কয়েকজন লোক গেল একটা গুহার কাছে। গুহা দেখে সাথে সাথেই একজন বলে ফেলল এখানে সাপ আছে। এটা ফিতরাত, ফিতরাত দিয়েই সে বুঝে ফেলেছে সাপের উপস্থিতি। আরেকজন একটু আশে পাশে দেখল, সে অনেক sign পেল, সেসব sign দেখে সেও মত দিল গুহার ভেতর সাপ আছে। আরেকজন ফিতরাত দিয়েও বুঝল না, sign দেখেও বুঝল না তাই সে গুহার ভেতর যেতে চাইল। ঢুকেই সে দৌড় দিয়ে পালিয়ে এল, নিজ চোখে দেখে সে বুঝল আসলেই ভেতরে সাপ আছে। শেষের জন হতভাগা। সে ফিতরাত দিয়েও বুঝল না, sign দেখেও বুঝল না, ভেতরে ঢুকে নিজের চোখে দেখেও বুঝতে চাইল না, ভাবলো এ বোধহয় সাপ নয়, হয়ত অন্য কিছু, হয়ত… শেষ পর্যন্ত সে সাপের কামড় খেয়ে তবেই বুঝল আসলেই এটা সাপ ছিল! কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে, আর কিছুই করার নেই।

ইসলামের ব্যাপারগুলো অনেকেই ফিতারাত দিয়ে বুঝে ফেলে। যেমন আবু বকর (রাঃ)। আবু বকরের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, সব ঘোড়াই কোন না কোন এক সময় স্লিপ করে, সেটা যত ভালো নিখুঁতই হোক না কেন। কিন্তু আবু বকর কখনো স্লিপ করেনি। অর্থাৎ আবু বকর দ্বীনের ব্যাপারে কখনোই কনফিউজড হয়নি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, “যার কাছেই আমি দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছি সবাই একটু না একটু দ্বিধায় পড়েছে কিন্তু আবু বকর কোন দ্বিধায় পড়েনি”। জাহিলিয়াতের যুগেও আবু বকর মদকে জায়েজ মনে করতেন না, তিনি কোনদিন মুর্তি পূজাও করেননি। আবু বকরের ফিতরাতই ছিল হক্বের উপর। যখনই তার কাছে দ্বীনের কথা বলা হয়েছে সে সাথে সাথেই বলেছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। এরকম আরো ছিলেন আবু যর গিফারি (রাঃ)। উনার কাছে যখন এক আল্লাহর ইবাদাতের দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল তিনি বলেছিলেন, আমি তো দুই বছর ধরে এক আল্লাহর ইবাদাত করছি। যখন ইসলাম আত্মপ্রকাশ করেনি তখনো আবু যর ফিতরাহ দিয়ে বুঝেছিলেন আল্লাহ এক এবং কেবল তারই ইবাদাত করতে হবে। যদিও তখনো নামাজের হুকুম ছিল না কিন্তু তিনি নিজের মত এক আল্লাহর ইবাদাত করতেন। সুবহানআল্লাহ।

ইসলামের ব্যাপারে বাকিরা মূলত sign দেখে বুঝে গিয়েছিল ইসলামই সত্য এবং মুহাম্মাদ (সঃ) সত্যিই আল্লাহর রাসূল। আবার অনেকেই ইন্টেলেকচুয়ালিটি আর যুক্তি তর্কের উপর ভিত্তি করে বুঝেছিল ইসলামই সত্য। যেমন আমর ইবনুল আস (রাঃ)। খন্দকের পর থেকে মূলত উনার ভেতর ভাবান্তর তৈরী হচ্ছিল। তিনি চিন্তা করতে লাগলেন গভীরভাবে। আমর ইবনুল আস ইসলামের দিকে ঝুঁকছেন বুঝে কুরাইশ নেতারা তার কাছে লোক পাঠালো। আমর ইবনুল আস সেই লোককে জিজ্ঞেস করলেন, “ বলতো সত্যের উপর আমরা, না পারসিক ও রোমানরা?” সে বলল, “আমরা”। আমর ইবনুল আস বললেন, “ এ জীবনের পর যদি আর কোন জীবন না থাকে তাহলে আমাদের এই হক্বের উপর থাকা কি কাজে আসবে? এ দুনিয়াতেই আমরা মিথ্যাশ্রয়ীদের তুলনায় দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় আছি আর পরকালেও আমাদের পুরষ্কার লাভের কোন সম্ভাবনা নেই। একারণে মুহাম্মদের (সঃ) শিক্ষা_ ‘মরণের পর আর একটি জগত হবে, সেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি তার কর্মের ফল লাভ করবে’_ এটা অত্যন্ত সঠিক ও গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়”। এরকম ছিলেন খালিদ বিন ওয়ালিদও (রাঃ)। এবং আমর ইবনুল আস আর খিলদ বিন ওয়ালিদ একসাথেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

