সূরা বাক্বারার ২৫৫ নম্বর আয়াত। আয়াতুল কুরসি। সম্ভবত সুরা ফাতিহার পর সবচেয়ে বেশি মুখস্থ করা আয়াত। তবে আয়াতুল কুরসি যতো মানুষের মুখস্থ আছে তার দশ ভাগের এক ভাগেরও সম্ভবত ঠিক পরের আয়াতটি মুখস্থ করা হয় নি। বিশাল একটা অংশ সম্ভবত এই আয়াতটি অর্থসহ পড়েও দেখে নি। যদিও এই আয়াতের শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সূরা বাক্বারার ২৫৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ‘আযযা ওয়া জাল বলেন –

দ্বীনের মধ্যে জবরদস্তির অবকাশ নেই, নিশ্চয় হিদায়াত গোমরাহী হতে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে। কাজেই যে ব্যক্তি তাগুতকে (মিথ্যে মা’বুদদেরকে) অমান্য করল এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনল, নিশ্চয়ই সে দৃঢ়তর রজ্জু ধারণ করল যা ছিন্ন হওয়ার নয়। আল্লাহ সর্বশ্রোতা এবং সর্বজ্ঞাতা।

আমরা যখন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলি – তখন মূলত আমরা এই শিক্ষার উপর বিশ্বাসের কথায় বলি। কুফর বিত তাগুত – সকল মিথ্যা মাবুদ, সকল মিথ্যা ইলাহকে প্রত্যাখ্যান, অস্বীকার, আর ঈমান বিল্লাহ – এক আল্লাহর উপর বিশ্বাস – এই হল তাওহিদের মূল ভিত্তি। এই হল তাওহিদের মূল শিক্ষা যা যুগে যুগে নবীগণের মাধ্যমে আল্লাহ মানবজাতিকে জানিয়েছেন – তাদের সকলের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ ‘আযযা ওয়া জাল বলেন –

প্রত্যেক জাতির কাছে আমি রসূল পাঠিয়েছি (এ সংবাদ দিয়ে) যে, আল্লাহর ‘ইবাদাত কর আর তাগুতকে বর্জন কর। অতঃপর আল্লাহ তাদের মধ্যে কতককে সৎপথ দেখিয়েছেন, আর কতকের উপর অবধারিত হয়েছে গুমরাহী, অতএব যমীনে ভ্রমণ করে দেখ, সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের পরিণতি কী ঘটেছিল! [সূরা নামল, ৩৬]

মিথ্যা ইলাহ, মিথ্যা মাবুদ - তাগুতের বিভিন্ন রূপ আছে। কিছু তাগুত চেনা সহজ, কিছু তাগুতকে চেনা তুলনামূলকভাবে জটিল। কিন্তু সবচেয়ে প্রকাশ্য তাগুত হল ঐসব মূর্তি যেগুলোর পূজা করা হয়। তাগুতের অন্যান্য রূপ যদি অজ্ঞতাবশত কিংবা অন্য কোন কারণে কেউ চিনতে নাও পারে, মানুষের তৈরি মূর্তিগুলোকে মিথ্যা মাবুদ, মিথ্যা উপাস্য হিসেবে চিনতে কারোরই সমস্যা হবার কথা না।

দুঃখজনক বিষয় হল মানুষের বানানো বিভিন্ন কনসেপ্টের দোহাই দিয়ে ঈমানের মূল ভিত্তির বিষয়ে আজ আমরা আপোষ করতে উঠেপড়ে লেগেছি। আল্লাহ তাগুতকে অস্বীকার করা, তাগুতকে বর্জন করাকে ঈমানের শর্ত বানিয়েছেন। আর তাগুতের ইবাদাতের অনুষ্ঠানে গিয়ে আনন্দ করা, সেলফি তোলা, নাচগানে মেতে ওঠাকে আমরা সমাজ, সম্প্রীতি, ঐতিহ্য আর সভ্যতার শর্ত বানিয়ে নিয়েছি।

নিঃসন্দেহে আল্লাহ ‘আযযা ওয়া জালের কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় অপরাধ শিরক। নিঃসন্দেহে শিরক সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ। নিঃসন্দেহে শিরক সবচেয়ে জঘন্য মিথ্যাচার। নিঃসন্দেহে তাওহিদের উপর বিশ্বাস আর শিরকের ব্যাপারে সহনশীলতা একই সাথে একই অন্তরে থাকতে পারে না। যে হৃদয় তাওহিদের ব্যাপারে আপোষ করতে পারে, যে হৃদয় শিরকের ব্যাপারে ছাড় দিতে পারে, তা তো অনেক আগেই ঈমানের ব্যাপারে আপোষ করেছে। তাওহিদ আর শিরকের সহাবস্থান হয় না।

কিভাবে আল্লাহর একত্ববাদের বিশ্বাসী একজন মানুষ মূর্তিপূজোর উৎসবে শামিল হতে পারে? কিভাবে একে জাস্টিফাই করা যেতে পারে? কিসের অজুহাতে, কোন যুক্তিতে স্বেচ্ছায় শিরকের উৎসবে, আল্লাহর সাথে বিদ্রোহের উৎসবে, আল্লাহর শত্রুতার উৎসবে একজন বিশ্বাসী, একজন মুসলিম যেতে পারে?

