কারা জান্নাতি কুমারীদের ভালোবাসে - ১ম খণ্ড
লেখকঃ ড. আব্দুল্লাহ আযযাম (রাহ)
অনুবাদকঃ মাওলানা আবুল হাসান
বইটির মূল নামঃ 'উসূক আল হুর'
প্রকাশনীঃ আর রিহাব পাবলিকেশন্স।
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২২১


[PDF] Download


রিভিউ (By Muhammad Abu Abdullah) ---

রিভিউ এর বইটির মূল নাম, 'উসূক আল হুর' - যা 'কারা জান্নাতী কুমারীদের ভালবাসে ' নামে অনূদিত হল। ধারণা করা হয় এটি লেখকের রচিত শেষ বই। জান্নাতী হুরদের নিয়ে বই রচনার কারণ হিসেবে লেখক লিখেন যে, 'কুরআন ও সুন্নাহতে জান্নাতী মেয়েদের যেসব কাহিনী বর্ণিত হয়েছে তা পুংখানুপুংখভাবে বর্ণনা করার মাধ্যমে মুসলিম যুবকদের বর্তমান সময়ের অশ্লীলতার ফিতনা থেকে রক্ষা করা সম্ভব। যাতে তারা জানতে পারে দুনিয়ার এ জীবন এবং তার সব ভোগবিলাসই ক্ষয়িষ্ণু। জান্নাতের অন্যান্য নিয়ামতের সাথে সাথে জান্নাতী স্ত্রী ও তাদের সাথে মিলিত হওয়ার আনন্দটাও দুনিয়ায় তুলনায় বহুগুণে তৃপ্তিদায়ক ও পরিপূর্ণ। এর ফলে হয়ত যুবকেরা জান্নাতি নারীদের পাওয়ার জন্য উদগ্রীব হবে এবং দুনিয়াতে সকল প্রকার হারাম হতে বেঁচে থাকবে।'

বইটিকে দুই অংশে ভাগ করা যায়। প্রথম অংশে হুরদের বৃত্তান্ত বর্ণিত হয়েছে। হুর কাদের বলে, তাদের বয়স কীরুপ হবে, তারা কী দিয়ে সৃষ্টি, তাদের সৌন্দর্য কীরুপ হবে, তাদের গান কেমন হবে ইত্যাদি বিষয় কুরআন, হাদীস ও তাফসীরের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখক প্রথম অংশে আলোচনা করেছেন। প্রাথমিক পরিচয় দিয়ে লেখক দুনিয়াবী নারীদের সাথে হুরদের পার্থক্য নিরুপণ করেছেন। তারপর লেখক বর্ণনা করেছেন, জান্নাতীদের জান্নাতে হুরগণ কীভাবে অভিবাদন জানাবে, জান্নাতীদের ভাগে প্রাপ্ত হুরদের সংখ্যা কত হবে, অতিরিক্ত হুর প্রাপ্তি হবে কিনা। লেখক আরো তুলে ধরেন, হুরদের সৌন্দর্য দেখে জান্নাতী ব্যাক্তি কেমন অনুভব করবে, দুনিয়ার স্ত্রীগণের মর্যাদা ও সৌন্দর্য কীরুপ হবে, হুরদের প্রেম নিবেদনই বা কেমন হবে, হুরদের মোহরানা কী ও হুরদের সাথে সহবাস এর দিকগুলো। এরপর লেখক মুন্সিয়ানার সাথে তুলে ধরেছেন হুর লাভের আমলগুলো, বিশেষ কিছু অযিফা ও আযানের জবাব দেয়ার সময় হুরগণের সাথে বিয়ে করানোর জন্যে আল্লাহর কাছে কীরুপে দোয়া করা হয় তা।

হযরত নানুতুবি (রাহ) সহ কিছু মুজাহিদগণের সত্য ঘটনা লেখক উল্লেখ করেছেন যারা দুনিয়ার জীবনে ভাগ্যক্রমে ক্ষণিকের জন্য হুরদের দেখা পেয়েছিলেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লেখক কুরআন, হাদীস ও নির্ভরযোগ্য তাফসীরগ্রন্থের রেফারেন্স দিয়েছেন। বইটির শেষ অংশে লেখক মূলত আলোচনা করেছেন তার সহযোদ্ধাদের নিয়ে। উম্মাহর সেই সব সূর্যসন্তান, যারা উম্মাহর কল্যাণের জন্য কষ্টকর পথ পাড়ি দিয়েছেন এবং নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়ে জান্নাতী স্ত্রীদের কাছে চলে গিয়েছেন। লেখক কোথাও এসব শহীদানদের সাথে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন, আবার কোথাও তাদের শাহাদাতের আগে পরিবারকে লেখা চিঠি বা তাদের শাহাদাতের খবর জানিয়ে শায়খের তাদের পরিবারকে লেখা চিঠি তুলে ধরেছেন। চিঠিগুলোতে উম্মাহর জন্য তাদের অবদান এবং আবেগ আপনাকে অবশ্যই আন্দোলিত করবে। বইটির প্রচ্ছদ সুন্দর, বাধাই ভাল হয়েছে। শেষ পাতায় দেখলাম ২য় খন্ডও নাকি আসছে। প্রকাশনীকে অনুরোধ করব, অনুবাদে কয়েক জায়গায় অসংগতি ছিল। সম্পাদনার ব্যাপারেও আরো যত্নবান হতে হবে। বিশেষ করে বাক্যে বিরাম চিহ্নের ব্যাবহার আর বানান ভুল অল্প কিছু জায়গায় লক্ষ্য করেছি।

