাঁদের বিশাল অডিটোরিয়ামে বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ হয়না, তারা হয়ত কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে অবরুদ্ধ। কিন্তু তারা ঘাস ফড়িঙের জীবন বেছে নেয়নি—বেছে নেয়নি জোনাকি পোকার জীবন। বেছে নিয়েছে সিনা টান করে দাঁড়ানোর জীবনকে। বেছে নিয়েছে সেই সময়টাকে—যখন আমরা সবাই আমাদের রবের সাথে মিলিত হব একাকি—সম্পূর্ণ একাকি।


ছোটবেলায় আমরা একটা খেলা খেলতাম। ঘাস ফড়িঙ ধরে তাঁর লেজে একটা সুতো বেঁধে দিতাম। তারপর তাকে নিজেদের ইচ্ছেমত উড়াতাম। যখন সে উড়ে কিছুদূর যেত সুতো ধরে টান দিতাম, সে আবার মাটিতে পড়ে যেত। আবার উড়ত আবার টান দিতাম। এভাবে বিশাল আকাশে ছুটে বেড়ানো ঘাস ফড়িঙ আমাদের ইচ্ছের কাছে বন্দি হয়ে যেত। আরেকটা মজার কাজ করতাম রাতের বেলা। জোনাকি পোকা ধরে এনে হাতের মুঠোতে রাখতাম। তারপর সেই পোকা নিয়ে অন্ধকারে যেতাম আর বলতাম, 'দেখ দেখ আমার হাতে আলো জ্বলছে।' অথচ আলোটা আমার ছিলনা, ছিল হতভাগা জোনাকি পোকার—যে আমার হাতে বন্দি। যার আলো শুধু রাতেই থাকে, দিনের আলোতে যাকে খুজে পাওয়া যায়না—দিনের আলোতে যাকে কেউ মনেও রাখেনা। 

এই দ্বীন ইসলাম, এই তাওহীদ, এই ঈমান হঠাৎ করে একদিনে গড়ে উঠেনা। মন থেকে চাইতে হয়, চেষ্টা করতে হয়। স্রোতের বিপরীতে দাড়াতে হয়। পিতামাতার চোখ রাঙ্গানিকে তুচ্ছ জ্ঞান করে দাড়ি ছেড়ে দিতে হয়। জাহিল বন্ধুদের বহু আকাঙ্ক্ষিত সঙ্গ ছেড়ে সমাজে গুরাবা হতে হয়, অপমানিত হতে হয়। অনেক না পাওয়ার বেদনায় দগ্ধ হওয়া, অনেক দীর্ঘশ্বাস চেপে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু তা না করে দুনিয়ার কিছু সস্তা প্রাপ্তির জন্য তাওহীদের বাণীকে মাড়িয়ে যাওয়া, কাফেরদের কাছে দ্বীন বিকিয়ে দেওয়া এ জীবন ঐ ফড়িঙের মতো, ঐ জোনাকি পোকার মতো। এই দ্বীন পালন যেন উত্তপ্ত মরুভূমিতে একাকি পথ চলা, তৃষ্ণায় কাতর হয়ে ছুটে চলা, থমকে যাওয়া, মাটিতে গড়িয়ে পড়া, শীতল পানিতে তৃষ্ণা মিটানো, কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেওয়া গাছের ছায়ায়। উস্কোখুস্কো চুল, ধুলোমাখা পা, জরাজীর্ণ জামা—অবশেষে এই দৌড় প্রতিযোগিতার শেষ প্রান্তে পৌছা। যার পরের কদম থেকেই আল্লাহ আযযা ওয়া যাল আমাদের দিয়েছেন অনন্ত সুখের প্রতিশ্রুতি।

"তাদের পালনকর্তার কাছে রয়েছে তাদের প্রতিদান চিরকাল বসবাসের জান্নাত, যার তলদেশে নির্ঝরিণী প্রবাহিত। তারা সেখানে থাকবে অনন্তকাল। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। এটা তার জন্যে, যে তার পালনকর্তাকে ভয় কর।" [সূরাহ আল বাইয়্যিনাহ : আয়াত ৮]

আমি মনে প্রাণে চাই আল্লাহ আমাদের সেই জীবনের স্বপ্ন অন্তরে বুনে দিন যে জীবন আল্লাহর জন্য বাঁচে। যে জীবন ঘাস ফড়িঙ কিংবা জোনাকি পোকার মত বন্দি নয়। যে জীবন অনেকের ভিড়ে পরাজিত, অধঃপতিত মানসিকতার নয়। যে জীবন এক বিঘত বুকে বিশাল আকাশ ধারণ করে বাঁচে। যেদিন বুক এফোঁড় ওফোঁড় করে বেরিয়ে যাবে শত্রুর আঘাত, মাটিতে গড়িয়ে পড়বে প্রথম রক্তবিন্দু, আল্লাহ সুবাহানু ওয়া তায়ালা দেখিয়ে দেবেন জান্নাতে আমাদের ঘর, সেদিন—সেদিন হয়ত আকাশের ওপারের ঐ জীবনের জন্য কিছু সঞ্চয় হলো। আল্লাহ আমাদের কবুল করুন। আমাদের অক্ষমতা আর অবহেলাকে ক্ষমা করুন। আমাদের সময়ে বরকত দিন। তাঁর দ্বীনের সাথে আমাদের অন্তরটাকে বেঁধে নিন। আমীন।