[চার]

‘সায়রা? সায়রা?’ আরাফাতের কণ্ঠ কেমন ইথারে ছড়িয়ে ভেসে ভেসে আসছে। সায়রার চোখ খুলতে ইচ্ছা করছে না, সারা শরীরে আলস্যমাখা জড়তা। চোখের পাতাগুলো ভীষণ ভারী, কেউ যেন ভ্যাসেলিনের প্রলেপ লাগিয়ে দিয়েছে। পায়ের তালুতে কেউ হাত দিয়ে ঘষছে টের পেয়ে কোনমতে চোখ খুলল সে, পায়ে সে সাধারণত কাউকে হাত দিতে দেয় না। আবছা আবছা দৃষ্টিতে দেখতে পেল সাফিনের মা মুখ আমসি করে কি যেন তেল ডলছে। পা গুটিয়ে নিল সে। আরাফাত মুখের উপর ঝুঁকে কিছু একটা বলছে।

‘হুম?’
‘সায়রা? তুমি ঠিক আছ? কেমন লাগছে?’
‘ভালো। উনি কে?’ আরাফাতের পাশে সবুজ শার্ট পরা এক ভদ্রলোক। দুর্বল হাত দিয়ে গায়ের কাঁথা আরেকটু টেনে নিল সায়রা।
‘উনি কলোনির ডক্টর সাহেব, দেবাশিস বিশ্বাস। তুমি… তুমি বাথরুমে সাড়া দিচ্ছিলে না, দরজা ভেঙে দেখি মোড়ায় কেমন করে গা ছেড়ে বসে আছ, দেয়ালে মাথা ঠেকানো। তাও আলহামদুলিল্লাহ যে মেঝেতে পড়ে যাওনি।’
চট করে পেটের কাছে হাত চলে গেল।
‘সব ঠিক আছে, চিন্তা করবেন না। আপনি খানিকটা দুর্বল, ব্লাডের হেমোগ্লোবিনটা চেক করে নিবেন, প্রয়োজনে ব্লাড নিয়ে ফেলবেন এক ব্যাগ। এটা খুব বড় কিছু না। সাবধানে থাকবেন, এটাই জরুরী।’ ডাক্তার সাহেব মুখ খুললেন। হাসি হাসি অমায়িক চেহারা ভদ্রলোকের, মাঝবয়েসী। মাথার ফাঁকা স্টেডিয়ামটাও কেমন মাই ডিয়ার টাইপের।

ডক্টর সাহেব চলে গেলে আরাফাত সাফিনের মাকে ঘরের কাজ গুছিয়ে ফেলতে বলল। দরজা ভেজিয়ে দিয়ে তারপর বিছানার পাশে চেয়ার টেনে বসল, ‘ঘটনা কি বল তো? খুব কি দুর্বল লাগছিল? দরজা লাগিয়ে গোসলে গেলে কেন তাহলে?’

সব বলতে গিয়েও কেমন সঙ্কোচে বলতে পারল না সায়রা। কপালে আরাফাতের হাত টেনে নিয়ে চুপ করে শুয়ে থাকল, নিজের কাছেই ঘটে যাওয়া ঘটনাটা অবাস্তব মনে হচ্ছে।

টুং টাং, টুং টাং ক্রমাগত বেল বাজছে। এ সময় তো কেউ না বলে আসে না সাধারণত।

‘আরাফাত, দেখবে কে এসেছে?’ সাফিনের মায়ের ধুয়ে রেখে যাওয়া থালা বাসন গোছাচ্ছে সায়রা। ও চেয়ারে বসে বসে দেখিয়ে দিয়েছে, সাফিনের মা নির্দেশমতন রান্না করে বাসন মেজে রেখে গেছে। এখন অবশ্য বেশ ভালো লাগছে, গতকালের ভয়টা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে।

‘খালা, আপনি?’ আরাফাতের গলা শুনে দরজার দিকে মাথা ঘুরিয়ে তাকালো সে। আরাফাতের খালা আর খালাতো বোনকে দরজার মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কলিজায় কাঁপা শুরু হয়ে গেল। শুনতে পেল আরাফাত বলছে, ‘মা আপনাদেরকে বলে নি সায়রার শরীর খুব খারাপ? আমি বলেছিলাম এখন না আসলেই ভালো হত, খালা।’

