- ভাই 4-C সিট কোনটা?
- আমারটা যেহেতু 4-D, তার মানে আপনারটা আমার পাশেই।
- আলহামদুলিল্লাহ্‌ ভাই। দুই হুজুর মিলে ভালোই কাটবে সময়। দাঁড়ান একটু আসতেছি।

লোকটা দ্রুত বাস থেকে নেমে গেলেন। ছোট ছোট দুইটা মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন। বোঝাই যাচ্ছে খুব আদরের কন্যা। ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে। সিটে বসেই মেয়ে দুটির দিকে তাকিয়ে বললেন, “মামণিরা! বাসায় চলে যাও। আমার জন্য দাঁড়িয়ে থেকো না।”

মেয়ে দুটি চোখ-মুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইলো। বাবাকে বিদায় না জানিয়ে তারা যাবে না।

বাস ছেড়ে দিল। যতোক্ষণ মেয়ে দুটিকে দেখতে পেলেন, তিনি হাত নাড়তে লাগলেন। আমার দিকে তাকিয়ে অপরাধী গলায় বললেন, “বুঝলেন ভাই! মেয়েগুলোকে ছেড়ে যেতে খুব কষ্ট হয়।”

- আরে এতো মন খারাপ করছেন কেন! ক’দিন পর তো ঠিকই আসবেন।
- না ভাই! আমি মালোশিয়াতে থাকি। পড়াশুনা করি সেখানে।
- বাহ! কী নিয়ে পড়াশুনা করেন?
- কুরানিক সাইন্স। আপনি কোথায় পড়ছেন?
- মা শা আল্লাহ! আমার কথা বললেন? আমি কুয়েটে পড়ছি।
- এটা কি সরকারি? কোথায় এটা? আমি ভেবেছিলাম আপনি মাদ্রাসায় পড়েন। ড্রেস-আপে তেমনই লাগে।

আমি প্রশ্ন না শোনার ভান করে জিজ্ঞেস করলাম, “পড়াশুনা কি মাদ্রাসা লাইনে করেছেন?”
লোকটা হাসিমুখে বলল, “জ্বী ভাই! সতের বছর পর্যন্ত মাদ্রাসাতেই পড়েছি। হঠাৎ করে কুরানিক সাইন্স সাবজেক্টের নাম শুনে পড়তে ইচ্ছা হলো। ব্যস চলে গেলাম মালোশিয়াতে।”
- বারাক আল্লাহু লাকা। ভাই নাম জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি।
- আমার নাম ‘আব্দুল্লাহ’। আব্দুল্লাহর সাথে আরো বিশাল টাইটেল আছে। তবে ‘আব্দুল্লাহ’ নামেই ডাকলে ভালো লাগে।
যদিও উত্তরটা জানা, তাও জিজ্ঞেস করলাম, “মেয়ে দুটি কি আপনার? মা শা আল্লাহ! খুবই ফুটফুটে দেখতে।”
- আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহর নেয়ামত। আল্লাহ যাকে খুশি তাকে দান করেন।
যার যে বিষয়ে আগ্রহ সে তো তাই জিজ্ঞেস করবে। তাই মুখ ফসকে বলেই ফেললাম, “ভাই বয়স তো খুব বেশি মনে হচ্ছে না আপনার। মা শা আল্লাহ! দুইটা মেয়েও আছে। বিয়ে কবে করেছেন?”

বলা ঠিক হবে কিনা তা নিয়ে অনেকক্ষণ ভেবে খুব বড় অপরাধ করে ফেলেছেন এমন ভঙ্গীতে আব্দুল্লাহ ভাই বললেন, “আসলে হয়েছে কী ভাই, সমস্যা বাঁধে যখন আমার বয়েস সতের কী আঠারো। মাদ্রাসায় নানান ফিকহের কিতাব পড়ি। স্বামী-স্ত্রীর অনেক মাসলা-মাসায়েল থাকে। পড়ি আর ফিতনা বাড়ে। রোযা রাখি। তাও কষ্ট হয়।”

আমি মনে মনে বললাম, “বাছাধন! মাসালার কিতাব পড়েই এই অবস্থা। আসরের পর যদি একবার তোমারে কুয়েটের সেন্ট্রাল মসজিদ থেকে আইসিটি বিল্ডিং পর্যন্ত নিয়ে আসা যাইতো, মাথা ঘুরে পড়ে যাইতা। জ্ঞান ফিরলে খালি বলতা, ‘হয় বিয়া করুম! নাইলে মরুম।'

