বাল্টিমোরে যে বাংলাদেশি পরিবারগুলিকে চিনি তাদের একটা চমৎকার প্র্যাকটিস হচ্ছে মাসে একদিন একত্রিত হয়ে কুরআনের তাফসির করে। নিজেরাই পড়াশুনা করে এসে আলোচনা করে, বেশ লাগে! সপ্তাহ দু’এক আগে আমার উপর ভার পড়েছিল আলোচনা করার। টপিক হচ্ছে ‘আল্লাহ।’ আলোচনার বিষয়বস্তু শুনেই আমি অর্ধেক অবশ হয়ে গেলাম। আল্লাহ? আল্লাহ কে নিয়ে কথা বলব আমি? না জেনে আল্লাহ কে নিয়ে কথা বলা কত বড় অপরাধ এ নিয়ে বোধহয় কুরআনে আয়াতও আছে।

যারা নিয়মিত লেকচার দেন এমন একজন ভাবী সাহস দিলেন, আল্লাহ এর শব্দগত অর্থ আলোচনা করলেই হবে, না জানা বিষয়ের ধারেকাছে যাওয়ার দরকার নেই। উনিই বুঝিয়ে বললেন, আল্লাহ শব্দটাকে ভাগ করলে হয় ‘আল ইলাহ’, বা The Ilah. এই হিসেবে কালিমা তাইয়্যেবার প্রথম অংশ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের যোগ্য কোন ইলাহ নেই) – এটা নিয়েই মূলত কথা বলতে হবে।

দেশ থেকে আসার আগে অপু কালিমা তাইয়্যেবার উপর ইয়া মোটা একটা বই দিয়ে দিয়েছিল। সেটা পড়ে মোটামুটি কী কী করলে অন্যান্য বিষয়ও আল্লাহর ইবাদতের সমান হয়ে যায়, সোজা ভাষায় শিরক হয়, তার উপর বিরাট জ্ঞান অর্জন করে ফেললাম। তখনই স্পষ্ট বুঝতে পারলাম যে, তাবিজ, আংটি এসব শিরক – কারণ আমরা ভাবছি এই জিনিস পরে থাকলে আল্লাহ আমাদের বিপদ থেকে রক্ষা করবে। এটা ভাবছি না যে, আল্লাহর কাছে দুআ করলেই আল্লাহ আমাদের রক্ষা করবে। অর্থাৎ সরাসরি আল্লাহর থেকে চাওয়ার বদলে একটা জিনিসের মাধ্যমে চাচ্ছি। খ্রিস্টানরা জেসাস এর মাধ্যমে চায়, আমরা চাই নীল সবুজ পাথরের মাধ্যমে।

আমি যখন ইসলামের বিন্দু বিসর্গও বুঝতাম না তখন ‘আত্মউন্নয়ন’ করার জন্য ডেল কার্ণেগী মুখস্ত করতাম, রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস থেকেও চরিত্র বাছাই করে তার মত হতে চেষ্টা করতাম। এরকমই ঘুরপাক খেতে খেতে মেডিটেশন ও করলাম। মেডিটেশন এর মূল কথা হচ্ছে ভাগ্য আপনার হাতের মুঠোয়, তাকে ঠিক মত চাইতে হবে। শরীরকে প্রতিদিন বলতে হবে আমার কোন অসুখ হবে না, তাহলে অসুখ হবে না। বাইরে বের হওয়ার আগে পুরা জিনিসটা visualize করে বের হতে হবে – তাহলে যেমনটা চাই তেমনটাই হবে্। মোদ্দা কথা, আমার জীবন, আমার ভবিষ্যৎ আমার নিয়ন্ত্রণে, ভাল করে মেডিটেশন করলে সব কন্ট্রোল করা যায়। অবশ্য যদি মনে হয়, আমি নিজে ভাল করে করতে পারবনা, তাহলে ওদেরকে টাকা দিয়ে আসলে ওরাও আমার হয়ে ‘প্রোগ্রাম’ করে দিবে!

আধুনিক যুগের পীর। যত্তোসব! সিলভা তে একটা ব্যাজ পরতে দেয়, কোয়ান্টাম এ মেটাল এর চুড়ি। এরাই আবার একটু কম শিক্ষিত মানুষদের তাবিজ ঝুলাতে দেখলে বোঝায়, ছি! তাবিজ পরা শিরক!

যাই হোক, অপুর দেয়া বইটা শেষ করে নেট থেকে একটা সাড়ে চার ঘন্টার লেকচার শুনে যখন থেমেছি তখন আর দুই আড়াই ঘন্টা বাকি। হঠাৎ মনে হল, আচ্ছা, ইলাহ এর linguistic meaning টা ত জানা হল না! আরবি শব্দের রুট ধরে টান দিলে খুব মজার মজার জিনিস পাওয়া যায়। যেমন যাকাত যেই রুট থেকে আসছে, তার অর্থ হচ্ছে purification, যাকাত এর মাধ্যমে টাকা পয়সার পাশাপাশি নিজের intention টাও পরিশুদ্ধ করে নেয়া যায়। কারণ এমনিতে আমরা টাকা ডোনেট করলেও শুধু আল্লাহর খুশির জন্য কমই দেয়া হয়। হয়ত গরিব মানুষের ভাল করার উদ্দেশ্যে দেই। কিন্তু যাকাত কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দেয়া হয় বলে বছরে একবার টাকা পয়সার সাথে আমাদের সম্পর্কটা একটা ঝালাই হয়।

গতকালকে জুম্মার খুতবায় শুনলাম সদকা এর রুট আর সিদ্দিক বা সত্যবাদীর রুট এক। যে কোন দানই সদকা হবে না, যদি সেটা truly আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দেয়া না হয়। আবার আলতু ফালতু টাইপ কাজও, যেমন একজন যাচ্ছে, তার বাজারের ব্যাগটা বয়ে দেয়া – এটাও সদকা হয়ে যেতে পারে, যদি আল্লাহ খুশি হবে এই নিয়ত এ করা হয়।

কৌতুহল হল, এইসব simple শব্দগুলির রুট ঘেটে এত জোস জিনিসপাতি বের হচ্ছে, দেখি ইলাহ থেকে কী বের হয়। ঐ ভাবীকে আবার ফোন করলাম। ভাবী, ইলাহ এর কোন ইয়ে পাওয়া যাবে? উনি বললেন, দাঁড়াও, তোমাকে খুঁজে জানাচ্ছি।

উনি যা বললেন তা হল এই-

আরবি তে ইলাহ এর রুট থেকে বের হওয়া অন্যান্য শব্দগুলি ব্যবহার হয়-

১. একজন খুব ক্লান্ত, শ্রান্ত পথিক যখন ছায়ায় বসে বিশ্রাম নেয়
২. একজন খুব ভীত, সন্তস্ত্র ব্যক্তি অপর ব্যক্তির কাছে যায়, এবং অপর ব্যক্তি তাকে নিরাপত্তা দেয়
৩. এক মেষশাবক যখন মায়ের বুকে আশ্রয় নেয়
৪. কাউকে চাদরে আবৃত করে, আচ্ছাদন করে রাখা হয়

আমি থ’ হয়ে বসে থাকলাম। আল ইলাহ, বা the ilah মানে এই? আমার কষ্ট হবে, যে আমাকে বুকের মধ্যে গুঁজে, চাদর দিয়ে জড়ায় রাখার মত করে আশ্রয় দিবে সে আল্লাহ? রাতের বেলা একলা ঘরে ভয় পাব, যার কথা মনে করে ভয় কেটে যাবে সে আল্লাহ? যে হতভাগার মা নেই, যে হতভাগী আপন মায়ের বুকে শেল দিয়ে দূরদেশে পড়ে আছে – সবাইকে একভাবে যে বুকে টেনে ভালবাসে সে আল্লাহ? আমি একটা ছোট্ট অসহায় মানুষ, কী বলতে কী বলি, কী বুঝতে কী বুঝি, দুনিয়ার কেউ আমারে বোঝে না – এসব সব অভিযোগ meaningless হয়ে যাবে কারণ আমার ইলাহ, আমার আশ্রয় নেয়ার জায়গা একটাই? আল ইলাহ?

আমি কী ভাবসিলাম আর কী হইল! ইলাহ এর সাথে ইবাদত এর সম্পর্ক, অর্থাৎ আমি আল্লাহরে কী দিব… তা না, উল্টা আল্লাহ তার নামের মধ্যে বলে রাখসে আমরা তার কাছে আরো কত কী চাইতে পারি? সুবহানাল্লাহ!

আর ইবাদত? আমি জানিনা। আমার সব চাওয়া পাওয়ার কেন্দ্র যদি এক আল্লাহই হয়, আমার সব দেয়াও শুধু আল্লাহর জন্যই হবে। আমি যা করব, যা দিব, যাই বলব, আল্লাহর জন্যই করব। করবনা কেন? অসুস্থ মানুষের সেবা করলে আল্লাহ খুশি হয়, গরিব মানুষকে জীবিকার ব্যবস্থা করলে আল্লাহ খুশি হয়, কথা দিয়ে ঠিকমত কথা রাখলেও আল্লাহ খুশি হয়। এগুলো কি ইবাদত না? আমার ত বেশি কষ্ট করার দরকার নাই, শুধু সচেতন থাকা অবস্থায় আল্লাহর কথা মাথায় রাখলেই হবে। আর যে মানুষটার help পেয়ে thank you বলার অভ্যাস আছে, সে আল্লাহকে মাথা থেকে সরাতে পারবে না। ইবাদত এইগুলিই। প্রতিদিনের কাজ, যা করতেসি, সবই ইবাদত, যার উদ্দেশ্যে করতেসি, সেই ইলাহ। অনেকের জন্য career ইলাহ, মান সম্মান ইলাহ, আরাম আয়েশ ইলাহ। আমার বাকি জীবনের চেষ্টা থাকবে আল ইলাহ কেই ইলাহ করে রাখার।