শুভ জন্মদিন!

কথাটা শুনে একটা মৃদু ভালো লাগায় মন ভরে যায়না এমন মানুষের সংখ্যা নগণ্য। মানুষ যেদিন জন্ম নেয় সেদিনটাকে একান্তই তার নিজের ভাবে, এ তারিখটার সাথে আলাদা একটা টান সে অনুভব করে। এদিন সে এই সুন্দর পৃথিবীতে এসেছিল। সেদিন সবাই তাকে মনে করে অভিবাদন জানায়, উপহার দেয়। আরো অনেক মানুষের মনের মধ্যে আমার একটা স্থান আছে - এই বোধ মানুষকে যত সুখী করে, অন্য কোন কিছুই তাকে এতটা পরিতৃপ্ত করেনা। জন্মদিনের আবেদনটা তাই স্বাভাবিকভাবেই অনেক পরিব্যপ্ত।

আমাদের অন্যান্য সামাজিক আচরণগুলোর মতই জন্মদিনের উদযাপনের রীতিটা নিয়ে কী আমরা ভেবে দেখেছি? বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনের শেষদিকে যখন আমি স্রোতে গা ভাসিয়ে দেবার বদলে চিন্তাশীল হতে চাইলাম তখন দেখলাম ‘শুভ জন্মদিন’ কথাটা একটা নেহায়েত নাটুকেপনা। প্রিয় বন্ধুরা রাত বারোটা অবধি জেগে প্রথম প্রহরেই ভালোবাসায় সিক্ত করে দিয়ে বলতো ‘হ্যাপি বার্থডে’। কিন্তু এর মানে কী? তারা কি চায় শুধু দোসরা জুন দিনটা আমার ভালো যাবে, বাকি বছর নয়? আর যে আমাকে সন্ধ্যায় এই শুভেচ্ছাটা জানালো তাতো আরো অর্থহীন - আমার দিনটা তো পারই হয়ে গেছে! তাই আমি আমার ছাত্রদের ‘শুভ জন্মদিন’ এর বদলে বলতে শেখালাম ‘শুভ নববর্ষ’, অর্থাৎ আমি আমার জীবনের যে নতুন বছরটা শুরু করতে যাচ্ছি তা যেন মঙ্গলময় হয় এই শুভকামনা করা।

কালের পরিক্রমায় আবিষ্কার করলাম, শুভ-অশুভ’র এই রীতির প্রচলন হয়েছে কুসংষ্কারাচ্ছন্ন তান্ত্রিকদের মাধ্যমে যারা বিশ্বাস করে কোন মানুষের জন্মদিনে তার উপর যে কোন মন্ত্র সবচে ভালো ফল দেয়। এদিন কেউ যদি মঙ্গল কামনা করে তবে ভালো আত্মারা সহায় হয়। তাই এদিন শত্রু এড়িয়ে চলতে হয়, বন্ধু-শুভাকাঙ্খীদের সাথে থাকতে হয়। গ্রীক এবং ভারতীয় উভয় দর্শনেই দেব-দেবতার কমতি নেই যাদের জন্মের নানা কাহিনী পাওয়া যায়। এখন মানুষ তার নিজের জন্মবারের সাথে যে দেবতার জন্মদিন মিলে যেত তাকে উপহার ডালা সাজিয়ে পুজো দিয়ে আসতো। সেই থেকে আমরা পেয়েছি ‘বার্থডে গিফট আর ট্রিট’ কালচার। মন্ত্রপূত মোমবাতি জ্বালিয়ে মূর্তির সামনে প্রার্থনা করত মানুষ। আজও শিক্ষিত মানুষকে দরগা-মাজারের সামনে থেকে মোমবাতি কিনতে দেখা যায়। আজও ছোট্ট শিশুটিকে বিশ্বাস করানো হয় এক ফুঁয়ে সব শিখা নেভাতে পারলে মনের ইচ্ছা পূরণ হবে। কে করবে এই ইচ্ছা পূরণ? কবরে শোয়া মৃত মানুষ? পাথরের প্রতিমা? আধুনিক সেকুলার শিক্ষার সার্টিফিকেটধারী মানুষের কাছে আল্লাহ ছাড়া সবার দাম আছে। আসলে আল্লাহর কাছে চাইতে হলে যে তার বিধিনিষেধ মানা লাগে। বাকি সব কে তো দশটাকার মোমবাতি দিয়েই খুশি করে ফেলা যায়। কি বিচিত্র মানুষের আত্মপ্রতারণা!

Ralph and Adelin Linton এর লেখা The Lore of Birthdays (New York, 1952) বইটি পড়লে প্রকৃতি ও মূর্তিপূজারীদের মাধ্যমে কিভাবে জন্মদিনের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ হল সে ধারণা পাওয়া যাবে।

আমাদের বর্তমান সামাজিক সংষ্কৃতিটা আর সামাজিক নেই বরং নিতান্তই ব্যক্তি কেন্দ্রিক। সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে মোরা পরের তরে - এই আবহমান প্রাচ্য দর্শনটা এখন আর আমাদের যান্ত্রিক জীবনে নেই। এখন আমরা দ্বীপ-সদৃশ মানুষ। সমাজ নামের সাগরে আমরা এখন সবাই আলাদা আলাদা দ্বীপ, নিজেদের মত বাঁচি, নিজেদের মত চলি। কেবল মরার পর দু’টো পা অকেজো হয়ে যায় দেখে অন্য কিছু মানুষের ঘাড়ে উঠে কবর পর্যন্ত যেতে হয়। অথচ একটা সমাজের কখনো সমুদ্র হবার কথা ছিলনা, হওয়া উচিত ছিল একটা মহাদেশ। প্রত্যেকটা মানুষ তার চারপাশের মানুষদের সাথে, পরিচিত মুখগুলোর সাথে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখবে, ভালোমন্দের খবরাখবর নেবে এটাই ছিল কাম্য। একজন আরেকজনের সুখের গল্প শুনে আনন্দে ভাসবে, দুঃখের সময় রুমালটা বাড়িয়ে দেবে, বিপদের সময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে থাকবে এটাই ছিল ইসলামের শিক্ষা। মানুষ সামাজিক জীব একথাটা শুধু অর্থনীতির পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবার কথা ছিলনা, মানুষের প্রায়োগিক জীবনে বাস্তবায়িত হবার কথা ছিল।

