“আজ আপনাকে যা শেখাবো সেটা আপনাকে এমন একটা অতিমানবীয় ক্ষমতা দিবে, যেটা ব্যবহার করে আপনি দ্রুত এবং পরিষ্কারভাবেই আপনার চারপাশের অনেক অনেক ভুল কথা আর মিথ্যা দর্শনগুলো সাথে সাথেই ধরে ফেলতে পারবেন!” এই কথাটা যদি আপনাকে কেউ বলে আপনি কি আগ্রহী হবেন? যদি আগ্রহী হন তাহলে পরের অনুচ্ছেদে চলে যান।

দু’টো কথা দেখুন:

“আপনি পড়তে জানেন না।”

“আমি লিখতে পারি না।”

উপরের বাক্য দুটো নিঃসন্দেহে মিথ্যা। আপনাকে যতই বুঝাই না কেনো আপনি আমার এই উপরের বাক্যগুলো বিশ্বাস করবেন না।

কেন?

কারণ, কথাগুলো যে নিজেই নিজেকে মিথ্যে প্রমাণ করছে। এইরকম আরো অনেক কথা বা বাক্য বলা যায়। যেমন:

“আমি টাইপ করতে জানি না।”

“আমি বাংলা বুঝি না।”

আমি লিখতে পারি না কথাটা এজন্যেই ভুল, কারণ, কথাটা আমি লিখেছি। যেহেতু আমি লিখেছি কথাটা, তাই “আমি লিখতে পারি না” কথাটা সত্য নয়। শেষের দুইটা বাক্যের জন্যেও একই ব্যাখ্যা প্রযোজ্য। আপনি পড়তে জানেন না কথাটা কেন ভুল তা কি আর বুঝিয়ে বলতে হবে?

এই ধরণের হাস্যকর কথাবার্তা বা বিবৃতিকে বাংলায় বলা হয় স্ববিরোধী কথা (self defeating statement)। সোজা বাংলায় বলা যায় “আত্মঘাতী বিবৃতি”। যেহেতু, এই কথা বা বিবৃতিগুলো নিজেই নিজের সত্যতার বিপক্ষে জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ, সেই হেতু এই “আত্মঘাতী বিবৃতি” নামকরণ।

কাজেই, কেউ যদি এসে বলে “ভাই, আমি বাংলায় কথা বলতে পারি না”, আপনি সাথে সাথে ক্যাঁক করে আটকে দিয়ে বলবেন, “দাঁড়ান দাঁড়ান! আপনার এই কথাটা তো মিথ্যা, কারণ আপনি যে কথাটা বাংলাতেই বলে ফেলেছেন, ভাইসাহেব!”

আমাদের সমাজে এইরকম আত্মঘাতী কথাবার্তা প্রায়ই বলা হয় কিন্তু। আপনি হয়তো “সত্য একটা আপেক্ষিক ব্যাপার”, “সুনিশ্চিত সত্য বলে কিছু নাই” এইরকম কথাবার্তা মানুষের মুখে শুনেছেন। আজ থেকে এইরকম কথা বলে আর কেউ পার পাবে না। কারণ, আপনি এতক্ষণে আগের চেয়ে স্মার্ট হয়ে গেছেন। আপনি বুঝে গেছেন এই কথাগুলো আত্মঘাতী। এগুলো নিজেই নিজের কথার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজেকেই খুন করে ফেলে, নিজের শুদ্ধতার মানদণ্ডে নিজেই ফেইল করে। ফলে, কথাগুলো সত্য হতে পারে না। ব্যাপারটা অনেকটা কার্টুনগুলোতে দেখানো ইঁদুর দৌড়ের মতোন। দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ আবিষ্কার করা, “আরি, দৌড়াতে দৌড়াতে বিল্ডিং এর বাইরে চলে আসলাম কখন! আরে, আমি কিসের উপরে দৌড়াচ্ছি? ওমা, আমার পায়ের তলায় তো দেখি কিচ্ছু নাই!” আর আবিষ্কার করার সাথে সাথেই নিজের ভার নিজে সইতে না পেরে সাঁইইইইইইই করে নিচের দিকে পড়তে পড়তে প্রপাৎ ধরণীতল! আত্মঘাতী কথাগুলোও ঠিক এইরকম। কথাগুলো নিজের কথার ভার নিজেই সইতে পারে না। তারপর খেয়াল করে, “আরি, এইটা কী বললাম!” খেয়াল করে দেখে ভিত্তিহীন একটা কথা বলার কারণে পায়ের তলায় মাটি নেই আর, ফলে নিজের কথার ওজনেই পতন ঘটে মরতে হয়।