‘আহা, বসতে দিবি তো, নাকি?’ আরাফাতকে পাশ কাটিয়ে খালা ভেতরে এসে সোফায় বসলেন। সায়রা দেখতে পাচ্ছে ইভা বসেনি, আরাফাতের দিকে লাজুক মুখে চেয়ে আছে, কটি দেহে হালকা হলুদ রঙের মানানসই ফিটিং জামায় তার সৌন্দর্য ঠিকরে পড়ছে। হালকা হলুদ রঙ আরাফাতের ভীষণ প্রিয়, সায়রা জানে। ইভাও জানে নিশ্চয়।
‘সায়রা অসুস্থ বলেই আরো দেখতে এলাম, আব্বু। মেয়েটার বাপ মায়ের ঠিকানা নাই, আমরাই তো সব, নাকি?’

কথাগুলো ঝাঁ ঝাঁ করে কানে বাজছে, তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে মুখ হাসি হাসি করে এগিয়ে গেল সায়রা। ‘আসসালামু আলাইকুম খালা। ভালো আছ ইভা? খবর দাও নি কেন আসার? ভালো কিছু রান্না করে রাখতাম!’

‘সারপ্রাইজ দিলাম তোমাদেরকে। আমি সব রান্না করেই এনেছি, দেখো!’ ঠোঁটে মিষ্টি হাসি ঝুলিয়ে ইভা উত্তর দিল। ‘রেস্ট হাউজে উঠেছিলাম, ওখানেই বাজার করিয়ে সব নিজের হাতে রান্না করে এনেছি।’ নিজেই বক্স খুলে টেবিলে সাজিয়ে রাখল। মাষকলাইয়ের ডাল, চিংড়ি দিয়ে লতি, টমেটো দিয়ে পাবদা মাছ, গরুর ঝুরি মাংস, সর্ষে ইলিশ, পাঁচমিশালি সবজি, আর মোরগ পোলাউ। আরাফাতের প্রিয় সব খাবার। সায়রা আড় চোখে আরাফাতের দিকে তাকিয়ে দেখল মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে। এত দুঃখের মাঝেও হাসি পেল তার।

‘বাহ, সব কিছুই আরাফাতের পছন্দের খাবার। অনেক কষ্ট করে রেঁধেছ বুঝাই যাচ্ছে। তুমি পারোও বেশ, মাশা’ল্লাহ।’ হাসতে হাসতেই বলল সে। খালা আর ইভা দুজনেই বেশ হকচকিয়ে গেছে, ইভা কোন উত্তর করল না। মুখে অবশ্য হাসিটি খোদাই করা।

একত্রে খেতে বসে সবাইকে এটা ওটা আগিয়ে দিতে দিতে হুট করেই সায়রা বলল, ‘আচ্ছা খালা, ইভার বিয়ের দাওয়াত কবে পাব? এ বছর নাগাদ হলে কিন্তু আমাকে প্লেন ভাড়া দিয়ে নিয়ে যেতে হবে। শরীরের যে অবস্থা। আর সামনের বছর হলে দুটো টিকেট!’

সায়রার এমন অসংলগ্ন কথায় ইভা আর খালা তো বটেই, আরাফাতও হতবাক হয়ে গেল। সায়রার মুখে এসব কথা যে কি পরিমাণ বেমানান, তা আরাফাতের চেয়ে কেউ ভালো জানে না। হঠাৎ ভীষণ মায়া লাগা শুরু হল তার, মেয়েটার অনেক সহ্য করেই হয়ত ধৈর্যের সীমা হারিয়েছে।

‘ইয়ে, মা, মানে ইভা তো এখন বিয়ে করবে না। ওর সামনে ঢাকায় পোস্টিং, প্রমোশন হবে এ বছর নাগাদ। তারপর ঢাকাতেই না হয়...’ রোকেয়া খাতুন ক্ষণিকের অপ্রস্তুত ভাবটা কাটিয়ে বলে উঠল।

‘বাহ! তাহলে তো সবসময় দেখা হবে, ইভা! আমরা সঙ্গী পেয়ে যাব সময় কাটানোর। কি বল আরাফাত?’ দ্বিগুণ ঝলমলিয়ে বলে উঠল সায়রা।

খাওয়ার পর সায়রা আর আরাফাতকে জোর করেই নিজের হাতে বানানো মিষ্টি খাওয়ালো খালা, রাতে মিষ্টি খায় না দুজনের কেউই তারপরেও খালার চাপাচাপিতে খেতে হল। গেস্ট রুম ঠিকঠাক করে দিয়ে, রান্নাঘর গুছিয়ে বেশ রাত করেই সায়রা নিজেদের বেডরুমে ঢুকল। আরাফাত তখনো জেগে আছে। মিষ্টি খাবার পর থেকেই আরাফাতের জানি কেমন লাগছে, ভীষণ এক রাগ উঠছে। কার উপর জানে না, কিন্তু আক্রোশটা দমকে উঠছে লাগামছাড়া।

‘এতক্ষণে?’