সামাজিকতার কারণে? সামাজিকতা, সমাজ কি আজ ইসলামের চাইতে আমাদের কাছে বড় হয়ে গেল? কবরে কি আমাদের সমাজের দোহাই আর সম্প্রীতির বুলি দিয়ে কি মুনকার-নাক্বীরের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যাবে? সকল ধর্মের মানুষ ভর্তি, মুশরিক-কাফির বোঝাই কোন জান্নাতের প্রতিশ্রুতি কি আমাদের দেওয়া হয়েছে? ধর্ম যার যার, জান্নাত সবার – এমন কোন ওহী কি নাযিল হয়েছে?

সবাই যাচ্ছে আপনি না গেলে খারাপ দেখাবে – এরকম কোন চিন্তা থেকে? চক্ষুলজ্জার কারণে? যদি তাই হয়, যদি মানুষের দৃষ্টির ব্যাপারে আমরা লজ্জিত বোধ করি তবে কি আল্লাহ আল-বাসীর-এর ব্যাপারে আমরা লজ্জা বোধ করবো না? আল্লাহ কি সর্বদ্রষ্টা নন?

মানুষ কি বলবে এই নিয়ে যদি আমরা চিন্তিত হই, তবে কি বিচারের দিনে আল্লাহ আমাদের কি বলবেন তা নিয়ে আমরা চিন্তিত হবো না? আল্লাহর সামনে কি জবাব দেব তা নিয়ে কি আমরা ভাববো না?

যদি বন্ধুবান্ধবের সঙ্গ কিংবা চাপে পড়ে পূজা দেখতে যাবার অজুহাত দেওয়া হয়, তাহলে প্রশ্ন হবে এই বন্ধুবান্ধবেরা কি জাহান্নামের আগুনের হাত থেকে আপনাকে বাঁচাতে পারবে? এক সেকেন্ডের সহস্রাংশের জন্যও কি কবরের আযাব থেকে তারা আপনাকে বাঁচাতে পারবে?

যদি সামজিক দায়বদ্ধতা অজুহাত দেয়া হয়, তাহলে প্রশ্ন হবে, ঐ সত্তার প্রতি কি কোন দায়বদ্ধতা আমাদের নেই যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, আমাদের জীবন দিয়েছেন, আমাদের রিযিক দিয়েছেন, আমাদেরকে মুসলিম হিসেবে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন? ঐ সত্তার প্রতি কি আমাদের কোন দায়বদ্ধতা নেই যার সামনে জবাবদিহি করতে হবে, যারা রহমত ছাড়া আগুন থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না? আমাদের কৃতজ্ঞতাবোধ কি স্রষ্টার চাইতে সৃষ্টির প্রতি বেশি হয়ে গেল?

নাকি কেউ বলবেন – “এতো সিরিয়াস হবার কি হল, আমরা তো শুধু দেখতেই যাই”?

যে বিষয়টির ভিত্তিতে যুগে যুগে আল্লাহর নবী-রাসূলদের আলিহিমুস সালাতু ওয়াস সালাম, বিরোধিতা করা হয়েছে, বিতাড়িত করা হয়েছে, নির্যাতন করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করা হয়েছে, যেই বিষয়টির ভিত্তিতে আপনি মৃত্যুর পরবর্তী জীবনে, আযাব থেকে রক্ষা পাবার, আগুন থেকে রক্ষা পাবার, পুলসিরাত পার হবার আশা করছেন – সেটা কি সিরিয়াসলি নেয়ার মতো কিছু না? তাওহিদের দাবি, তাওহিদের শর্ত কি সিরিয়াসলি নেবার মতো বিষয় না? যখন সমস্ত মানবজাতিকে তাওহিদের মাপকাঠিতে দুইভাবে ভাগ করা হয়েছে?

যদি তাওহিদ, যদি ঈমান আমাদের কাছে যথেষ্ট গুরত্বপূর্ণ না হয় তাহলে আসমানসমূহ আর যমীনে এমন আর কি আছে যা গুরুত্বপূর্ণ? এমন কি আছে যা আল্লাহর একত্ববাদের বিশ্বাসের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে? এমন কি আছে যা দিয়ে শিরকের উৎসবে শরীক হওয়া, আনন্দিত হওয়া, উপভোগ করাকে জায়েজ করা যেতে পারে?

মালিকুল মুলক আল্লাহ ‘আযযা ওয়া জালের আয়াতের সামনে নিজের নফস, খেয়ালখুশি, অধিকাংশের মত, প্রথা, সামাজিকতা, সম্প্রীতি কি কোন অজুহাত হতে পারে? তাওহিদ আর শিরক, ইমান আর কুফরের মাঝামাঝি আর কী-ইবা থাকতে পারে?

"ইবরাহীম ও তার সঙ্গী-সাথীদের মধ্যে তোমাদের জন্য আছে উত্তম আদর্শ। যখন তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিল- ‘তোমাদের সঙ্গে আর আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদের ‘ইবাদাত কর তাদের সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদেরকে প্রত্যাখ্যান করছি। আমাদের আর তোমাদের মাঝে চিরকালের জন্য শত্রুতা ও বিদ্বেষ শুরু হয়ে গেছে যতক্ষণ তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান না আনবে।" [আল মুমতাহিনা, ৪]