হুর। মহান আল্লাহর এক স্বতন্ত্র সৃষ্টি। কল্পনার অতীত নৈসর্গিক রূপ ও গুণের অধিকারী ডাগর নয়না চিরযৌবনা স্বর্গীয় অপ্সরী। যার চক্ষু দর্শনে চোখ অবাক হয়ে যায়। আল্লাহ তাদেরকে নিজ প্রিয় বান্দাদের পুরস্কার হিসেবে রেখেছেন পরকালে। হুরদের পাবার তামান্না ও তাদের সম্পর্কে জানার আগ্রহ রাখেন প্রত্যেক নেককার মুসলিম তরুণ। বইয়ের প্রথম অংশ পাঠ করে আগ্রহী প্রিয় পাঠকগণ তাই স্বপ্নাতুর হয়ে যাবেন। নেক আমলে উৎসাহী হবেন। জান্নাত ও জান্নাতি হুর লাভে অনুপ্রাণিত হবেন। নিজেদের কল্পনা করবেন জান্নাতে নিজেদের সচ্চরিত্রাম পবিত্রা হুরগণের তাবুর সামনে। লেখকের মুন্সিয়ানা এটি যে, তার লেখায় আল্লাহ এমন বরকত ঢেলে দিয়েছেন যে, লেখাগুলো সরাসরি অন্তরে প্রবেশ করে। মনে হয়, লেখক যেন পাঠকের সাথে সরাসরি কথা বলছেন। হুরদের সৌন্দর্য বর্ণনায় লেখক উল্লেখ করে দিয়েছেন, আমরা সহীহ হাদীস এবং কুরআন আয়াত ও তাফসীর থেকে যতই কল্পনা করিনা কেন, হুরদের এবং জান্নাতের প্রত্যেক জিনিসের সৌন্দর্য আমাদের কল্পনা থেকেও অনেক অনেক সুন্দর ও আকর্ষণীয় হবে।

বইয়ের শেষাংশে শহীদ ইয়াহইয়া, আব্দুল ওয়াহহাব, আব্দুস সামাদ, হামদী, আবু আকাবা, আহমাদ আয যাহরানী প্রমুখদের খেদমত, আখলাক আর আদবের কাহিনী পড়লেই বোধগম্য হয় আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার জন্য তারা কীরুপ উদগ্রীব ছিলেন এবং প্রতি মুহূর্তে সে চেস্টায় কীরূপ রত ছিলেন আর কেন ও কীভাবে আল্লাহ তাদের শহীদানের মর্যাদা দিয়েছেন। বইয়ের এ অংশে কিছুক্ষণ পরপরই লেখকের নিজের সেসব শহীদ ভাইদের সাথে পরকালে একত্রিত হওয়ার দুয়া ও আকুতি লক্ষণীয়, যা পড়ে চোখে পানি এসে যায়। শায়খ আযযাম নিজেও কীরুপ শাহাদাতের জন্য উদগ্রীব ছিলেন, পরকালে শহীদ, সিদ্দীকান, সালেহীন ও নবীদের সাথে হাশর হওয়ার জন্য কীরুপ পাগলপারা ছিলেন অনুমান করা যায়। লেখক পাঠকের কাছে আবেদন জানিয়েছেন, তার জন্য দুয়া করতে যাতে আল্লাহ তাকে শহীদ হিসেবে কবুল করে নেন। অথচ এ পাঠক যখন লেখাটি পড়ল তার অনেক আগেই তিনি শাহাদাত বরণ করেছেন। তিনি আল্লাহর সাথে ওয়াদায় সত্য ছিলেন বলেই হয়ত আল্লাহ তাকে কবুল করে নিয়েছেন।

দুয়া করি আল্লাহ লেখককে শহীদ হিসেবে কবুল করে নেন। দুয়া করি আল্লাহ লেখকের মর্যাদা যেন আরো বৃদ্ধি করেন। লেখককে নবী, সিদ্দীকীন, শহীদান ও সালেহীনদের সাথে হাশর করান এবং আমাদেরও।

উপসংহারঃ বইটি পড়ে কেউ ঠকবেন না। পাঠক নেক আমলে উৎসাহিত হবেন। গুনাহকে ঘৃণা করবেন। সুতরাং বলা যায়, লেখক বই রচনা করে সফল। তিনি যেমনটি শুরুতে লিখেছিলেন, তিনি বই রচনার সে উদ্দেশ্যে সফল। বইটি পড়ে পাঠকের সেইরকম বোধই জাগ্রত হবে যা লেখকের তামান্না ছিল। ইনশাআল্লাহ।