‘হুম, কাজ ছিল।’

‘তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।’

‘ওমা, কেন? ইভার সাথে গল্প করলেই তো পারতে। ও তো কালকেই চলে যাবে।’

‘উইল ইউ স্টপ ইট?’ ধমকে উঠল আরাফাত। ইচ্ছা করছে ঘাড় ধরে সায়রাকে বাসা থেকে বের করে দিতে। ‘স্টুপিডের মতন কথা বলবে না।’

অপমানে, অবিশ্বাসে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে ওঠার উপক্রম হল সায়রার। এমন ব্যবহার আরাফাত তার অধীনস্থ পিওনের সাথেও করে না। ‘আমি, আমি স্টুপিডের মতন কথা বলছি? তোমার এক্স ওয়াইফ তোমার জন্য নিজ হাতে রান্না করে আদর করে খাওয়াতে নিয়ে আসে প্রতি মাসে, তোমার সামনে তার বুকের ওড়নার প্রয়োজন হয় না, আর আমি স্টুপিড? আসলেই স্টুপিড, নাহলে কেন মাসের পর মাস এসব বেহায়াপনার লীলাখেলা সহ্য করি?’

‘সায়রা, গেট আউট। বাসা থেকে বের হও।’ আরাফাতের হাত উদ্যত হল চড় মারতে। থামিয়ে ফেলল কোনমতে নিজেকে। ইচ্ছা করছে দেয়ালে মাথা ঠুকতে। নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছে না কেন? ভিতরে ভিতরে কেমন এক উত্তেজনা অনুভব করছে।

‘আচ্ছা, যাচ্ছি।’ আরাফাতকে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়ে হাত ব্যাগটা টেনে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেল সায়রা।

ভীষণ এক চাপ বুকে নিয়ে আরাফাত ঘুমিয়ে গেল। তার একবারও মনে হল না এত রাতে মেয়েটা কোথায় যাবে, কিভাবে যাবে।

[পাঁচ]

‘ভাইজান, আফা কবে আইবো?’ সাফিনের মা বোকা বোকা চেহারা নিয়ে তৃতীয় বারের মতন জিজ্ঞেস করল। সে জানে, আপার এভাবে থাকতে যাবার কোন জায়গা নেই। আরাফাত তাকে বলেছে সায়রা কয়েক দিনের জন্য বেড়াতে গেছে। কিন্তু মেহমান রেখে এভাবে আফা যাবেই বা কেন?

‘জানি না সাফিনের মা। তোমার জানতে ইচ্ছে করলে ফোন করে জিজ্ঞেস কর, প্লিজ।’ অসহিষ্ণু কন্ঠে উত্তর দিল আরাফাত।

আরাফাত অফিসে চলে গেলে সে কিছুক্ষণ নিজের মতন রান্নাঘর গুছাতে গুছাতে হঠাৎ খেয়াল করল আরাফাতের খালা রোকেয়া খাতুন কেমন চোরের মতন ভাইজান আর আপার বেডরুমে ঢুকছে। আস্তে করে রুমের দরজার কাছে এসে দেখতে লাগল সাফিনের মা। আরে, বালিশের সেলাই খুলে কেন মহিলা? দরজার দিকে পেছন ফিরিয়ে আড়াল করে বসে কি জানি করছে বালিশ দিয়ে। ইচ্ছে করেই সাফিনের মা ঘরে পা টিপে টিপে ঢুকল, ‘কি করেন, খালাম্মা?’