আব্দুল্লাহ ভাই বলে যাচ্ছেন, “তারপর মাকে বুঝিয়ে বললাম। মা রাজী হলেন। নানী আমাকে অনেক বোঝালেন। বললেন, এতো কম বয়সে বিয়ে করলে সবার কাছে আমার দাম কমে যাবে। এতো দাম দিয়ে আমি কী করব? নিজের ঈমানই বাঁচানো যাচ্ছে না! পুরোদমে পাত্রী দেখা শুরু হলো। অল্প সময়ে একজনকে পছন্দও হয়ে গেলো। মেয়ে ক্লাস এইটে পড়ে। দেখতে মা শা আল্লাহ! খুবই সুন্দরী ছিল। অনেক ধার্মিকও। সবকিছু ঠিকঠাক। মেয়ের মা হঠাৎ বেঁকে বসল। বাপ নেই, ভালো জমি-জমা নেই, এমন ছেলের কাছে তারা মেয়ে বিয়ে দিবে না।”

আব্দুল্লাহ ভাই ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেললেন। হাসিখুশি মুখ কিছুটা মলিন হয়ে গেলো। মনে হলে সুন্দরী মেয়েটাকে বিয়ে করতে পারেননি বলে এখনো তার কিছুটা কষ্ট রয়েছে।

তারপর দ্রুতই সে কষ্ট করে আড়াল করে বললেন, “তবে আল্লাহ যা করেন সেটা ভালোর জন্যেই। কিছুটা হতাশ হয়েছিলাম এটা সত্যি। আমার খালু তারপর তার এক বন্ধুর মেয়েকে দেখানোর জন্য আমাকে নিয়ে গেলেন। পাত্রী দেখতে এতোটা সুন্দর ছিল না। আমার চেয়ে মাত্র দুই বছরের ছোট। কারোই পছন্দ হলো না। কিন্তু আমার পছন্দ হলো। শুনলাম মেয়ে পরিবারে সবাই বেশ ধার্মিক। দাঁড়ান ভাই! একটা ফোন এসেছে।”

- আহা! মা কাঁন্দে কেন? কানতে না করো। আমি কি লাশঘরে চইলা যাচ্ছি নাকি? এক বছর পর তো ঠিকই আমু। আরে কী মুশকিল। তুমিও কান্না শুরু করলা নাকি!

আপনজনের সাথে কী অকৃত্রিম গলায় কথা বলছেন। শুনতেই ভালো লাগছে। অনেকক্ষণ পর তিনি ফোন রাখলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “মেয়ে মানুষের মন। তার উপর মায়ের মন। খালি কাঁদে। ভাই কী যেন বলছিলাম।”

- আপনার খালু মেয়ে দেখাতে নিয়ে গেছেন। আপনার পছন্দ হলো...
- জ্বী ভাই। মেয়ে পছন্দ হলো। আমার খালু চিন্তা করলেন, এই পাত্রী হাতছাড়া করা যাবে না। সেদিনই বিয়ে ঠিক হলো। মাইক্রোতে করে আমার বাসা থেকে কিছু আত্মীয় আর প্রতিবেশীদের আনা হলো। ভাই কী বিরক্ত হচ্ছেন?
- মোটেও না। সবাই কথা বললে শুনবে কে? আপনি বলতে থাকুন। আমি শুনছি। মন দিয়েই শুনছি।

- তো ভাই কিছু বোঝার আগেই বিয়ে হয়ে গেলো। সে দিনই বাসর হলো। আমি তো খুবই অবাক। মনে হলো ঘোরের মধ্যে আছি। মেয়ে পক্ষ তেমন স্বচ্ছল ছিল না। ওরা তাও সাধ্যমত চেষ্টা করেছে আপ্যায়নের। কিন্তু আমার এলাকার লোকজন খুব কথা বলল এটা নিয়ে- ‘হাজী সাহেবের পোলা কী ফকিন্নির ঝিরে বিয়া করছে। এই কয়ডা লোকও খাওয়াইতে পারলো না।’ ভাই আপনি বলেন লোক খাওয়ানো কী মেয়ে পক্ষের দায়িত্ব। রাগ উঠে গেলো। বাসায় গিয়ে বড় করে অনুষ্ঠান দিয়েছি। সবাইকে ইচ্ছামত খাওয়া-দাওয়া করিয়েছি।

আমার আগ্রহ তো অন্যদিকে। হাসি গোপন করে বললাম, “ভাই এতো কম বয়সে বিয়ে করেছেন? বিয়ের পর অভিজ্ঞতা কেমন?”

উনি আমার কথায় সম্ভবত কিছুটা মনঃক্ষুণ্ণ হলেন। ভেবে বসলেন, আমি হয়তো কম(!) বয়সে বিয়ের বিপক্ষে। কিছুটা প্রতিবাদী গলায় বললেন, “ভাই বয়স কম কোথায়? উনিশ বছর আপনার কম মনে হচ্ছে? আপনার বয়স কতো? বিশ-বাইশের কম তো মনে হয় না। সত্যি করে বলেন, আপনার কি একটুও কষ্ট হয় না? একা একা লাগে না। মনের মধ্যে ফিতনা আসে না?