যান্ত্রিক এই জীবন ব্যবস্থায় জন্মদিন হয়ে উঠেছে সুস্থ সামাজিকতার বিকল্প। আগে তো তাও মানুষ কষ্ট করে ডাইরীতে প্রিয়জনদের জন্মতারিখ লিখে রাখতো, এখন ফেসবুকের কল্যাণে সে চলও উঠে গেছে। একদা খুব কাছের মানুষদের এখন বছরের একটি দিন একটি বার্তা পাঠিয়ে দিলেই সব সম্পর্কের দেনা চুকে যায়। আমাকে আজ যারা মনে করেছেন তাদেরকে আমি খাটো করছিনা, তারা যে আমার ওয়াল অবধি এসে কিছু লিখে গেছেন তাতে আমি আমার প্রতি ভালোবাসা ছাড়া অন্য কিছুই দেখিনা। কিন্তু আমার আপত্তিটা এখানে যে ভালোবাসার এই বহি:প্রকাশটা ইসলাম সম্মত নয়।

ইসলামের দৃষ্টিতে ‘ঈদ’ বলা হয় এমন কিছুকে যা বার্ষিকভাবে উদযাপন করা হয়। ঈদের ধারণাটা কঠোরভাবে সামাজিক, সমাজের সবার সাথে মিলে ঈদ পালন করতে হয়। ঈদুল ফিতরে ফিতরা হিসেবে খাদ্য দিতে হয়, যাতে সবার ঘরেই কিছু না কিছু খাবার থাকে। ঈদুল আযহার কুরবানীর অংশ গরীব-দুখীকে বন্টন করে দিতে হয়। ব্যক্তিগত কোন উদযাপন একজন মুসলিম করেনা, সবাইকে ফেলে রেখে সে একা একা ভালো খাবে-থাকবে এটা ইসলামের শিক্ষা নয়। একারণে আমরা সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ মুহাম্মদ (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বা তার কোন সাহাবাদের ঘটা করে জন্মদিন পালন করতে দেখিনা। অথচ তারাই আমাদের উত্তম আদর্শ। সামাজিক কল্যাণকে বিনষ্ট করে এমন ব্যক্তিকেন্দ্রিকতাকে ইসলাম একেবারেই অনুমোদন করেনা। তাই শুধু জন্মদিন নয়, বিবাহবার্ষিকী বা মৃত্যুবার্ষিকী কোন কিছুই পালন করা ইসলামসম্মত নয় - সেটা আমার হোক, বঙ্গবন্ধুর হোক কিংবা জিয়াউর রহমানের হোক।

যারা আমি সবকিছুতে ইসলাম টেনে জীবনের মজা মাটি করি এই মর্মে আমার উপর বিরক্ত, তাদের জন্য বলি - আল্লাহ যে আমাকে তার ইবাদাতের জন্য সৃষ্টি করেছেন এটা আমি মনে প্রাণে মেনে নিয়েছি। যখনি আমি আল্লাহ ছেড়ে অন্য কারো ভালো-মন্দকে মূল্যায়ন করা শুরু করবো তখন আল্লাহর দাসত্ব ছেড়ে আমি শয়তানের দাসত্ব করবো, আমার প্রবৃত্তির, প্রচলিত মেকী সামাজিকতার, পাশ্চাত্য সভ্যতার, পাথরের পুতুলের। যে আল্লাহ আমাকে সৃষ্টি করলেন, তার দাসত্ব ছেড়ে এত প্রভুকে মনিব মানতে আমার ভালো লাগেনা। আল্লাহ সুবহানা তা’আলা সুরা আল আহকাফে আমাকে প্রশ্ন করেছেন -

“তোমরা আমাকে বল তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাকো, আমাকে দেখাও তো তারা যমীনে কী সৃষ্টি করেছে? অথবা আসমানসমূহে তাদের কোন অংশীদারিত্ব আছে কি?”

তারপর তিনিই জবাব দিয়েছেন -

তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে, যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কাউকে ডাকে, যে কিয়ামত দিবস পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দেবেনা? আর তারা তাদের আহ্বান সম্পর্কে উদাসীন। আর যখন মানুষকে একত্র করা হবে, তখন এ উপাস্যগুলো তাদের শত্রু হবে এবং তারা তাদের ইবাদত অস্বীকার করবে।

জন্মদিন সংক্রান্ত দু’টি জরুরী ফতোয়া -

http://islamqa.com/en/ref/1027
http://islamqa.com/en/ref/26804

আল্লাহ আমাদের হৃদয় খুলে দিন, আর ইসলামকে নিছক সামাজিকতার বাতাবরণ থেকে বের করে ইসলাম মানার মাধ্যমে কল্যাণধর্মী সামাজিকতার দিকে এগিয়ে যাবার ক্ষমতা দিন। আমিন।