হাতের কালো তাবিজটা চোখে এড়ায়নি তার। চট করে সেটা বালিশের ফোঁকর দিয়ে চালান করে সুঁই সুতো দিয়ে আবার সেলাই বন্ধ করছিল তখনই সাফিনের মা কথা বলে উঠল। ভীষণরকমের চমকে গিয়ে খালা হাত থেকে বালিশ ফেলে দিল। তড়িঘড়ি আবার তুলে কাঁপা হাতে আঙুল ঢুকিয়ে তুলো চাপ দিয়ে দিয়ে কিছু একটা গভীরে চালান করলেন। হাতে সুঁইটা আবার নিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে পরিষ্কার করে বললেন, ‘আরে, ভোরেই দেখেছি বালিশগুলোর সুতা ছুটে গেছে। ভাবলাম সায়রা তো এসব পারার কথা না। এসেছি যখন, টুকটাক সেলাইয়ের কাজগুলো করে দিয়ে যাই।’

‘আইচ্ছা খালাম্মা। আজকে কি রান্ধুম কন।’ বিগলিত হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করল পোড় খাওয়া মহিলা, অন্তর কাঁপছে। পড়ালেখা করেনি ঠিকই, কিন্তু এসব জাদুটোনার সরঞ্জাম কম দেখেনি জীবনে। ধীরে ধীরে আপার ব্যাপারটা খোলাসা হচ্ছে তার কাছে। আপা তাকে বলেনি ঠিকই, কিন্তু একবার ভাইয়ের মা যখন এসেছিল তখন সাফিনের মা ভাইয়ের প্রথম বিয়ের ঘটনা জেনেছিল। মিনারা খাতুন ফোনে আলাপ করছিল তার আরেক বোনের সাথে। ‘আপা, তুমি থাকো সেই সিলেট, তাই তোমাকে রোকেয়া ভিতরের ঘটনা জানায় নি। রোকেয়াই কবে থেকে লাফাচ্ছিল ইভার সাথে আমার ছেলের বিয়ে দিতে। তা, আমিও দোষ দেখিনি, ছোট বোনের সাথে যদি আত্মীয়তা হয় তাহলে মন্দ কি! আর আরাফাতও তো ইভাকে সেই কবে থেকেই পছন্দ করে রেখেছিল, ইভাও ওকে। বিয়ের এক মাসের মাথায় যে সেই মেয়েকে আরাফাতের বন্ধু ফুসলিয়ে ভাগায় নিয়ে যাবে, কে জানত! আমার ছেলের কি অবস্থা হয়েছিল আপা তুমি যদি দেখতে! খাওয়া, অফিস, সব বাদ। আর সেই বদ ছেলে তো ইভার সাথে ছয় মাসও সংসার করল না, তার নাকি সুইডেনে বউ বাচ্চা ছিল আগে থেকেই। মাঝ থেকে আমার ছেলেটার জীবন শেষ করে ফুড়ুৎ উড়াল দিল ওই লুইচ্চা। ইভাটাও বোকাসোকা, না বুঝে ফাঁদে পা দিয়েছিল। তা আমি আরাফাতকে বললাম, ভুলে যা বাপু, যা হয়েছে হয়েছে। তুই ওকে ফিরায়ে নে আবার। ইভার মতন সুন্দর, গুণী মেয়ে আর দুইটা পাবি না। কিন্তু না, ছেলের জেদ পর্বতের মতন অটল। উঁহু, ইভা কেন, কাউকেই বিয়ে করবে না বলে। শেষমেশ এই চালচুলোহীন জুটল আমার কপালে আপা, তাও যদি গায়ের রঙ টং একটু ভালো হত।’

এত কিছু জানার পরেও আপাকে কোনদিন কিছু জিজ্ঞেস করে নি সাফিনের মা, বরঞ্চ আপার প্রতি মায়াটা বহুগুণে বেড়ে গেছে তার। কিন্তু আজকের ঘটনার পর সে বুঝতে পেরেছে তলে তলে ঘটনা কতদূর এগিয়েছে। রোকেয়া খাতুন ইভাকে আরাফাতের ঘাড়ে গছিয়ে না দেয়া পর্যন্ত ক্ষান্ত হবেন না, তার জন্য যা করতে হয় করবেন। সায়রার অস্বাভাবিক ভয় পাওয়া, অসুস্থ বোধ করা, তাদের স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক নষ্ট হওয়া সবই তার কল্যাণে। কিছু কিছু লক্ষণ তো সাফিনের মা নিজেই দেখেছে। তার কি করা উচিত এখন সে ভেবে কূল করতে পারল না।

ইভা আর রোকেয়া বেগম চলে যাবার পরে হঠাৎ আরাফাতের খারাপ লাগতে শুরু করল। তার স্পষ্ট মনে নেই ঝগড়ার সময়টার কথা, কিন্তু কিছু দৃশ্য থেকে থেকে মানসপটে এসে মিলিয়ে যাচ্ছে, চাইলেও ধরে রাখতে পারছে না। নিজের উপরেই অবাক হয়ে গেল সে, সে কিভাবে পারল অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে এভাবে রাতের আঁধারে মিলিয়ে যেতে? একবারও খোঁজার চেষ্টা করল না, চিন্তাও করল না বিশেষ। আর ইভা আশেপাশে থাকলে তার মাথা এমন ঝিমঝিম করার ব্যাখ্যাও খুঁজে পেল না।

‘ভাইজান, একটা কথা বলি? মনে রাগ নিয়েন না ভাইজান।’ সাফিনার মায়ের কথায় চমকে তাকালো আরাফাত।

‘বল।’ ছোট করে জবাব দিল সে। নিজেকে এত হীন, এত নীচ কখনো মনে হয়নি তার। সায়রাকে খুব ভালোবেসে ঘরে তুলে এনেছিল সে, কথা দিয়েছিল বাবা মার অভাব ভুলিয়ে দেবে, তার বাউন্ডুলে ভাইটাকে ধরে বেঁধে নিজেদের কাছে নিয়ে আসবে।

মেঝেতে বসে নখ খুঁটতে খুঁটতে স্পষ্ট স্বরে সব কথা বলল সাফিনের মা। রোকেয়া খাতুনের অস্বাভাবিক আচরণের কথা উল্লেখ করতে ভুলল না। আগের দু তিনবারও খেয়াল করেছে আরাফাতের বেডরুমে ছোক ছোক করতে, আর এবার তো হাতেনাতেই ধরা। আপার ভয় আর অসুস্থতার কারণ সে বের করে ফেলেছে।

প্রচণ্ড দ্বিধা কাজ করছে আরাফাতের মনে। সাফিনের মায়ের কথা বিশ্বাস করতে বাধছে, আবার ফেলতেও পারছে না। নিজের মাঝে পরিবর্তন সে নিজেই টের পাচ্ছে, আর সায়রা আর তার মাঝের সুসম্পর্কের ফাটল তো বিনা কারণে ঘটতে দেখেছেই। কি বলবে বুঝে উঠতে পারল না। এমনও কি হয়? আর এই যুগে এসব কালো জাদু টাদু বিশ্বাস করে কেউ? কার কাছে যাবে একটু পরামর্শের জন্য?

অনেক ভেবে সে সাইফুলকে ফোন দিল, বাল্যকালের বন্ধু। বহুদিন দেখা নেই। সায়রা আর তার বিয়েতে আসে নি, ছেলে মেয়ে আলাদা বসার ব্যবস্থা নেই তাই। পুরোদস্তুর এই হুজুরকে বন্ধুরা সবাই খেপায় ঠিকই, তবে ভালোবাসে আর মান্যও করে অনেক। সাইফুল সব শুনে বলল, ‘শোন, সব কিছুই মিলে যাচ্ছে। আর কালো জাদুতে না বিশ্বাস করার কি আছে? দাড়া তোকে সুরা বাকারা থেকে খুঁজে বের করে দেই আয়াতটা।’ কিছুক্ষণ অপেক্ষায় রেখে আবার ওপাশে সাইফুলের কন্ঠ শোনা গেল, ‘এই যে, ১০২ আয়াত। ‘তারা ঐ শাস্ত্রের অনুসরণ করল, যা সুলায়মানের রাজত্বকালে শয়তানরা আবৃত্তি করত। সুলায়মান কুফর করেনি; শয়তানরাই কুফর করেছিল। তারা মানুষকে জাদুবিদ্যা এবং বাবেল শহরে হারুত ও মারুত দুই ফেরেশতার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছিল, তা শিক্ষা দিত। তারা উভয়ই একথা না বলে কাউকে শিক্ষা দিত না যে, আমরা পরীক্ষার জন্য; কাজেই তুমি কাফের হয়ো না। অতঃপর তারা তাদের কাছ থেকে এমন জাদু শিখত, যা-দ্বারা স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে। তারা আল্লাহর আদেশ ছাড়া তদ্দ্বারা কারও অনিষ্ট করতে পারত না। যা তাদের ক্ষতি করে এবং উপকার না করে, তারা তাই শিখে। তারা ভালরূপে জানে যে, যে কেউ জাদু অবলম্বন করে, তার জন্য পরকালে কোন অংশ নেই। যার বিনিময়ে তারা আত্নবিক্রয় করেছে, তা খুবই মন্দ যদি তারা জানত।’ শুনলি? বুঝলি? তুই দেখা কর, আমি বুঝিয়ে দিব ইনশা’আল্লাহ। আরো ভালো হয় তুই যদি আমার সাথে আমার পরিচিত এক ইমাম সাহেবের কাছে যাস। উনি রুকিয়া করেন, মানে পীর ওঝা ওইসবের ধান্দাবাজি, কুফরি না। সুন্নাহ অনুযায়ী সমাধান দেন। যাবি?’