আবার অনেকেই ছিলেন যারা ইসলামের বিজয় দেখে, আল্লাহর প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখে, ইসলামের শাসন দেখে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আর এর মাঝেও দুর্ভাগারা ছিলেন যাদের কোনকিছুতেই হয়নি। যেমন আবু তালিব। রাসূলের প্রতি উনার ভালোবাসার কোন কমতি ছিল না। তিনি ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেননি, ইসলামের বিরোধিতা করেননি। কিন্তু তারপরও আবু তালিব ঈমান আনতে পারেনি।

এখানেই শেষ নয়। আল্লাহ এরপর উম্মাহকে বারবার ফিল্টার পেপারে ছেকে নিয়েছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর কথা শোনে অনেক মুসলিম দ্বীন ছেড়ে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল, মিরাজের ঘটনা শুনে অনেকে মুর্তাদ হয়ে গিয়েছিল, মুসায়লামা কাজ্জাবের মত অনেকে ভন্ড নবী দাবি করা শুরু করেছে, অসংখ্য মুসলিম এসব ভন্ড নবীদের দলে ভিড়েছে, অনেকে যাকাত দিতে অস্বীকার করে দ্বীন থেকে বেরিয়ে গেছে। সেই ফিল্টারে ছাঁকন পদ্ধতি কখনো বন্ধ হয়নি তা এখনো চলছে এবং চলবে। মানুষকে একেক সময় আল্লাহ একেক ফিতনায় ফেলেন আর তার দলের মানুষদের ছেকে নেন। ফিতনায় পড়ে প্রথম পর্যায়ে মানুষের ফিতরাত নষ্ট হয়ে যায়, এরপরের ধাপে সে দ্বীনের অজস্র নিদর্শনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখায়, একসময় নিজের চোখে দেখেও না দেখার ভান করে।

আল্লাহর এই ফিতনায় ফেলে ফিল্টার পেপারে ছেকে নেওয়ার পদ্ধতিতে অসংখ্য সিনসেয়ার, ঈমানি জজবার মানুষ ধরা খেয়েছে। অতীতেও, বর্তমানেও আর ভবিষ্যতেও ধরা খাবে।

অধঃপতন, রিদ্দা, ইরজা, খুরুজ দ্বীনের এই ব্যাপারগুলো কখনোই একদিনে হঠাৎ করে হয়ে যায় না। এগুলো ক্রমান্বয়ে ঘটে। প্রথমে ফিতরাত নষ্ট হয়, এরপর দ্বীনের নিদর্শনগুলোকে পাশ কাটিয়ে যায়, একসময় তারা দেখেও দেখে না। এরপর আল্লাহ কি করেন? আল্লাহ তাদের অন্তরের বক্রতা আরো বাড়িয়ে দেন। অনেকটা কাপড়ে কলমের কালি লাগার মত। পানি দিয়ে ধুতে গেলে আরো বেড়ে যায়, আরো বেড়ে যায়।

“তাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তাদের ব্যাধি বৃদ্ধি করেছেন আর তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি, কারণ তারা মিথ্যাবাদী” [সূরা বাকারাঃ ১০]

“তাদের উপমাঃ যেমন এক ব্যক্তি অগ্নি প্রজ্বলিত করল; যখন তা তার চতুর্দিক আলোকিত করল আল্লাহ তখন তাদের জ্যোতি অপসারণ করলেন এবং তাদেরকে ঘোর অন্ধকারে ফেলে দিলেন, তারা আর কিছুই দেখতে পায় না” [সূরা বাকারাঃ ১৪]

সুতরাং হেদায়াত এমন কোন বিষয় নয় যে নিলামে বসে কিছু বছরের জন্য কিনে নিলে! হেদায়াতের উপর টিকে থাকাকে তোমার পিতার রেখে যাওয়া সম্পত্তি মনে করো না যে, পিতা মারা গেলেও আইন অনুযায়ী তুমি তার মালিক হয়ে যাবে। আল্লাহ কুরআনের এক জায়গায় ক্ষমার কথা বলতে গিয়ে বলেছেন “grab it” অর্থাৎ একে আঁকড়ে ধরো, এটা এমন কোন বস্তু নয় যে তোমাকে প্লেটে করে সাজিয়ে সামনে দেওয়া হবে, grab it, এটা যেকোন সময় পিছলে যেতে পারে। হেদায়াতও এমন বিষয়। এটা চিরকাল তোমার থাকবে এমন কোন কথা নেই। এটা ধৈর্য আর তাকওয়ার জিনিস। এখানে দাঁতে দাঁত চেপে আল্লাহর সিদ্ধান্তের উপর শক্ত হয়ে জমে থাকা চাই। এখানে এমন সময় আসবে কোন কিছু তোমার পক্ষে থাকবে না, কেউ তোমার পাশে এসে দাঁড়াবে না, কেউ তোমাকে রক্ষা করবে না। তুমি অবিচল থেকো। বিনিময়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার জন্য রয়েছে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি।