কুরআনের কিছু কিছু সূরা আমাদের খুব পছন্দের। ওয়াজ করে মাঠ গরম করা হুজুরদেরও বেশ পছন্দের। তারা শুধু এই সূরাগুলো নিয়েই ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন কথা বলে যান। সূরা ইউসুফ কিংবা সূরা মরিয়ামের কথাই ধরা যাক। কীভাবে ইউসুফ (আ)-কে দেখে মিশরের সুন্দরীরা হাত কেটে ফেলেছিলো, কীভাবে মরিয়াম (আ)-কে আল্লাহ্‌ তা’আলা অপবাদ থেকে রক্ষা করেছিলেন, তা আমরা সবাই-ই কম বেশি জানি। সন্দেহ নেই, সূরাগুলো আল্লাহ্‌র কালাম। আল্লাহ্‌র কালামের সবই দরকারী। জীবনে চলার পথে আমাদের পাথেয়। তবে মাত্রাতিরিক্ত কাহিনীতে ডুবে থাকায় অনেকসময় বর্তমান সময়ের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ সূরাগুলো আলোচনার লিস্ট থেকে বাদ পড়ে যায়। যেমনঃ সূরা আনফাল, সূরা তওবা, সূরা মায়েদা।

মজার ব্যাপার, আমাদের যেমন কাহিনীসর্বস্বতার বাতিক আছে, ইহুদিদেরও এমন বাতিক আছে। সাধারণ ইহুদিদের দেখা যায়, জেনেসিস-এক্সোডাস নিয়ে খুব লাফালাফি করছে। কারণ? ঐ একই। এগুলোতে প্রচুর গল্প-কিচ্ছা আছে। আদম (আ) থেকে শুরু করে মূসা (আ) পর্যন্ত যত নবি আছে, তাদের খুঁটিনাটি কাহিনী আছে। কোন নবির কয়টা ছেলে ছিলো, মেয়ে ছিলো, এমনকি কয়টা গবাদি পশু ছিলো এসবেরও উল্লেখ আছে। এসব জেনে মানুষের কী লাভ তা অবশ্য তাদের ‘ঈশ্বর’-ই ভালো জানেন। তাই ইহুদিরা জেনেসিস-এক্সোডাস নিয়ে যতো লাফায়, লেভিটিকাস নিয়ে কিন্তু এতোটা লাফায় না। অথচ লেভিটিকাস তাদের তথাকথিত তৌরাতের পাঁচটি বইয়ের একটি। ইহুদিদের সকল আইন; কীভাবে তারা পবিত্র হবে, ইবাদত করবে, কী খাবে না খাবে- অধিকাংশ আইনই লেভিটিকাস থেকে এসেছে।

লেভিটিকাসে খুব অদ্ভুত একটা আইনের কথা বলা হয়েছে। দেখা যাচ্ছিলো, অনেক আইন, বিধি-নিষেধের পরেও ইহুদিরা গুনাহ্‌ করেই যাচ্ছিলো। কিন্তু তাদের তো পবিত্র হতে হবে। ঈশ্বরের চুজেন পিউপল বলে কথা! তাই ঈশ্বর তাদের পাপ-মোচনের একটা উপায় বলে দিলেন লেভিটিকাসের ১৬-১৭ নং চ্যাপ্টারে। আইনটা এরকম-

দুইটা ছাগল নেয়া হবে। একটাকে জবাই করে বেদীতে রক্ত ছিটিয়ে দেয়া হবে। বাইবেল বলছে, রক্ত মানেই হচ্ছে জীবন (লেভিটিকাস ১৭:১১)। সে জীবনের মাধ্যমে ঈশ্বর সব ইহুদিদের গুনাহের শাস্তি থেকে রেহাই দিবেন। অন্য ছাগলটাকে পুরোহিত তার হাত দিয়ে স্পর্শ করবে। ফলে, সকল ইহুদিদের পাপ ঐ ছাগলের মধ্যে চলে যাবে। তখন সেটাকে মরুভূমিতে ছেড়ে দেয়া হবে। বেচারা ছাগল সকল ইহুদিদের পাপ নিয়ে মরুভূমিতে ঘুরে বেড়াবে। যদিও বাইবেলের অন্যত্র বলা আছে, পিতা কখনো পুত্রের পাপের ভার বহন করে না (ইজিকেল ১৮:২০)। কেমন অদ্ভুত না নিয়মটা? আমার পাপ আমার পিতার ঘাড়ে যাবে না, কিন্তু কোন অবলা প্রাণীর ঘাড়ে ঠিকই যাবে।