শরীরে ছোট ছোট পিঁপড়া হাঁটছে মনে হল আরাফাতের। কেউ কি তার দিকে তাকিয়ে আছে? ঝট করে পিছনে ফিরে দেখল জানালার সাথের সানশেডে বিশাল এক কাক, এক দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। ঠোটগুলো হালকা একটু ফাঁকা করল, ওটার মুখের ভিতরে রক্তের মতন লাল কি ওগুলো?

‘আজকেই যাব যদি তুই নিয়ে যাস।’ কাঁপা কাঁপা গলায় বলল আরাফাত। তার মনে হচ্ছে ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটে যাচ্ছে, এমন অশরীরী কিছু যা তার জ্ঞানের বাহিরে, কিন্তু এখনই থামাতে না পারলে প্রলয়কান্ড ঘটে যাবে।

ফোন কেটে সায়রার বান্ধবী রাখীকে ফোন দিল সে। একবার, দুবার, তিনবার। চারবারের বার রাখী ফোন ধরল, ‘হ্যালো আরাফাত ভাই। আমি আসলে একটু ব্যস্ত। পরে কথা বলি?’

‘রাখী, ফোনটা প্লিজ সায়রাকে দাও। আমি জানি ও তোমার সাথে আছে।’

কিছু বলতে গিয়েও বলল না রাখী। আরাফাতের বিভ্রান্ত কণ্ঠস্বরে কিছু একটা টের পেল যা তাকে সায়রার শিখানো মিথ্যা বলার আগেই থামিয়ে দিল। সায়রা বার বার অনুরোধ করেছিল সে রাখীর বাসায় আছে এটা যেন ঘুনাক্ষরেও আরাফাত জানতে না পারে। ফোনটা সায়রার হাতে গুঁজে দিল, ‘প্লীজ তুই একবার কথা বল।’

‘বলো।’ সহজ সুরেই বলল সায়রা।

‘সায়রা, প্লীজ একটু শুনবে? আমার সাথে একবার দেখা কর, বাসায় এসো না ঠিক আছে, আমি জোর করব না। প্লীজ, বিকেলে বাহিরে কোথাও দেখা কর। আই বেগ ইউ।’

মনের মাঝের কালবৈশাখী ঝড়ের আবেশ চোখের কিনারে জমা হলেও সন্তপর্ণে তা মুছে ফেলল সায়রা ওড়না দিয়ে। ‘বেগ করতে হবে না। দেখা করব। কিন্তু তারপর আমি আমার মতন ফেরত চলে আসব, আর তুমি চলে যাবে তোমার ঠিকানায়। আমি আমার মতন থাকতে চাই আরাফাত। আই ডোন্ট নীড এনিবডি বাই মাই সাইড।’

কথাগুলো শুলের মতন বিঁধলেও কিছু বলল না আরাফাত, সায়রা দেখা করতে রাজী হয়েছে এটাই অনেক বড়।

পাঁচ দিন পরের কথা। আরাফাত শক্ত করে সায়রার হাত ধরে বসে আছে, সামনের সোফায় মিনারা খাতুন। অদূরের মোড়ায় সাফিনের মা, যদিও আরাফাত বলেছিল তার থাকার দরকার নেই। কিন্তু নিজের বক্তব্য পেশ করার জন্য সাফিনের মা রান্নাঘরের চেয়ে এ ঘরে তার উপস্থিতি বেশি জরুরী মনে করেছে, তাই নিজ দায়িত্বে মোড়া সমেত খুঁটি গেড়ে বসেছে এখানে। মিনারা খাতুন স্তব্ধ হয়ে আরাফাতের কথা শুনে চলছে, একবারও বাঁধা দিলেন না।

