এক.

গত সেমিস্টারে আমাদের একটা কোর্স ছিলো Organizational Behavior. কোর্স টিচার খুব সুন্দর করে উদাহরণ দিয়ে টপিকগুলো বুঝাতেন। একটা টপিক ছিলো Cognitive Dissonance. কোর্স টিচার যে উদাহরণটি দিয়ে টপিকটি বুঝিয়েছেন সেটা তুলে ধরছি:

মনে করুন একজন লোক সিগারেট খাওয়া অপছন্দ করে। তার আশেপাশে কেউ সিগারেট খেলে সে সহ্যই করতে পারেনা। গ্রেজুয়েশন কমপ্লিট করে সে যখন একটা হ্যান্ডসাম স্যালারিতে BAT (British American Tobacco) এ চাকরির অফার পেলো, সে সাথে সাথেই অফারটা লুফে নিলো। অথচ সারাজীবন ধরে সে সিগারেটকে ঘৃণা করেই আসছিলো, এখন সে কাজ করছে সিগারেট উৎপাদনকারী কোম্পানিতে।

মানুষের মনোভব আর তার ব্যবহারের মধ্যে বৈপরীত্য হলো কগনিটিভ ডিজোনেন্স।

বিজনেস পড়ার শুরুতেই থাকে বিজনেস সম্পর্কে ধারণা। একটা কাজ কখন বিজনেস হবে আর কখন বিজনেস হবেনা এই সংক্রান্ত ধারণা। একটা কাজ বিজনেস হবার জন্য কয়েকটা শর্ত আছে। যেমন: কাজটা হতে হবে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে, লেনদেনের ধারাবাহিকতা থাকতে হবে, কাজটা আইনগতভাবে বৈধ হতে হবে ইত্যাদি।

কেউ যদি মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে এবং ধারাবাহিকভাবে কোনো অবৈধ কাজ (যেমন: চুরি, ডাকাতি, মদের ব্যবসা) করে তবে সেটা ব্যবসা হবেনা এইজন্য যে, এই কাজগুলোর আইনগত বৈধতা নেই।

দুই.

কয়েকদিন ধরে ফেসবুকে একটা ভিডিও দেখতে পাচ্ছি। ভিডিওতে দেখা যায় এক বৃদ্ধ লোক মূর্তি বানানোর কাজ করেন। তার কাছে একজন লোক মূর্তি কিনতে আসে। মূর্তি চয়েস করার পর যখন লোকটি অর্ডার কনফার্ম করবে, ঠিক তখন আযানের ধ্বনি শুনা যায়। মূর্তি বিক্রেতা লোকটি পকেট থেকে টুপি বের করলো (নামাজে যাবে)।

মূর্তি কিনতে আসা লোকটি তো অবাক। একজন মুসলমান হয়ে তিনি মূর্তি বিক্রি করছেন! এই ভেবে লোকটি অর্ডার ক্যানসেল করার জন্য বললো, কাল আসি।

বৃদ্ধ লোকটি বুঝতে পারলো। বললো, "যে হাত দিয়ে নামাজ পড়ি সেই হাত দিয়ে মূর্তি বানাচ্ছি বলে কি মূর্তি কিনবে না? মূর্তি বানানো ও তো একটা ইবাদাত।"

বৃদ্ধের কথায় মূর্তি কিনতে আসা লোকটি কনভিন্স হয়ে যায় এবং ঐ মুসলমান মূর্তি নির্মাতার কাছ থেকে মূর্তি কিনে।
(ভিডিও শেষ)

ভিডিওতে এক ইমোশনাল আবহ সৃষ্টি করা হয়েছে।

ভিডিওটি দেখলাম কয়েকজন শেয়ার করেছেন (বেশিরভাগই অমুসলিম)। তবে অবাক হলাম, যখন দেখলাম কয়েকজন মুসলমান (!) ভাই-বোনরাও ভিডিওটি শেয়ার করছেন। শেয়ার করেই ক্রান্ত না, ক্যাপশন ও লিখছেন, 'ধর্মের চেয়ে কর্ম বড়', 'হিন্দু-মুসলিমের অসাধারণ বন্ধন', 'একেই তো বলে অসাম্প্রদায়িকতা' ইত্যাদি।

ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান আছে এমন মুসলিম এরকম কথা বলতে পারে বলে আমার মনে হয়না।

তিন.

ইসলাম আর মূর্তিপূজার মধ্যে চিরন্তন দ্বন্দ্ব। নূহ আলাইহি সাল্লামের সময় থেকে শুরু করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত কোনো নবী-রাসূল মূর্তিপূজার সাথে আপোষ করেন নি।

ইব্রাহিম আলাইহি সাল্লাম তো দু'আ করেন:

رَبِّ اجْعَلْ هٰذَا الْبَلَدَ ءَامِنًا وَاجْنُبْنِى وَبَنِىَّ أَن نَّعْبُدَ الْأَصْنَامَ

‘হে আমার রব, আপনি এ শহরকে নিরাপদ করে দিন এবং আমাকে ও আমার সন্তানদেরকে মূর্তি পূজা থেকে দূরে রাখুন’।
[১৪:৩৫]

মূর্তির অক্ষমতা প্রমাণের জন্য ইব্রাহিম আলাইহি সাল্লাম মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে প্রমাণ করেন, এই মূর্তিগুলো ভালোমন্দ কিছুই করার ক্ষমতা রাখেনা।

মক্কা বিজয়ের পর বাইতুল্লাহ থেকে সবগুলো মূর্তি না সড়ানো পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাইতুল্লাহয় প্রবেশ করেন নি।
[সহিহ বুখারী, হাদীস নাম্বার ৪২৮৮]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ কেন প্রেরণ করেছেন এই সংক্রান্ত এক আলোচনায় তিনি বলেন,
আল্লাহ আমাকে প্রেরণ করেছেন যেসব নির্দেশ দিয়ে:
আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা।
মূর্তি ভেঙ্গে ফেলা।
আল্লাহকে এক উপাস্য মানা এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করার নির্দেশ দিয়ে।
[সহিহ মুসলিম, হাদীস নাম্বার ৮৩২]

মূর্তিপূজারীদের অনেক লোভনীয় অফার পেলেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের প্রস্তাবে রাজী হননি। তাদের এইসব অফারের প্রত্যুত্তর তিনি কুর'আনের ভাষায় দেন:

لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِىَ دِينِ

‘তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন আর আমার জন্য আমার দ্বীন।’
[১০৬:৯]

একজন মুসলমানের মূর্তিপূজার প্রতি কোনো রকম আকর্ষণ দেখানোর সুযোগ নেই। যদি সুযোগই থাকতো, তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীদের এতো জুলুম নির্যাতন সহ্য করতে হতো না, মূর্তিপূজারীদের অফার মেনে নিলেই হতো।
কিন্তু ইসলাম কখনো মিথ্যার কাছে আপোষ করেনা।

পবিত্র কুর'আনে মহান আল্লাহ বলেন:

فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْأَوْثٰنِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ

"মূর্তিপূজার অপবিত্রতা থেকে বিরত থাকো এবং মিথ্যা কথা পরিহার কর।"
[২২:৩০]

ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) এই আয়াতে 'মূর্তিপূজার অপবিত্রতা' এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, "এর অর্থ দাঁড়ায়, মূর্তিপূজা থেকে এমনভাবে দূরে থাকো যেমন দুৰ্গন্ধময় ময়লা আবর্জনা থেকে মানুষ নাকে কাপড় দিয়ে দূরে সরে আসে। অনুরূপভাবে মূর্তিপূজা থেকে দূরে থাকো, কারণ তা স্থায়ী শাস্তির কারণ।"

পবিত্র কুর'আনে অন্যত্র মূর্তি বানানোকে আল্লাহ বলেছেন 'মিথ্যা বানানো'। কারণ মূর্তিগুলো রিযিকের মালিক নয়। আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা বলেন:

"তোমরা তো আল্লাহকে বাদ দিয়ে মূর্তিগুলোর পূজা করছো এবং মিথ্যা বানাচ্ছ। নিশ্চয় তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদের উপাসনা করো তারা তোমাদের জন্য রিযিক-এর মালিক নয়। তাই আল্লাহর কাছে রিযিক তালাশ করো, তাঁর ইবাদাত করো এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। তাঁরই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।"
[২৯:১৭]

চার.

ইবাদাত কবুল হবার অন্যতম শর্ত হলো হালাল উপার্জন। জীবিকা যদি হালাল উপায়ে না হয় তাহলে ইবাদাত কবুল হবেনা।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
"আল্লাহ তা'আলা পবিত্র, তিনি পবিত্র এবং হালাল জিনিস ছাড়া গ্রহণ করেন না।"
এরপর তিনি একজন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করে বলেন:

যে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত দীর্ঘ সফর করে। ফলে সে ধুলি ধূসরিত রুক্ষ কেশধারী হয়ে পড়ে। অতঃপর সে আকাশের দিকে হাত তুলে বলে, 'হে আমার প্রতিপালক!'
অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পরিধেয় বস্ত্র হারাম এবং আহার্যও হারাম। কাজেই এমন ব্যক্তির দু’আ তিনি কি করে কবুল করতে পারেন?”
[সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২২৩৬]

একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটা ভবিষ্যৎবাণী করেন।

"এমন এক যুগ আসবে, যখন মানুষ পরোয়া করবে না যে, সে কোথা হতে সম্পদ উপার্জন করল, হালাল হতে না হারাম হতে।"
[সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২০৫৯]

ভাইরাল হওয়া ঐ ভিডিওতে দেখা যায়, বৃদ্ধ লোকটি মূর্তি বিক্রি করে টাকা উপার্জন করছে। তারচেয়েও আশ্চর্যের বিষয় হলো, এরকম 'অসাম্প্রদায়িক' একটা চরিত্রের জন্য নামধারী মুসলমানরা ঐ বৃদ্ধের পেশার প্রশংসা করছেন!

অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মূর্তি কেনা-বেচাকে 'হারাম' বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
[সহীহ বুখারী, হাদীস নাম্বার ২২৩৬]

একই হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহুদিদের অভিশাপ দেন এইজন্য যে, আল্লাহ তাদের জন্য মৃত জন্তুর চর্বি হারাম করে দেন কিন্তু তারা এক নতুন ফন্দি করলো। তারা মৃত জন্তুর চর্বি বিক্রি করা শুরু করলো।

ভিডিও'র ঐ বৃদ্ধ মূর্তি পূজা করছেন না ঠিকই, কিন্তু মূর্তি বিক্রি করছেন। অথচ ইসলামি বিধানে এরকম কোনো ফাঁকফোকর রাখা হয়নি যে, মূর্তি পূজা না করলেও মূর্তি বিক্রি করা যাবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, মূর্তি ক্রয়-বিক্রয়ও হারাম।

তারউপর লোকটি বলছেন, "মূর্তি বানানোও তো একটা ইবাদাত।" (নাউজুবিল্লাহ)

বৃদ্ধের কথাটা কুর'আনের আরেকটা আয়াতকে স্মরণ করিয়ে দেয়:

وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُم بِاللَّهِ إِلَّا وَهُم مُّشْرِكُونَ

"তাদের অধিকাংশ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করে, তবে (ইবাদাতে) শিরক করা অবস্থায়" [১২:১০৬]

লোকটি একটু পর নামাজ পড়তে যাবে, অথচ তার আগ পর্যন্ত ব্যস্ত ছিলো হারাম উপার্জনে।

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:
"তওবা করে হালাল উপার্জনে ফিরে না আসা পর্যন্ত আল্লাহ এমন কোনো মানুষের নামাজ কবুল করেন না, যার পেটে হারাম খাদ্য রয়েছে।"

নামাজে গিয়ে লোকটি আল্লাহর কাছে দু'আ করবে :

ٱهْدِنَا ٱلصِّرَٰطَ ٱلْمُسْتَقِيمَ

"আমাদেরকে সরল পথ দেখাও" [১:৬]

কিন্তু নামাজ শেষে এসে এমন একটা কাজে লিপ্ত হবে, যে কাজটা আল্লাহর সবচেয়ে অপছন্দনীয় কাজগুলোর একটি।

পাঁচ.

কোনো কাজ ব্যবসায়ের শর্ত অনুযায়ী ব্যবসা হতে হলে সেই কাজকে যেমন আইনগত বৈধতার শর্ত পূরণ করতে হবে, ঠিক তেমনি ইসলামেও এরকম আইনগত বৈধতা-অবৈধতা রয়েছে। দুনিয়ার আইনের দৃষ্টিতে একটা অবৈধ কাজ যদি ব্যবসা হিসেবে বিবেচিত না হয়, তাহলে আল্লাহর আইন অনুযায়ী একটা অবৈধ (হারাম) কাজ কিভাবে স্রেফ 'কর্ম/ব্যবসা' হবে?

'ইসলাম' মানে কেবল কিছু রিচুয়াল পালন নয়; ইসলাম একটা পরিপূর্ণ জীবন বিধান। মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সবগুলো কাজের বিধান ইসলামে আছে, এমনকি কিভাবে ওয়াশরুমে ঢুকতে হবে, ওয়াশরুমে কী করতে হবে, ওয়াশরুম থেকে কিভাবে বের হতে হবে সেগুলোও।

ইসলামে কগনিটিভ ডিজোনেন্সের কোনো জায়গা নেই। মনের মধ্যে এক আর কর্মের মধ্যে তার উল্টোটা, এরকম মুনাফিকের স্থান কুর'আনের ভাষায়:

إِنَّ الْمُنٰفِقِينَ فِى الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلَن تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا

"নিশ্চয় মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে। আর তুমি কখনও তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী পাবে না" [৪:১৪৫]

পুনশ্চ:

মনে রাখবেন, ফেসবুকে আপনার শেয়ার করা, কমেন্ট করা, লাভ রিয়েকশন দেওয়া হারাম কাজটা যতো মানুষ দেখবে, আগ্রহী হবে, শেয়ার করবে তার সমপরিমাণ গোনাহ আপনার আমলনামায়ও যোগ হবে।
পবিত্র কুর'আনে আল্লাহ বলেন:

"যদি কোনো ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের সুপারিশ করে, তাহলে তাতে অবশ্যই তার অংশ থাকবে। আবার যে ব্যক্তি কোনো অন্যায় কাজের ব্যাপারে সুপারিশ করবে (তার সৃষ্ট অকল্যাণেও) তার অংশ থাকবে। আল্লাহ তা'আলা হচ্ছেন সকল কাজের একক নিয়ন্ত্রক।"
(সূরা আন নিসা ৪:৮৫)


21/09/2018, 01:27