আবার একদিক দিয়ে চিন্তা করলে প্রথাটা কিন্তু খুব আরামের। যা যাবার ঐ ছাগলের ওপর দিয়ে যাক। আমার সব গুনাহ্‌ এখন ঐটার ওপর, আমি তো বেঁচে গেলাম। ছাগলকে মরুভূমিতে ছেড়ে দেয়ার এ রীতি থেকেই ইংলিশে ‘Scape goat’ নামক বাগধারার আবির্ভাব ঘটেছে। বাংলায় আমরা যাকে বলি ‘বলির পাঠা’। খ্রিষ্টানদের মধ্যেও এভাবে স্বল্প সময়ে পাপ ট্রান্সফারের রীতি আছে। সেটা আরো সহজ। শুধু বিশ্বাস করতে হবে, যিশু আমাদের পাপের জন্য ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছেন। তারপর তৃতীয় দিন আবার জীবিত হয়েছেন। এতোটুকু বিশ্বাস করলেই কেল্লা ফতে! আমার সব পাপ এবার যিশুর ঘাড়ে।


আচ্ছা, আমাদের মুসলিমদের জন্য কি এভাবে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন মানি ট্রান্সফারের মতো পাপ ট্রান্সফারের কোন ব্যবস্থা নেই? সেটার উত্তর আল্লাহ্‌ তা’আলাই দিয়েছেন-

“কোন বহনকারী অন্যের (পাপের) বোঝা বইবে না। কেউ যদি তার গুরুভার বয়ে দেয়ার জন্য অন্যকে ডাকে তবে তার কিছুই বয়ে দেয়া হবে না। এমনকি নিকটাত্মীয় হলেও না। তুমি তো কেবল তাদেরকেই সতর্ক করতে পারো, যারা না দেখেই তাদের রবকে ভয় করে আর সালাত কায়েম করে। যে কেউ নিজেকে পরিশুদ্ধ করে সে তো পরিশুদ্ধ করে নিজের কল্যাণের জন্যেই। আর আল্লাহ্‌র দিকেই (সকলের) প্রত্যাবর্তন।” [৩৫:১৮]

তাই যখন আমরা নিজেদের গুনাহের জন্য আরেকজনকে দায়ী করি, নিজের গুনাহের বোঝা আরেকজনের ওপর চাপাতে চাই, আমরা কিন্তু তখন ইহুদি-খ্রিষ্টানদের প্রথারই অনুসরণ করছি। এ কারণে, পৃথিবীর সব মেয়ে উলঙ্গ হয়ে হাঁটালেও এদের একজনকে ধর্ষণ করাও ইসলাম অনুযায়ী সিদ্ধ নয়। ‘বাজে ড্রেস পড়লে তো রেইপ হবেই’- এ কথা আমরা দুনিয়ার মানুষের সামনে বলতে পারব। আল্লাহ্‌ তা’আলার সামনে নয়। বিয়ে হচ্ছে না বলে অনেকে নেটে উল্টোপাল্টা জিনিস দেখে বেড়ায়, দৃষ্টি হেফাযতের একটুও চেষ্টা করে না। এমনটা করার কারণ জিজ্ঞেস করলে বলে, “বয়সের দোষ। বাবা মা বিয়ে দিচ্ছে না, তাদের দোষ। আমি কী করতে পারি?” এখানে আমরা নিজেদের গুনাহের জন্য ‘Scape goat’ বানাচ্ছি বাবা-মাকে। সন্দেই নেই, এ অবস্থা সৃষ্টির জন্য তাদের দুনিয়াবি মানসিকতা দায়ী। তারা কখনো সমাজের দোহাই দিয়ে আবার কখনো নিজেদের ইগোর কারণে সন্তানদের জাহান্নামে ঠেলে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না। কিন্তু তাদের ঘাড়ে সব চাপিয়ে আমি কিন্তু পার পেয়ে যাবো না। অন্তত ইসলামে এমনটা সম্ভব না। যদি গুনাহ্‌ হয়ে যায়, আল্লাহ্‌র কাছে মাফ চাইতে হবে। তওবা করতে হবে। বারবার গুনাহ্‌ হলে বারবার মাফ চাবো। যতোবার গুনাহ্‌ হবে ততোবার মাফ চাইব। আমি মাফ চাইতে চাইতে ক্লান্ত না হলে, আল্লাহ্‌ তা’আলা ক্ষমা করতে গিয়ে ক্লান্ত কেন হবেন?

তাই নিজের জীবনের সকল ব্যর্থতা, অপ্রাপ্তি আজ থেকে নিজের ঘাড়েই তুলে নিন। কোথাও খুব সুন্দর একটা কথা পড়েছিলাম, “অন্ধকারকে গালি না দিয়ে একটি বাতি জ্বালান।” বাতি জ্বালানোর চেষ্টা আজ থেকেই করা যাক। হাঁ, ঝড়ো আবহাওয়ায় হয়তো বাতি নিভে যাবে। কিন্তু আল্লাহ্‌র কাছে বলতে তো পারব, আমরা আমাদের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছি।

ইনশাআল্লাহ্, আল্লাহ্ তা’আলা আমাদের কাজের কোয়ানটিটি না দেখে কোয়ালিটি দেখবেন। আমাদের অন্তরের সিন্সিয়ারিটি দেখবেন। ঝড়ো আবহাওয়ায় আমাদের নিভু নিভু বাতিটাকেই তিনি দুনিয়ার সবচেয়ে দামী আলো হিসেবে মূল্যায়ন করবেন।