‘মা, শোন, এতকিছুর পরেও যদি তুমি রোকেয়া খালাকে ইনোসেন্ট ভাবো, তাহলে আমার কিছুই বলার নাই। তবে আমার ঘরের দরজা ওদের জন্য বন্ধ, আমি আমার স্ত্রী আর বাচ্চার কোন ক্ষতি হতে দিব না। ইমাম সাহেব নিজে এসে রুকিয়া করে গেছেন, ঘরের ৫-৬ জায়গা থেকে কালো জাদুর কি কি সব তাবিজ, চুল, কড়ি সাফিনের মা আর আমি খুঁজে বের করেছি। আমার আর কোন প্রমাণ দরকার নাই। আর এসব কুফুরীর মাঝে যদি তোমার কোন রকম হাত থেকে থাকে মা, তাইলে আমি তোমার পায়ে ধরি, নিজের পরকাল শেষ করে ফেলিও না, প্লিজ, প্লিজ।’

‘আব্বু, আমি কিচ্ছু জানতাম না, আব্বু।’ ঝরঝর করে চোখ বেয়ে পানি ঝরছে আরাফাতের মায়ের। ‘ও যখন তোর পুরনো পাঞ্জাবীটা নিয়ে গেল আমার কাছ থেকে চেয়ে, আমি তখনো বুঝি নাই রে আব্বু। আমাকে বলল ও নাকি মাপ দিয়ে তোর জন্য পাঞ্জাবী বানাবে। তোরা গতবার আসলি, সায়রার চিরুনি থেকে ওর চুল আলাদা করে রাখছিল, আমি কি বোকা রে, আমি তখনও বুঝতে পারি নি। আমি ভাবলাম, পরিষ্কার করে দিচ্ছে। সায়রা, মা, তোমরা বিশ্বাস কর, আমি কিচ্ছু জানতাম না। আমি কি আমার নাতিনের ক্ষতি করতে পারি?’

‘আমি জানি, মা।’ সায়রার চোখেও আদ্রতা। জীবন কেমন ওলট পালট হয়ে গেছে কিছুদিনের মাঝেই। তারপরেও আরাফাতের হাতের মুঠোতে খুঁজে পায় পরম নির্ভরতা। সাইফুল ভাইও বার বার বলেছে ভয় না পেতে। নিজেকে অনেকটা বদলে ফেলেছে সে গত কয়েক দিনে। সাইফুল ভাইয়ের স্ত্রী লুনা আপুর মতন সেও ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা করবে, জানবে ঠিক করেছে। আর মনটা শক্ত করে লুনা আপুর মতন পর্দা করা শুরু করবে। আপু বলেছে নিজেকে এসব থেকে প্রটেক্ট করতে হলে নিজেকে আল্লাহ্‌র বিধান অনুযায়ী গড়ে তুলতে হবে।

‘আমি ওর সাথে বাড়ি গিয়েই কথা বলব। ওকে বলব ওর এসব ফন্দি ফিকির বন্ধ না করলে আমাদের সব ভাই বোনের সাথে ওর সম্পর্ক শেষ। তুমি চিন্তা করবা না, মা। রোকেয়াকে আমি আজন্ম চিনি। যখন জানবে আমি জেনে গেছি, তখন আর সাহস করবে না এসব করার। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো, সব ঠিক হয়ে যাবে।’

‘ইনশা’আল্লাহ।’ কেমন অদ্ভুত শোনালো আরাফাতের মুখে শব্দটি। বলে অভ্যাস নেই তো। সায়রাও ফিস ফিস করে বলে, ‘ইনশা’আল্লাহ।’

পেটে হাত রাখে, বাবু নড়াচড়া করছে। সায়রা ভাবে, অনেক কিছুরই অভ্যাস নেই, কিন্তু আস্তে আস্তে শিখে ফেলতে হবে। একটু একটু অদ্ভুত লাগুক, তবুও এই তো বেশ, এই তো নতুন এক শুরু। এবার আর কিছুতেই হার মানবে না সে, আর আঁধারে হারিয়ে যেতে দেবে না নিজেকে।

(সমাপ্ত)