উনি আমার পরিচিত হলে বলতাম, “মিয়া! মজা লন? বিয়া বিয়া করতে করতে পাগল হয়ে গেলাম। আর আমারে এটা বলেন।” মনের কথা গোপন রাখতে হলো। এমন ভাব করলাম যে, উনি এসব বলার আগে আমি বিয়ের গুরুত্ব বুঝতামই না। মাথা নাড়াতে নাড়াতে বললাম, “জ্বী ভাই। আসলেই ফিতনা। বিবাহ করা জরুরী। দু’আ করবেন।”

আব্দুল্লাহ ভাই আরো সিরিয়াস হয়ে বললেন, “ভাই বিয়ের যে কী বরকত তা বিয়ে না করলে কখনোই বুঝবেন না। আমার স্ত্রী যে আমার জন্য কতোটা কষ্ট স্বীকার করেছে। মেয়েটা বাবার বাড়িতে কষ্ট করে বড় হয়েছে। আমার এখানে এসেও কোন সুখ পায়নি। খালি অভাব আর অভাব! মোহর হিসেবে ওকে একটা গাই কিনে দিয়েছিলাম। সেটাও আমার বিদেশে যাওয়ার জন্য টাকা তোলার সময় বিক্রি করতে হয়েছে। কথাটা মনে হলেই খারাপ লাগে। আমি ওর হাত ধরে ক্ষমা চেয়েছি। বলেছি, ‘বউ আমারে মাফ কইরা দিও। আমারে একটু সময় দাও। তোমারে আরেকটা গাই কিনা দিবো।’ ও মাথা নীচু করে আমারে বলে- ‘আপনে যে কী কন! কিনা দেওন লাগবো কেন? আমার যা আছে সবই তো আপনার লইগ্যা।’

এই যে ভাই বিদেশ যাচ্ছি! ওকে ছাড়া যে কী কষ্ট আমার হয়! ওকে বলেছি, “আমি আল্লাহরে ভয় করে ভালো থাকার চেষ্টা করবো। তুমিও আল্লাহরে ভয় কইরো। আল্লাহ কিন্তু সব দেখতেছেন।”

আব্দুল্লাহ ভাই আবেগপ্রবণ হয়ে গেলেন। কথা বলতে বলতে মনে হয় অন্য কোনখানে চলে গিয়েছিলেন। সম্বিত ফিরে পেয়েই বললেন, “ভাই মাফ করবেন! স্বামী-স্ত্রীর কথা বলে আপনাকে শুধু শুধুই কষ্ট দিচ্ছি। আমার রাতে ফ্লাইট। একটু ঘুমাই। না হলে সমস্যায় পড়ব।”

আমার বলতে ইচ্ছা হলো, “ভাই বলুন। এতো সুন্দর গল্প আমি ঘন্টার পর ঘন্টা শুনতে পারব। একটুও বিরক্ত হবো না।”

চোখের উপর গামছা রেখে আব্দুল্লাহ ভাই ঘুমিয়ে পড়লেন। উনাকে আমার জীবনের গল্প বলতে ইচ্ছা হলো খুব। নিজের একান্ত কিছু কষ্টের গল্প। আনন্দের গল্প। হতাশার গল্প। উনি নিজের গল্প বলাতে এতো ব্যস্ত ছিলেন, আমার কথা সম্ভবত জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছেন। আশ্চর্য! আমার নামটাও তো উনি জানেন না। যাই হোক! সবার সব কথা জানতে নেই। হয়তো আমার কথা জানাতে উনার কোন কল্যাণ নেই, তাই জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছেন। আর উনার কথা জানা আমার জন্য দরকার বলেই হয়তো আল্লাহ আমাকে দিয়ে এতো প্রশ্ন করিয়েছেন।

হাইওয়ের একপাশে বিস্তৃত ধানক্ষেত। অনেক দূরে কিছু ছনের ঘর দেখা যাচ্ছে। কে জানে! কতো গল্প এ মানুষগুলোর জীবনে লুকিয়ে আছে। সন্তানদের গল্প, স্বামী-স্ত্রীর গল্প। যে গল্পগুলো কেউ জানে না। কেউ লেখে না। শুধু সহজ-সরল ঐ মানুষগুলো জানে আর ওপর থেকে আল্লাহ দেখেন। ঢেলে দেন তাঁর অফুরন্ত বরকত। হঠাৎ করেই ঐ গ্রামগুলোকে বড্ড আপন মনে হলো। সেখানকার মানুষগুলোকে নিজের মনে হলো। যাদের সহায়-সম্পদ, জমি-জমা না থাকলেও বিশাল মন আছে। যারা জীবনসঙ্গীর সুখ-দুঃখের অংশ হতে জানে। মনের কষ্টগুলো গোপন করে বলতে জানে,

“আপনে যে কী কন! কিনা দেওন লাগবো কেন? আমার যা আছে সবই তো আপনার লইগ্যা।”