কাজেই, কেউ যদি বলে বসে “সত্য আপেক্ষিক”, আপনিও সোজা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেবেন, “আপনার এই কথাটাও কি আপেক্ষিক সত্য?” অথবা কেউ যদি বলে, “নিশ্চিত সত্য বলে কিছু নাইরে ভাই”, আপনিও বোমা ছুঁড়বেন, “এই কথাটাও তো তাহলে নিশ্চিত সত্য নয়, ফলে মিথ্যা।” কিংবা কেউ যদি বলে, “এটা আপনার জন্যে সত্যি, আমার জন্যে না”, আপনি তখন তার মুখের কথাটা মাটিতে পড়বার আগেই লুফে নিয়ে বলবেন, “এইমাত্র যে কথাটা বললেন, সেটা কি আপনার জন্যে সত্য, নাকি সবার জন্যেই সত্য?” এইরকম “আপনার জন্যে সত্যি, আমার জন্যে না” টাইপের কথাবার্তা এই যুগের মন্ত্র বলা যায়। কিন্তু এইসব কথা দিয়ে দুনিয়া চলে না। আপনি পাওনাদার, পুলিশ কিংবা বিচারালয়ে দাঁড়িয়ে এই কথাটা বলে পার পাওয়ার চেষ্টা করে দেখতে পারেন আপনি কদ্দুর যেতে পারেন!

আধুনিক সমাজের এই তন্ত্র-মন্ত্রগুলো খুবই ফালতু, কারণ এগুলো আত্মঘাতী, স্ববিরোধী। কিন্তু যারা এইসব কথাবার্তা অন্ধভাবে বিশ্বাস করে বসে থাকে তাদের জন্যে কয়েকটা প্রশ্ন হলো: সত্য বলে যদি কিছু না থাকে, তাহলে আমরা কোনোকিছু শেখার চেষ্টা করি কেন? একজন স্টুডেন্ট কেন টিচারের কথা শুনবে, বই পড়বে? দিনশেষে, বইতে বা টিচারের কাছে তো সত্যটা নেই, তাই না? টাকা দেওয়া দূরে থাকুক, স্কুল, কলেজ আর ভার্সিটিতে গিয়ে সময় নষ্ট করার দরকারটা কী? টিচারের কথা শুনে নকল না করে পরীক্ষা দেওয়ার কী দরকার?

প্রত্যেকটা আইডিয়ার ফলাফল আছে, পরিণতি আছে। ভালো আইডিয়ার জন্যে সুন্দর ফলাফল, আর মন্দ আইডিয়ার আছে মন্দ পরিণতি। আমরা যদি আমাদের স্টুডেন্টদের শেখানো শুরু করি যে সত্য-মিথ্যা, সঠিক-বেঠিক বলে কিছু নাই, সবই আপেক্ষিক, তখন সেই আমরাই কেন নিজের অবিবাহিত বোনকে প্রেগন্যান্ট দেখে আঁতকে উঠবো, অথবা কারো খুন হবার সংবাদে কেন বিচলিত হবো? কেন মানুষের কাছ থেকে আমরা “সঠিক” আচরণ আশা করবো, যেখানে আমরাই শেখাচ্ছি যে সত্য বা সঠিক বলে কিছু নেই, এগুলো আপেক্ষিক ব্যাপার? আমরা কি খেয়াল করছি যে আমাদের সমাজটা ঠিক এই মন্দ পরিণতির দিকেই চলে যাচ্ছে, আর গত কয়েক দশকের নৈতিক আর ধর্মীয় অবক্ষয় হচ্ছে এর পেছনের মূল কারণ? যারা এইসব “আমার জন্যে সত্য নয়” টাইপের ফালতু আর ভুলভাল আইডিয়া মাথায় নিয়ে ঘুরে ঘুরে অন্যায় করে বেড়ায়, তাদের অন্যায়ের পরিণতির ফসল কিন্তু শুধু তাকেই নয়, আপনাকে আমাকে সবাইকেই বহন করতে হয়।

সত্য আছে। এটা অস্বীকার করে বোকামো করার প্রশ্নই আসে না। যারা সত্যকে অস্বীকার করে, তারা আসলে কিছু আত্মঘাতী কথাবার্তা আওড়ে যায় শুধু। ব্যাপারটা অনেকটা এরকম যে, ঘরের ভেতর থেকে চিৎকার করে বলা, “ভাই, আপনে আইজকা যান গা, আমিতো বাসায় নাই।”

আমাদের এই আত্মঘাতী কথাবার্তা চিহ্নিত করবার ক্ষমতাটাকে ব্যবহার করে দেখানো যায় যে সংশয়বাদীদের “সত্যকে জানা সম্ভব না” কথাটার সত্যতা আসলে কতটুকু।

আচ্ছা, আপনি নিজেই চেষ্টা করে দেখুন না।


November 12, 2016